`সহকর্মীদের করুণ মৃত্যু পীড়া দিচ্ছে’
শোলাকিয়ার জঙ্গি হামলা সম্পর্কে বলতে গিয়ে কিশোরগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক মুর্শেদ জামান বলেন, ‘জীবন বাজি রেখে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। অভিযান সফল হলেও সহকর্মীদের করুণ মৃত্যুর ঘটনাটি পীড়া দিচ্ছে।’
শোলাকিয়ায় হামলার পর থেকে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে ওসি মীর মোশারফ হোসেন ও পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মুর্শেদ জামানের সাহসিকতার কাহিনী। এরই মধ্যে তাদের ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। পুলিশের আইজি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ দুই পুলিশ কর্মকর্তার সাহসিকতার প্রশংসা করছেন।
জানা গেছে, ঈদের দিন সকালে শোলাকিয়া ঈদগাহের ভিআইপি গেটে দায়িত্ব পালন করছিলেন কিশোরগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর মোশারফ হোসেন ও একই থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মুর্শেদ জামান। ঈদের জামাত শুরু হওয়ার কথা সকাল ১০টায়। এরই মধ্যে দুই লাখেরও বেশি মুসল্লি মাঠে প্রবেশে করেছেন। তখনও শোলাকিয়ার পথে লাখো মানুষের স্রোত।
সকাল পৌনে ৯টার দিকে ওই দুই কর্মকর্তা ওয়ারলেসে শুনতে পারেন ‘আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। আমাদের বাঁচাও। আমরা মরে যাচ্ছি’ পুলিশের এমন করুণ আর্তনাদ। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন প্রথমে ম্যাসেজ রিপ্লাই দিয়ে জানতে পারেন ঈদগাহের পাশে আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন মুফতি মুহাম্মদ আলী জামে মসজিদের সামনে পুলিশের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে।
খবর পেয়েই এসপির নির্দেশে ওসি মোশারফ ও ইন্সপেক্টর মুর্শেদ জামান কয়েকজন ফোর্স নিয়ে দৌড়াতে থাকেন ঘটনাস্থলের দিকে। আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের রাস্তা ধরে কিছুটা আগানোর পর তারা জানতে পারেন সামনের মোড়ে জঙ্গিরা পুলিশের ওপর হামলা করেছে। এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। সন্ত্রাসীরা ঘটনাস্থলে তখনও তাণ্ডব চালাচ্ছে। তারা উদ্ধার করতে আসা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে।
ওসি মোশারফ হোসেন সে সময় পুলিশের পোশাক পরিহিত ছিলেন। কিন্তু মুর্শেদ জামান ছিলেন সিভিলে। তার কাছে কোনো অস্ত্রও ছিল না। এ অবস্থায় একজন কনস্টেবলের কাছ থেকে একটি চাইনিজ রাইফেল নিয়ে তিনি রাস্তার পাশে গাছের আড়ালে অবস্থান নিয়ে গুলি করতে থাকেন। আর ওসি মোশারফ হোসেনও একটি বন্দুক নিয়ে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছেন। এভাবে দুই কর্মকর্তার নেতৃত্বে ১০/১২ জন পুলিশ সদস্য প্রাথমিক অবস্থায় সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করে পৌঁছান ঘটনাস্থলে। আহত পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ওসি মোশারফ হোসেন জানান, রাইফেল হাতে একটি বাড়ির পুরনো দেয়ালের আড়াল থেকে সন্ত্রাসীদের গুলি করছিলাম। একপর্যায়ে আমার বন্দুকের গুলি শেষ হয়ে যায়। তখন মুর্শেদ জামানকে কভার করতে বলি। এ সময় সন্ত্রাসী আবিরের পিস্তলের চেম্বার জ্যাম হয়ে যায়। গুলি করতে না পেরে সে চাপাতি নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। এ সময় মুর্শেদ তার পায়ে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে অন্য পুলিশ সদস্যরা তাকে ব্রাশফায়ার করে। 
তিনি আরো জানান, আবির নিহত হওয়ার পর সন্ত্রাসী শফিকুলের অস্ত্রের গুলিও শেষ হয়ে যায়। সে গ্রেনেড ফাটিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে আহত অবস্থায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরই মধ্যে বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চারদিকে ঘিরে ফেলে। সন্ত্রাসী জাহিদ ওরফে তানিম পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে তার গায়ের পোশাক পরিবর্তন করে পালানোর চেষ্টা করলে সেখান থেকে তাকেও গ্রেফতার করা হয়।
পরিদর্শক মুর্শেদ জামান জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহত ও আহত সহকর্মীদের রক্ত দেখে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেই যেভাবেই হোক জঙ্গিদের ধরতে হবে। না হয় তারা পালানোর সময় আরও নাশকতা ঘটাতে পারে। এ সময় পুলিশের সংখ্যা সেখানে খুব বেশি ছিল না। তাই এক কনস্টেবলের কাছ থেকে চাইনিজ রাইফেল নিয়ে সন্ত্রাসীদের মোকাবেলায় এগিয়ে যাই। তখনো মনে হয়নি নিজের গায়ে বুলেটগপ্রুফ জ্যাকেট নেই। ওসি সারের নির্দেশে জীবন বাজি রেখে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাই।
হামলার ঘটনার পর মুর্শেদ জামানকেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি আমার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। হামলার ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোই হবে আমার আসল কাজ।’
এসএস/পিআর