জীর্ণ ভবনের স্যাঁতসেঁতে ঘরে শত বছরের ইতিহাস
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর গ্রামের এক সাদামাটা একতলা ঘরে ঢুকতেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙক্তি। দেওয়ালে লেখা সেই লাইনগুলো যেন মনে করিয়ে দেয় এখানে সংরক্ষিত রয়েছে বহু বিস্মৃত, নীরব ইতিহাসের গল্প। ভেতরে প্রবেশ করলেই অনুভব করা যায় এটি শুধুই একটি ঘর নয়; বরং অতীতকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য প্রয়াস।
এই সংগ্রহশালার নাম চলনবিল জাদুঘর। চলনবিল অঞ্চলের কোলঘেঁষা এই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় কিংবদন্তি অধ্যাপক, লেখক ও গবেষক আবদুল হামিদ। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু হয় এই প্রতিষ্ঠানটির, যা পরে ১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে আসে।
জাদুঘরের প্রথম কক্ষেই সাজানো রয়েছে কয়েকশ বছরের পুরোনো পুঁথি— মনসামঙ্গল, সত্যপীরের পাঁচালি থেকে শুরু করে গাছের বাকলে লেখা সংস্কৃত দলিল। পাশাপাশি রয়েছে মোগল আমলের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যেমন বাদশাহ আলমগীর ও সম্রাট নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের হাতে লেখা কোরআন শরিফ। তুলট কাগজে লেখা শতবর্ষ পুরোনো কোরআন, হাদিস ও মহারানি ভবানীর দলিলসহ অসংখ্য ধর্মীয় গ্রন্থ কাচের আলমারিতে সযত্নে রাখা হয়েছে।
একই কক্ষে দেখা মেলে পোড়ামাটির তৈরি মনসাঘট, যেখানে সাপের বিচিত্র মূর্তি খোদাই করা। এগুলো উদ্ধার করা হয়েছিল চলনবিল এলাকার বিভিন্ন খননকাজ থেকে। পাশাপাশি রয়েছে বিল অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার সরঞ্জাম, বিরল উদ্ভিদের নমুনা এবং উটের চামড়ায় তৈরি একটি প্রাচীন ইসলামি ব্যানার।

জাদুঘরের কর্মচারী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, অনেক মূল্যবান জিনিস এখানে আছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় আমরা ঝুঁকির মধ্যে আছি। বর্ষাকালে আর্দ্রতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
জাদুঘরের আরেক অংশে সংরক্ষিত আছে নাটোরের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি। পণ্ডিত বড়দা প্রসাদ শাস্ত্রীর আবক্ষ মূর্তি, ভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ব্যক্তিগত ডায়েরি এবং ক্ষুদ্রাকৃতির হস্তলিপি দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। পাশাপাশি রয়েছে কষ্টিপাথরের মূর্তি, টেরাকোটা নিদর্শন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুদ্রা।
দ্বিতীয় কক্ষে রয়েছে আরও বিস্ময়কর সংগ্রহ— বহুমাথা বিশিষ্ট বাঁশ, প্রাচীন ইট-পাথর, ধাতব তৈজসপত্র, এমনকি চলনবিল অঞ্চলের দস্যুদের ব্যবহৃত অস্ত্র। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের একটি কপিও, যা জাদুঘরের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ।
প্রথমে একটি বিদ্যালয়ের ভবনে যাত্রা শুরু হলেও পরে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় জাদুঘরের জন্য আলাদা ভবন নির্মিত হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় বর্তমানে কেবল নিচতলার দুটি কক্ষেই সীমাবদ্ধ কার্যক্রম।
আরও পড়ুন-
বরেন্দ্র জাদুঘরের ১৭ হাজার নিদর্শনের ১৬ হাজারই গুদামবন্দি
বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম
ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব ঠিকানা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর
৪২০ নিদর্শনে সুলতানি আমলের হাতছানি
ফসিল থেকে একতারা—সবই আছে, নেই শুধু দর্শনার্থী
বর্তমানে এটি বগুড়ার মহাস্থানগড় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও প্রতি রোববার বন্ধ থাকে।

নাটোর শহর থেকে ঘুরতে আসা কলেজছাত্রী সুমাইয়া খাতুন বলেন, ‘এখানে এসে মনে হলো ইতিহাসের ভেতর ঢুকে পড়েছি। এত পুরোনো জিনিস একসঙ্গে আগে কখনো দেখিনি। তবে পরিবেশটা একটু উন্নত হলে আরও ভালো লাগত।’
জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক এম এ হামিদের মৃত্যুর পরও তার স্বপ্ন বয়ে চলেছে এই প্রতিষ্ঠান। তার উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল চলনবিল অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস উদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা।
খুবজীপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, এই জাদুঘরটা আমাদের এলাকার গর্ব। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, কিন্তু এখন এর অবস্থা দেখে খারাপ লাগে। ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে এটা বড় পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে।
তবে জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। ২০১৬ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক খলিলুর রহমান পরিদর্শন করে ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা ও সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন।

চলনবিল গবেষক আকরাম হোসেন সরকার বলেন, চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাস জানার জন্য এই জাদুঘরের বিকল্প নেই। সরকারিভাবে আরও উদ্যোগ নিয়ে এটিকে আধুনিকভাবে গড়ে তোলা জরুরি।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী মিজানুর রহমান বলেন, এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক। যথাযথ পরিচর্যা না পেলে একসময় এই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যাবে।
রেজাউল করিম রেজা/এফএ/এএসএম