‘২০-২১ বছরে নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য-পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি ক্রিকেট’
ছিলেন ক্রিকেটার। জাতীয় দলে খেলেননি কখনো। তবে ঢাকাই ক্রিকেটে ইমরান (সারোয়ার ইমরান) পরিচিত নাম। প্রতিষ্ঠিত পেস বোলার ছিলেন। বেশ জোরে বল করতেন। ঢাকা লিগে এক ম্যাচে ৮ উইকেট শিকারের রেকর্ডও আছে তার।
খেলা ছেড়ে বিকেএসপিতে কোচিং করিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। নাঈমুর রহমান দুর্জয়, আল শাহরিয়ার রোকন, সাজ্জাদ আহমেদ শিপন, নিয়ামুর রশিদ রাহুল, শফিকুর রহমান মুন্না আর এখনকার দেশ বরেণ্য ক্রিকেটার সাকিব, তামিমের গুরু, মেন্টর মোহাম্মদ সালাউদ্দীন প্রমুখ ক্রিকেটার তার হাতের ছোঁয়ায় পরিণত হয়েছেন বিকেএসপিতে।
ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রায় দুই যুগেরও বেশি কোচিং করাচ্ছেন ইমরান। ‘১৯৯৬ সালে আবাহনীর হয়ে প্রথম বছর কোচিং করতে এসেই হইচই ফেলে দেয়া। লিগ আর দামাল স্মৃতিসহ তিন ট্রফি বিজয়। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কোচ সারোয়ার ইমরানের জয়রথ চলেছে উল্কার গতিতে।
ঘরোয়া ক্রিকেটে সফল প্রশিক্ষকের তকমা গায়ে আঁটাতেই দায়িত্ব পান জাতীয় দলের হেড কোচের। তাও ছোট খাট আসরে নয়। সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনিই বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের কোচ। এখন সাত-আট জন ভিনদেশি হাই প্রোফাইল কোচ দিয়ে দল পরিচালিত হচ্ছে। তবে ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক যাত্রায় সারোয়ার ইমরান একাই ছিলেন টিম বাংলাদেশের কোচ।
তার কোচিংয়েই ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের অভিষেক ইনিংসে ৪০০ রান করেছিল বাংলাদেশ। তারপর ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে চরম ভরাডুবির পর আবারও দল পরিচালনার দায়িত্ব বর্তায় ইমরানের কাঁধে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে সে দায়িত্বও দক্ষতার সাথে পালন করেছেন।
এরপর হাথুরুসিংহে আসার আগে ২০১৪’তে কিছুদিন হেড কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি পেস বোলিং কোচের ভূমিকায়ও ছিলেন বেশ কয়েক বছর। রুবেল হোসেন, কামরুল ইসলাম রাব্বিরা উঠে এসেছেন সারোয়ার ইমরানের হাত ধরেই।
এখনো ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে প্রাইম ব্যাংকের কোচ। বিপিএলেও রাজশাহী-সিলেটের প্রশিক্ষকের ভূমিকায় দেখা গেছে তাকে। সব মিলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে তিন যুগের বেশি সময়ের সম্পৃক্ততা। তারই আলোকে জাগোনিউজের মুখোমুখি হয়েছিলেন সারোয়ার ইমরান।

আসুন শোনা যাক তার কথেপকোথন-
জাগো নিউজ ২৪.কম : বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেট কোথায় দাঁড়িয়ে? দেশের ক্রিকেট কী সঠিক পথে এগুচ্ছে, এখন কি সব কিছু ঠিকমত চলছে?
সারোয়ার ইমরান : নাহ! এক কথায় আমরা মোটেই ভাল জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। দেশের ক্রিকেট অবশ্যই সঠিক পথে হাঁটছে না। দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা কখনোই রাইট ট্র্যাকে ছিলাম না। তাই এখন সঠিক পথে থাকার প্রশ্নই আসে না।
সেই ২০০০ সালে টেস্ট অভিষেকের আগে থেকে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখবো- তখনো আমাদের ক্রিকেট অবকাঠামো ভাল ছিল না। আমাদের ক্রিকেটে ও ক্রিকেটারদের ট্রেনিং ও প্র্যাকটিসের জন্য সর্বাধুনিক সুযোগ সুবিধা ছিল না। এখন ২০২১ সালে এসেও আমরা সর্বাধুনিক ক্রিকেট অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারিনি।
এখনো আমাদের দেশে একটি পরিপূর্ণ ও অত্যাধুনিক ক্রিকেট কমপ্লেক্স নেই। যেখানে সব রকম ক্রিকেট ফ্যাসিলিটিজ পাওয়া যাবে, তা নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। সম্বল বলতে ঢাকার শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম আর সিলেটে কিছু আছে। সেগুলোও পরিপূর্ণ নয়।
মোটামুটি কাজ চালানোর মত, এই যা। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, একটা টেস্ট ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের জাতীয় পর্যায়, বয়সভিত্তিক দলসহ সারা দেশের অন্তত বিভাগীয় পর্যায়ে যে আধুনিক ও পরিপূর্ণ ক্রিকেট এবং ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিজ থাকার কথা, আমাদের তার কিছুই নেই।
অথচ গত ১০ বছরে আমরা সুযোগ পেয়েছিলাম অত্যাধুনিক ক্রিকেট কমপ্লেক্স তৈরি করার। ২০১১ আইসিসি বিশ্বকাপ আর ২০১৪ সালে বিশ্ব টি-টোয়েন্টির আসর বসলো আমাদের দেশে।
দেশের ক্রিকেটের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান, উপকরণ, ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিজ বাড়ানো এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের সেটাই ছিল সবচেয়ে ভাল সময়; কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি।
পৃথিবীর প্রায় দেশেই বিশ্বকাপের আসর বসলে অন্তত একটি নতুন স্টেডিয়াম হয়, পরিপূর্ণ কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়। কিন্তু আমরা পারিনি। ঘুরিয়ে বললে করিনি। একটি নতুন ও আধুনিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম যার মাঝে সব রকম ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিজ থাকবে- তা নির্মাণ করতে পারিনি। চিন্তাও হয়ত করিনি।
জাগো নিউজ : তাহলে কী কিছুই হয়নি? কিছু কাজতো হয়েছে, নাকি?
ইমরান : আমার মনে হয় না আমরা আসলে তেমন ভাল কিছু করেছি। চাঁছাছোলা বলতে গেলে বলবো, সে অর্থে আমরা কিছুই করিনি। যে কাজটি সবার আগে করা দরকার ছির, সেটাই তো হয়নি। একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেট উন্নয়নের প্রথম শর্তই হলো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের উন্নয়ন, প্রচার, প্রসার এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো। ক্রিকেটারদের অর্থনৈতিকভাবে সুযোগ-সুবিধা প্রদান থেকে শুরু করে অনুশীলন ফ্যাসিলিটিজ সর্বাধুনিক করাই ছিল প্রথম কাজ।

কই তার কিছুই তো হয়নি। সবার আগে দরকার ছিল জাতীয় লিগটাকে একটা ভাল ও উঁচু পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এমন একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট করা যেখান থেকে প্রতি বছর অন্তত দুই বা তিনজন টেস্ট প্লেয়ার উঠে আসবে। কই তা কী হয়েছে? জাতীয় লিগ তথা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কী কোনো আমূল পরিবর্তন ঘটেছে? সেই ২১-২২ বছর আগে যে ন্যাশনাল ক্রিকেট আরম্ভ হয়েছিল, সেটার তখন যা অবস্থা ছিল, এখনো তাই আছে।
এবারও খেলতে যাবার আগের দিন মানে জাতীয় লিগ শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে ক্রিকেটাররা ভ্যাকসিন নিয়ে নির্দিষ্ট ভেন্যুতে গেছে খেলতে। প্র্যাকটিসটাও করেনি। মানে খেলার আগের যে প্রস্তুতি, তার ন্যুনতম প্রস্তুতি নিয়েও ক্রিকেটাররা জাতীয় লিগ খেলতে নামে না।
আর তাদের অনুশীলন সুযোগ-সুবিধার কথা নাইবা বললাম। কিছুই নেই। সবচেয়ে বড় কথা জাতীয় লিগ হলো ৮ বিভাগীয় দলের প্রথম শ্রেণির আসর, অথচ সেখানে বিভাগীয় পর্যায়ে কিছুই নেই। এখনো বিভাগীয় দলে কোন ফিক্সড হেড কোচ নেই। একজন ট্রেনার, ফিজিও কম্পিউটার অ্যানালিস্ট কিছুই নেই। এই হচ্ছে আমাদের প্রথম শ্রেণির আসর। আসলে কোন গুরুত্বই দেয়া হয় না।
একটা দল তৈরি করতে গেলে একজন অলটাইম হেড কোচ, ফিজিও-ট্রেনার সবাইকে দরকার। তাদের সমন্বয়ে একটা ভাল সেটআপ তৈরি হলেই না একটি বিভাগীয় দল ভালমত গঠিত হবে। তার কিছুই নেই। একটা অগোছালো অবস্থা। কোন লক্ষ্য-পরিকল্পনা নেই। বর্ষপঞ্জি নেই। হুট করে যখন তখন আয়োজন। সব মিলে আমাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কর্মকান্ড যতটা বেগবান, সুন্দর, ছিমছাম, সাজানো গোছানো আর সময় উপযোগী হওয়া উচিৎ তার কিছুই হয়নি।
জাগো নিউজ : কিন্তু বোর্ডের দাবি জাতীয় লিগ তথা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট উন্নয়নে সম্ভাব্য অনেক কিছুই করা হয়েছে। ম্যাচ ফি, দৈনিক ভাতা, যাতায়াত ভাতাসহ আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণির প্রায় শ’খানেক ক্রিকেটারকে মাসিক বেতনও দেয়া হচ্ছে । তাহলে...।
ইমরান : এটা তো আছেই। তা হয়েছে। এখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ম্যাচ ফি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আহামরি না হলেও বেড়েছে। ক্রিকেটাররা আগের চেয়ে বেশি ম্যাচ ফি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু শুধু ক্রিকেটারদের অর্থ বাড়ালেই তো আর হবে না। ন্যাশনাল লিগের কোচরা বিনে পয়সায় কোচিং করে। তাহলে কি করে চলবে?
কিন্তু সত্যিকার পেশাদার ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। একটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের জন্য যে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, দল পরিচালনার জন্য যে পেশাদার ব্যবস্থাপনা অতি প্রয়োজন, তা কিন্তু হয়নি।
জাগো নিউজ : দলগুলোর নিজনিজ বিভাগে অনুশীলন সুযোগ সুবিধা কতটা?
ইমরান : সেটাই তো বলছি। একটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যে বিভাগ অংশ নেয়, তার সবকটার পৃথক প্রফেশনাল সেটআপ থাকবে। একজন হেড কোচ, স্টেডিয়াম, ইনডোর, জিম মানে পরিপূর্ণ প্র্যাকটিস ফ্যাসিলিটিজ থাকা জরুরি। যাতে করে বিভাগীয় পর্যায়ের ক্রিকেটাররা নিজ নিজ বিভাগীয় শহরে সারা বছর প্র্যাকটিস করতে পারে। আজ পর্যন্ত সে ব্যবস্থা হয়নি।

ওই রাজধানী ঢাকায় এসে জাতীয় লিগ বা বিসিএল শুরুর হাতে গোনা ক’দিন আগে এসে চলে প্র্যাকটিস। তা কেন হবে? যে বিভাগগুলো অংশ নেয়, তার প্রতিটায় একজন বিভাগীয় হেড কোচের অধীনে সারা বছর বিভাগীয় স্টেডিয়ামে অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তবেইনা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইনপুট-আউটপুট পাওয়া যাবে।
জাগো নিউজ : এসব কেন হয়নি, সেটা কী আঞ্চলিক ক্রিকেট এসোসিয়েশন না থাকার কারণেই কী এমন অগোছালো ও অচলাবস্থা?
ইমরান : অবশ্যই। সবার আগে দরকার একটি দক্ষ পেশাদার ব্যবস্থাপনা। প্রত্যেকটি বিভাগে যদি আঞ্চলিক ক্রিকেট অধিদপ্তর বা রিজিওনাল ক্রিকেট এসোসিয়েশন থাকতো, তাহলে হয়ত একটি পেশাদার ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠতো। কিন্তু তা আর হলো কই? সেই ২০০০ সাল থেকে শুনে আসছি রিজিওনাল ক্রিকেট এসোসিয়েশনের কথা, এখনো শুনছি।
প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক মনোভাব আনতে হলে অবশ্যই বিভাগীয় পর্যায়ে রিজিওনাল এসোসিয়েশনের হাতে দিয়ে দিতে হবে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় দলের সমুদয় দায় দায়িত্ব।
একটা কমপ্লিট সেটআপ থাকবে। প্রতিটি বিভাগীয় রিজিওনাল ক্রিকেট এসোসিয়েশনে একজন করে সিইও থাকবেন, তিনি সব মনিটর করবেন। হেড কোচ, সহকারি কোচ, ম্যানেজার, স্পেশালিস্ট কোচ, ট্রেনার, ফিজিও, কম্পিউটার অ্যানালিস্ট-এর সমন্বয়ে পেশাদার ব্যবস্থপনা গড়ে উঠলেই কেবল বিভাগীয় দলগুলোর চেহারা পাল্টে যাবে।
তখন সবার মাঝে দায় দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ হবে জাগ্রত। একটা মায়া টান ও তাগিদও জন্মাবে। ভাল খেলার ইচ্ছেও হবে প্রবল। তখন আপনা-আপনি মাঠের ক্রিকেট হবে জমজমাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ঠাসা। এগুলো কিছুই তৈরি হয়নি। এসব হয়নি বলেই কোন প্রতিদ্বন্দ্বীতা নেই। দল সাজানোর প্রক্রিয়ায়ও আনতে হবে পরিবর্তন।
এখন প্রতি বছরই দলগুলোয় আসে পরিবর্তন। এক বিভাগের ক্রিকেটার অংশ নিচ্ছে আরেক বিভাগে। এভাবে করলে চলবে না। প্রতি বিভাগের দল অন্তত ৮-১০ জন নিজ বিভাগীয় ক্রিকেটারে সাজানো থাকতে হবে। তাহলে টিমের প্রতি মায়া জন্মাবে। তারা নিজ বিভাগের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করবে। ভাল খেলার তাগিদ বাড়বে। এসব করতে না পারলে খেলোয়াড়দের বেতন, ভাতা আর আনুসাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও কিন্তু কাজ হবে না। কোনোদিনও জাতীয় লিগ তথা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট অর্থবহ হবে না।
মনে রাখতে হবে, শুধু প্রিমিয়ার লিগ নয় প্রতিটি আসরকে আকর্ষণীয়, জমজমাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে লোকাল ক্রিকেট যদি প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ না হয়, তাহলে কোনোদিনই ক্রিকেটারদের মধ্যে লড়াকু মানসিকতা গড়ে উঠবে না। তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিয়ে লড়াই-সংগ্রাম করতে পারবে না।
জাগো নিউজ : আসলে এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
ইমরান : আসলে আমাদের কোথায় যাবার কথা ছিল, আমি সেভাবে দেখতে চাই না। আমারতো মনে হয় আমাদের কোথাও যাবার কথা না। কারণ আমরা গত ২০-২১ বছরে কোন লক্ষ্য-পরিকল্পনা করে তথা টার্গেট নিয়ে আগাইনি। আমাদের নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্যই ছিল না। কাজেই আমরা কোথায় যাব বলুন?
জাগো নিউজ : তাহলে আপনি বলতে চান, কোন বোর্ড ক্রিকেট উন্নয়নে কিছুই করেনি?
ইমরান : করেছে। আমরা গত প্রায় ২০ বছরে গাদা-গাদা ফরেন কোচ এনেছি। তাদের পিছনে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করেছি। তারা আসে ট্রেনিং করায়। আমাদের ক্রিকেটাররাও শুরুতে খুব খুশি হয়ে যায়। বলে অমুকের কাছ থেকে খুব ভাল কিছু শিখছি।

তারপর ম্যাচ খেলতে গিয়ে দেখা যায় কিছুই পারে না। পারফরমেন্স সেই আগের জায়গাতেই আছে। এগুলো ১৫-২০ বছর ধরে চলছে। এখনো তাই। কোনোরকম জবাবদিহীতা নেই। কে কোথায় কী কাজ করছে? কোন নজরদারি, খবরদারি নেই। একজন নতুন কোচ আসেন, তার অধীনে হয়ত ৪/৫টি জয় ধরা দেয়। বোনাস পান তারা। আবার তারপরই আসে খারাপ সময়। পরাজয়ের বৃত্তে ঘোরে জাতীয় দল। এভাবেই চলছে।
আমার খুব দুঃখ লাগে আমরা আইরিশ এইচপিকে হারিয়েই খুশি। সন্তুষ্ট। কেন তা হবো? আমাদের এইচপির লড়াই হবে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে। আমরা খেলবো তাদের এইচপির সাথে। সেখানে জিতলেই বুঝবো অগ্রগতি হয়েছে। আয়ারল্যান্ডের এচপির সাথে জিতে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে লাভ কি?
আমার মনে হয় শুধু বেশি পয়সা দিয়ে হাই প্রোফাইল কোচ এনেই সব দায়িত্ব-কর্তব্য শেষ হয়েছে বলে বসে থাকা উচিৎ না। তারা কে কী করছেন? কার কাছ থেকে কী আউটপুট, তা খুঁটিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জাগো নিউজ : উইকেট নিয়ে কিছু বলবেন কী?
ইমরান : কি আর বলবো? এইতে সেদিন বিকেএসপিতে ৪ দিনের ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে দেড় দিনেরও কম সময়ে। উইকেটে ধুলো উড়েছে। এমন উইকেটে খেলে কিন্তু কোন লাভই হবে না। উইকেটের প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। উইকেট ভাল খেলার পূর্ব শর্ত। ভাল উইকেটে খেলা আয়োজন নিশ্চিত করাও আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব-কর্তব্য।
জাগো নিউজ : বাংলাদেশের ওয়ানডে দলের ভবিষ্যত কী?
ইমরান : ওয়ানডে দল এখনো ভাল। তবে যদি নিরপেক্ষ এবং নির্মোহ বিশ্লেষণ করি, তাহলে বলবো আমাদের ৫ সিনিয়র ক্রিকেটার মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক আর রিয়াদ গড়পড়তা একযুগ খেলেছে। তাদের সাথে আরও ক’জন আছে যারা ৭-৮ বছর জাতীয় দলে খেলে ফেলেছে। মানে একটা সেটআপ দীর্ঘদিন একসাথে ছিল। এমন এক দলের অর্জন, কৃতিত্ব আর সাফল্যটা আরও বড় হলে ভাল লাগতো।
মনে করে দেখুন, অর্জুনা রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে লঙ্কানদের যে দলটি প্রায় ৮-১০ বছর খেলেছে, তারা শেষ করেছে বিশ্বকাপ জিতে। আর কেনিয়াও মরিস উদুম্বে, টিকোলো, কেনেডি ওটিয়েনোসহ ৭-৮ জন একসঙ্গে দীর্ঘদিন খেলে ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছিল।
আমরা কিন্তু তা পারিনি। বরং দিনকে দিন ৫ সিনিয়রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। সেটা কমিয়ে আনার এখনই সময়। লিটন, সৌম্য আর শান্তদের এগিয়ে আসতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে ম্যাচ ভাগ্য গড়ে দেয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। না হয় এই সিনিয়ররা অবসরে চলে গেলে একটা বড় শূন্যতা দেখা দেবে।
জাগো নিউজ : টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অবস্থা কী, একটু বলবেন?
ইমরান : এক কথায় ভাল না। কারণ টি-টোয়েন্টি খেলতে সবার আগে দরকার নতুন বলে বল করার মত অন্তত জনা দুয়েক কুইক বোলার। যারা শুরুতে কিছু করে দেবে। আর স্লগে ভাল জায়গায় বল ফেলার বোলারও খুব জরুরি। তাতে প্রতিপক্ষ শেষ দিকে হাত খুলে খেলতে পারবে না।
কিন্তু আমাদের সেই মানের কার্যকর বোলার নেই। কিছু স্পিনার আছে, যারা ঠেকা কাজ চালাতে পারে। তবে তাদের দিয়ে বিশ্বমানের প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা সম্ভব নয়। এছাড়া ব্যাটিং মোটামুটি; কিন্তু ফিনিশারের অভাব। ব্যাটিং আর বোলিং দু’ভিাগেই দক্ষ ও মেধাবি ফিনিশারের খুব অভাব।
এআরবি/আইএইচএস/এমএস