বড়রা যেখানে ছোট হয়
আমাদের ছোটরা একদিন বড় হয়। তখন আমরা অবাক হয়ে বলি, আরে তুই দেখি বড় হয়ে গেছিস। আচমকা কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়া আমাদের ছোটরা হুট করে বড় হয়ে যায়। আমরা বিস্ময়ে বড় মানুষটাকে দেখি, আর ভাবি তার শৈশব কৈশোর চলে গেলো! আমার খুব অবাক লাগে, ঢাকাবাসীদের অনেকেই নিজের সন্তানকে তার শৈশব কিংবা কৈশোর চিনাতে পারছে না। এখন তা শুরু হয়েছে মফস্বলে। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে যদি বলা হয় প্রতিদিন দড়ি লাফ খেলবে। এক ঘণ্টা ঝাড়া। জবাবে বলবে সময় কই? সকালে মক্তব। প্রাইভেট। ক্লাস। তারপর ঘুম পায়। তারপরো মফস্বল-গ্রামে এখনো প্রকৃতি আছে। পুরনো মানুষ আছে। যৌথ পরিবার আছে। আন্তরিকতা আছে। আছে শৈশবের অবশিষ্টও।
বড় শহরে যৌথ পরিবার কমছে দ্রুত। প্রকৃতির সঙ্গে হচ্ছে না শিশুর নিবিড় পরিচয়। শিশু চিনছে টিভি। ট্যাব। অনলাইনে গেইম। সেসব আয়োজন মূলত বড়দের জন্য। সিসিমপুর কিংবা কালেভদ্রে দুয়েকটা শিশুতোষ চলচ্চিত্র ছাড়া শিশুদের জন্য বছরজুড়ে মাতিয়ে রাখার মতো অনুষ্ঠান কোথায়? কোন চ্যানেলে। শিশুরা শোনায় বড়দের কৌতুক। গায় বড়দের গান। মনে হয়,সাইজে ছোট কোনো বড় মানুষ বলছে, গাইছে। জাদুবাস্তবতা! জীবন্ত।
বাতাসে থাকা অক্সিজেনের মতো আমরা ভুলে থাকি আজ যে শিশুর জন্ম পঁচিশ বছর পর সে যোগ দেবে কাজে। পঞ্চাশ বছর পর দেশ চালাবে। যে প্রতিষ্ঠানেই সে থাকবে, তা পরিচালনায় দেবে দিক নির্দেশনামূলক মতামত। প্রশ্ন হলো, এ বিষয়টি মাথায় রেখে কী আমরা শিশুদের বড় করছি? পাল্টা প্রশ্ন হতে পারে দুনিয়ার কোথাও কি এই বিষয় মাথায় রেখে শিশুদের জন্য কিছু করা হয়? জবাব হবে অনেক হয়।
প্রসঙ্গক্রমে কানাডার নির্বাচনের কথা বলতে পারি। সেখানে স্কুলগুলোতে শিশুদের জন্য মক নির্বাচন হয়েছে। তাতে ভোট দেওয়ার জন্য পার্টিগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার, ইতিহাস পড়েছে ছোটরা। আলোচনা করেছে, করেছে বিতর্ক। হয়তো তাদের ভোট নেতা নির্বাচিত করেনি কিন্ত নির্বাচনের প্রস্তুতি দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের আবেগকে নষ্ট করেছে। আয়োজন করে এই কাজটি করেছে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র। আমরা কি আমাদের শিশুদের রাজনীতি শেখাই?
জবাব হলো, না। তারা কলেজে কিংবা পাড়ায় হঠাৎই রাজনীতির সামনাসামনি হয়। অনেকে সারা জীবন রাজনীতি নিয়ে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করে কিন্তু নিজে রাজনীতির মাঠে একটা চক্কর খেতেও নামে না। তাই রাজনীতি শেখার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে পরিবার। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানরাই আসে রাজনীতিতে, ভালো করে। মজার তথ্য হলো, অনেকে তাকে পরিবারতন্ত্র বলে সমালোচনাও করে। আরো মজার তথ্য হলো, রাজনীতি থেকে দূরে থাকার মন্ত্র আমাদের তথাকথিত ভালো ছেলেমেয়েদের দিয়ে থাকে তাদের পরিবার। সেটা আপাতত পরিবারতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত নয়।
যাহোক, কতটুকু বয়স হলে তাকে আর শিশু বলা যাবে না, তা খুব বেশিদিন হয়নি আমরা নির্ধারণ করেছি। কয়েক বছর আগেও তিন আইনে শৈশব পেরোতে তিন রকমের বয়স ছিল। শ্রম আইনে একরকম, উত্তরাধিকারে একরকম আবার বিয়ের জন্য আরেক রকম। শ্রম প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, কিছু তথ্য শেয়ার করি। বিশ্বে এখন ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। সংখ্যায় আমাদের দেশের সব মানুষের চেয়ে একটু বেশি। বলতে পারেন , এই মুহুর্তে বাংলাদেশে মোট কতজন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে আছে? আমি জানি বলা যাবে না। কারণ সে হিসাব কারো কাছে নেই। না সরকার। না এনজিও। চার বছর আগে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হলেও করা হয়নি কোনো জরিপ বা শুমারি। ২০০২-০৩ সালে জাতীয় শিশু শ্রম জরিপ হয়েছিলো দেশে। জরিপ করে পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও। সে হিসাব অনুযায়ী তখন দেশে ৪৭ লাখ শিশু শ্রমিক ছিলো। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ছিলো ১৩ লাখ। এর সঙ্গে যোগ বিয়োগ করে বর্তমানে একটা সংখ্যা বলে দেওয়ার সুযোগ নেই। দেশে সামাজিক খাতের অনেক সূচকের অনেক অগ্রগতি আছে। তাতে শিশুশ্রম কমতেও পারে। বাড়তেও পারে।
আমাদের দেশে শিশুশ্রমে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেশি। অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করা। কারখানায় এখানে সেখানে। কিন্তু অন্যান্য অনেক দেশে দাসত্ব, পর্ণগ্রাফি, জকি হিসাবে ব্যবহৃত হয় শিশু। সেটা আরো অমানবিক। সরকার একটা নির্দেশনা জারি করে তা কঠোরভাবে মানার ব্যবস্থা করলে দেশ থেকে অল্প সময়ে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু তা করা হলে লাভের চেয়ে বরং ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। কোনো বাবা –মা কি চায় তার সন্তান ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করুক? চায় না। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য অন্নের সংস্থান করতে না পারার যে জ্বালা তার নাম শিশুশ্রম। শিশু , প্রথম মানবাধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতেই হারায় শৈশব। হারায় বড় হওয়ার আরো সব অধিকার।
কাজেই, বিষয়টি শুধু শিশুদের বিষয় নয়। শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে বড়দের কর্মসংস্থান করতে হবে আগে। যেখানে অভিভাবকদের যথেষ্ট আয় থাকে সংসার চালানোর, সেখানে শিশুশ্রম আবিষ্কার করা এক বিষয় আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের আরেক নাম শিশুশ্রম হলে বিষয়টি ভিন্ন।
শিশু খেলবে। হাসবে। গাইবে। তার থাকবে মেধা বিকাশের মতো সাবলীল পরিবেশ। তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের বড়দের। আমরা কি সে দায়িত্ব পালন করছি? নাকি আমরা ছোটদের কাছে কেবলি ছোট হয়ে থাকবো? ভাবার সময় এখনি।
এইচআর/এমএস