রাশিয়া বিশ্বকাপে উঠবে না নীল ঢেউ

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ২৮ মে ২০১৮

বিশ্বকাপ তো দেখবো; কিন্তু সমর্থন করবো কোন দলকে? প্রশ্নটা মনে জেগেছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ সামনে রেখে। টেলিভিশনের প্রচলন তখনো সেভাবে হয়নি। গ্রামগঞ্জে এক বাড়িতে টেলিভিশন আছো তো ৫০ বাড়িতে নেই। যে বাড়িতে টিভি ছিল সে বাড়ির উঠোন সন্ধ্যার পর সিনেমা হলের মতো হয়ে উঠতো সরগরম। ‘৮৬’র বিশ্বকাপ সামনে রেখে কিছু টিভি যোগ হয়েছিল বিভিন্ন গ্রামে।

জুন-জুলাইয়ে বিশ্বকাপ। মানে বৃষ্টি-বাদলের দিন। বাংলাদেশ সময় গভীর রাতে খেলা। বৃষ্টি আসলে কী হবে? বিকল্প হিসেবে কাচারি ঘরের বড় বারান্দা কিংবা উঠানে টাঙানো হলো সামিয়ানা। বিশ্বকাপ দেখার প্রস্তুতি বলে কথা। খেলার দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন ম্যাগাজিনে বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যাপক কাভারেজ। সম্ভাব্য তারকা কারা হবেন, আগের বিশ্বকাপ কারা মাতিয়েছেন- কত কী খবর!

কিন্তু ওই যে, প্রথমেই মনে জাগা প্রশ্নের উত্তর তো পাওয়া যাচ্ছিল না। সাপোর্ট করবো কোন দলকে? অতীত ঘাটতে শুরু করলাম। হঠাৎ একদিন পত্রিকার পাতায় নজর পড়লো রোল অব অনারে। মানে কোন সালে কোন দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তার তালিকা। দেখলাম আগের আসরে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ জিতেছে ইতালি। ফাইনালে তারা হারিয়েছে জার্মানিকে। ব্যাস, পেয়ে গেলাম সমর্থন করার মতো দল। চ্যাম্পিয়নদের পক্ষে থাকাই ভালো। ইতালিকে সমর্থন জানিয়েই বসে যেতাম টিভির সামনে।

Italy

আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম পছন্দের দল ইতালি সেবার শেষ ষোলোর হার্ডলস টপকাতে পারলো না। ইউরোপের আরেক দেশ ফ্রান্সের কাছে হেরে ঘরে ফিরে তারা; কিন্তু কয়েকটি ম্যাচ দেখে ঠিকই ভক্ত হয়ে গেলাম নীল জার্সিধারীদের। জিয়ানলুকা ভিয়াল্লি, জিউসেপ্পে বারেসি, ব্রুনো কন্তি ও আলেসান্দ্রো আতোবেল্লিদের নৈপূণ্য বেশ মনে ধরলো। এই এত বছর পর এখনও চোখে ভাসে। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে না পারলেও তখন থেকেই হয়ে গেলাম দেশটির পাড় সমর্থক।

পরের বিশ্বকাপে ইতালি নিজেরাই আয়োজক। এবার তো প্রত্যাশার পারদ আরো উঁচুতে। আগে তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া দলটির চতুর্থ শিরোপা আসবে ঘরের মাঠে- সে প্রত্যাশায় বিশ্বকাপ দেখার প্রস্তুতি। এবার আগে থেকেই সম্ভাব্য তারকাদের সম্পর্কে জানতে শুরু।

’৯০ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত দলই ছিল ইতালির। গোলপোস্টের নিচে ওয়াল্টার জেঙ্গা, তার সামনে ফ্রাঙ্কো বারোসি, জিউসেপ্পে বার্গোমি, পাওলো মালদিনির মতো ডিফেন্ডার। মাঝমাঠে রবার্তো ডোনাডুনি, কার্লো আনচেলত্তি, আক্রমণভাগে জিয়ানলুকা ভিয়াল্লি, রবার্তো ব্যাজিও ও সালভাতোরে সিলাচির মতো ফুটবলার নিয়েও ঘরের মাঠে পারলো না ইতালি।

Italy

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ষোলোতে উঠে উরুগুয়েকে উড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেলো নীল জার্সিধারীরা। সালভাতোরে সিলাচির গোলে আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে সঠিক পথে থেকেই এগুতে লাগলো ইতালিয়ানরা; কিন্তু সেমিফাইনালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেয় স্বাগতিকরা।

১৭ মিনিটে সিলাচির গোলে উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছিল ন্যাপোলির সান পাওলো স্টেডিয়ামে; কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার হেডে প্রথমবারের মতো পরাজিত হলো ওয়াল্টার জেঙ্গা। বিশ্বকাপে ৫১৮ মিনিট পর জেঙ্গার প্রথম গোল খাওয়ার ম্যাচ হেরে ইতালিও বিদায় নেয় ঘরের বিশ্বকাপ থেকে। স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে তৃতীয় হওয়ার সান্ত্বনা নিয়ে মিশন শেষ করে ইতালি।

১৯৮২ সালের পর ইতালি আর ‘ইতালি’র মতো পারফর্ম করতে পারছিল না বিশ্বকাপে। ফ্রাঙ্কো বারোসি ও পাওলো মালদিনিরা পারেননি ১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠিয়েও ইতালিকে ট্রফি উপহার দিতে।

Italy

ফাইনালে টাইব্রেকারে গিয়ে রবার্তো ব্যাজিওর মিসের কারণে ৩-২ ব্যবধানে হেরে যায় ব্রাজিলের কাছে। ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে ইতালিকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত তুলতে পেরেছিলেনে পাওলো মালদিনি-বার্গোমিরা। ২০০২ জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের শেষ ষোলো রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ইতালি স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে।

জার্মানি বিশ্বকাপে চতুর্থবারের মতো ট্রফি জেতার পরের আসরে ইতালি বাদ পড়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইতালি দুটি ড্র করে প্যারাগুয়ে ও সুইজারল্যান্ডের সাথে। স্লোভাকিয়ার কাছে ৩-২ গোলে হেরে গ্রুপে চতুর্থ হয়ে বিদায় নেয় ক্যানাভারো-ডেনিয়েল ডি রসিরা।

২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেও বিদায় নেয় ইতালি। বুফন-বালোতেল্লিরা গ্রুপ পর্বে শুধু ইংল্যান্ডকে হারাতে পেরেছিল। পরের দুই ম্যাচে কোস্টারিকা এবং উরুগুয়ের কাছে হেরে লজ্জার সঙ্গে মাথা নত করে বিদায় নেয় চারবারের চ্যাম্পিয়নরা।

Italy

দিনো জফদের জয় করা ট্রফি অবশেষ ইতালির হাতে আবার আসে ২৪ বছর অপেক্ষা শেষে ২০০৬ সালে। জার্মানি বিশ্বকাপে ফ্যাভিও ক্যানাভারো, আন্দ্রে পিরলো, মার্কো মাতেরাজ্জি, ড্যানিয়েল ডি রোসি আর ফিলিপ্পো ইনজাগিরা মিলে জিনেদিন জিদান-থিয়েরি অঁরির ফ্রান্সকে হারিয়ে ইতালিয়ানদের উপহার দেন বিশ্বকাপের চতুর্থ ট্রফি।

বিশ্বকাপের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য নাম ইতালির; কিন্তু সেই নীল জার্সিধারীরা এবার নেই রাশিয়া বিশ্বকাপে। বাছাই পর্বের বেড়া’ই পার হতে না পেরে আজ্জুরিরা এখন রীতিমতো দর্শক। দীর্ঘ ৬০ বছর পর বিশ্বকাপ এখন নীল রঙহীন। ১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব টপকাতে পারেনি ইতালি। তারপর এবার। ইতালি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার পর দেশটির সাবেক অধিনায়ক দিনো জফ তো বলেই দিয়েছেন, ‘ইতালি ছাড়া বিশ্বকাপ তো আর বিশ্বকাপ নয়!’

সবচেয়ে বেশি বয়সি অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড করা দিনো জফ চরম হতাশ হয়েছেন যখন তার উত্তরসূরীরা বাছাই পর্বই টপকাতে পারেনি। সুইডেনের কাছে বাছাই পর্বের প্লে-অফে হেরে বিশ্বকাপের রোড থেকে ছিটকে পড়ে ইতালি।

সুইডেনের মাঠে ১-০ গোলে হেরে আসা ইতালির ঘরের মাঠে প্রয়োজন ছিল ২-০ ব্যবধানের জয়। ১-০ গোলে জিতলেও ম্যাচটাকে টেনে নিতে পারতো অতিরিক্ত সময়ে; কিন্তু মৌমাছির মতো আক্রমণ করেও গোল আদায় করতে পারেনি ইতালির ফরোয়ার্ডরা। খেলাধুলায় ভাগ্যও যে বড় একটা ব্যাপার, তা আরো একবার প্রমাণ হয়েছে ওই ম্যাচে।

Italy

সুইডেন নামটি দুঃখ হয়েই থাকলো ইতালিয়ানদের কাছে। ১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপে উঠতে পারেনি ইতালি। সেই সুইডেন ৬০ বছর পর হয়ে গেলো ইতালিয়ানদের হন্তারক। হাজার হাজার দর্শকের কন্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল সানসিরো স্টেডিয়াম। চোখের পানি ছেড়েছেন পুরো ইতালির মানুষ। এভাবে একচেটিয়া প্রধান্য নিয়ে খেলেও ম্যাচ জেতা যায় না? ২৭টি শট নিয়ে একটিও সুইডেনের জালে প্রবেশ করাতে পারেনি ইতালি ফরোয়ার্ডরা।

সবচেয়ে বেশি পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল। চারবার করে বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিলের পেছনে ইতালি এবং জার্মানি। ১৯৫৮ থেকে ২০১৮ সাল। পাঁচ যুগ পর বিশ্বকাপে দেখা যাবে না আজ্জুরিদের।

বিশ্বকাপ মানে ফুটবলের বিশাল আকাশ। আর এতদিন সে আকাশের ধ্রুবতারার মতো ছিল ইতালি। বিশ্বকাপ যদি সাতরঙা রংধনু হয়ে থাকে, তবে এবার সেই রংধনুতে নীলের ছটা নেই। রাশিয়ার গ্যালারিগুলোতেও উঠবে না এবার আর নীলের ঢেউ। একটা অব্যক্ত হাহাকার তাতে যেন ছড়িয়ে পড়বে পুরো বিশ্বকাপজুড়ে। নীল ছাড়া যেমন আকাশকে মানায় না। তেমনই ইতালি ছাড়া বিশ্বকাপ। নীল খসে যাওয়ায় অনেকটাই ফ্যাকাশে হয়ে উঠবে রাশিয়া বিশ্বকাপের আকাশ।

আরআই/আইএইচএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]