হাজার নিদর্শনের জাদুঘরে দিনে দর্শনার্থী আসে মাত্র ২৫-৩০ জন
খুলনার শিববাড়ি মোড়ে অবস্থিত বিভাগীয় জাদুঘর। বিভাগীয় এই জাদুঘরে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন সময়ের প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ। তবে দর্শনার্থী নেই বললেই চলে। দিনে দর্শনার্থী আসেন মাত্র ২৫-৩০ জন।
খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর সূত্রে জানা যায়, প্রত্নতত্ত্ব এই জাদুঘরে প্রায় এক হাজার প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে ব্রেইল পদ্ধতির কিছু নিদর্শন। খুলনা অঞ্চল ছাড়াও ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, কুমিল্লা ও নওগাঁ অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন রয়েছে জাদুঘরে।
জাদুঘরের গেটের পাশেই রয়েছে টিকিট কাউন্টার। জনপ্রতি টিকিটের দাম ২০ টাকা। তবে পাঁচ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের জন্য টিকিটের দরকার পড়ে না। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। সার্কভুক্ত বিদেশি দর্শনার্থীর জন্য টিকেট মূল্য ১০০ টাকা এবং অন্য বিদেশি দর্শকদের জন্য টিকিটের মূল্য ৩০০ টাকা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জাদুঘরের গ্যালারিগুলোতে স্থান পেয়েছে খুলনা ও খুলনার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত প্রত্নসম্পদ। এরমধ্যে ভরত ভায়না বৌদ্ধমন্দির, পীরপুকুর মসজিদ, দমদম পীরস্থান ঢিবি, খানজাহান আলীর (র.) বসতভিটা, গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, সাতগাছিয়া মসজিদসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নিদর্শন।
খ্রিষ্টীয় ১৭০০-১৯০০ শতকের বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত আরবি ও ফারসি হস্তাক্ষর লিপিও রয়েছে গ্যালারিতে। পাশাপাশি রয়েছে মাটির প্রদীপ, লিপিকার ফাতেহ আলী সিরাজীর হস্তলিপি, রাজা সীতারাম রায়ের সপ্তদশ শতাব্দিতে ব্যবহৃত কাঠের পালঙ্ক, কপিলমুনি ঢিবি গুচ্ছ থেকে উদ্ধার হওয়া পোড়ামাটির সামগ্রী, পোড়ামাটি ও শামুকের তৈরি চুড়ি, পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, পিরিচ, থালা, লোহার পেরেক, মহাস্থানগড় ও মঙ্গলকোট থেকে সংগৃহীত পোড়ামাটির ফলকচিত্র, তামার তৈরিপাত্র, মূল্যবান পাথরের পুঁতি, বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্র, ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা, মসৃণ কালো মৃৎপাত্র এবং পোড়ামাটির ফলকে চিত্রিত মানুষের মাথার অংশ, লালমাই ময়নামতি অঞ্চলে অবস্থিত শালবনবিহার, আনন্দবিহার, ভোজবিহার, রানীরবাংলো, ইটাখোলা মুড়া, রূপবান মুড়া, কুটিলা মুড়া ও চারপত্র মুড়া প্রত্নস্থান থেকে সংগৃহীত প্রত্নসম্পদ ইত্যাদি।
আরও পড়ুন:
হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর
জিয়া স্মৃতি জাদুঘর দ্রুত হেরিটেজ ঘোষণা করা হবে: অর্থমন্ত্রী
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুঘর চালু মিশরে, কী আছে সেখানে?
রক আর পপ সংগীতের আগ্রাসনে নিভৃতে কাঁদে দেশি বাদ্যযন্ত্র
জাদুঘরে গিয়ে আমরা কী শিখছি?
মক্কায় কোরআন জাদুঘরের উদ্বোধন
জাদুঘর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর হওয়ায় দর্শনার্থীদের আনাগোনা একটু কম। দিনে গড়ে ২৫-৩০ জনের মতো দর্শনার্থী আসেন। তবে দিবস বা বিশেষ দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়।
জাদুঘরে কথা হয় জাফর আহমেদের সঙ্গে। যশোরে তার লাইব্রেরি রয়েছে। খুলনায় ব্যবসায়িক কাজে এসেছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘খুলনায় বই সংগ্রহের জন্য এসেছিলাম। হাতে সময় থাকায় জাদুঘরে ঘুরতে এসেছি। ভালোই লাগছে। মানব সভ্যতার আধুনিকায়ন যে ধাপে ধাপে হয়েছে, তা জাদুঘরে না এলে অনেকেই বুঝতে পারবে না।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইমুন ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাদুঘরে সংরক্ষিত নিদর্শন দেখলে প্রাচীনকালে মানুষের কর্মজীবন এবং আধুনিকায়নের মধ্যে তুলনা করা যায়। আমি অনেক জায়গার জাদুঘরে ঘুরেছি। এতে আমার কাছে মনে হয়েছে, দেশের জাদুঘরগুলো আরও সমৃদ্ধ হওয়া দরকার। খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরের ক্ষেত্রেও আমার একই পরামর্শ।’
ইতিহাসের অনেক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রয়েছে, যা অনেক সময় আর্কাইভে স্থান পেলেও জাদুঘরে স্থান পায় না। এজন্য জাদুঘরের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদ আলম।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাদুঘরে ঐতিহাসিক সম্পদ সংরক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্য জড়িত এমন সম্পদও সংরক্ষণে সরকার এবং সামাজিকভাবে আমাদেরকেও উদ্যোগী হতে হবে। জাদুঘর গবেষক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য আরও উন্মুক্ত করতে হবে। তাহলে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষেরও একটা সম্পর্ক গড়ে উঠবে।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার মোসা. আইরীন পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রত্নসম্পদ উদ্ধারে আমরা সবসময় কাজ করছি। পাশাপাশি প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণ ও সংস্কারের কাজও চলামান।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ দিনে ও জাতীয় দিবসে দর্শনার্থীরা বেশি আসেন। প্রতিদিন অফিস ছুটি হয় ৪টায়। এজন্য সময় বাড়িয়ে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর খোলা রাখা হচ্ছে।’
এসআর/জেআইএম