ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব ঠিকানা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১২:৩৯ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর। ছবি/ জাগো নিউজ

রয়েছে পাঁচটি ভিন্ন গ্যালারি
রয়েছে সাহিত্যবিশারদ গ্রন্থাগার
এটিই দেশের একমাত্র একাডেমিক জাদুঘর

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশেই গড়ে উঠেছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক নীরব ঠিকানা। চারপাশে সবুজ গাছপালা ও নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর। যা শিক্ষার্থীদের পছন্দের দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে।

ক্লাসের ফাঁকে, অবসরে কিংবা গবেষণার প্রয়োজনে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন শিক্ষার্থীরা। কেউ ইতিহাস জানতে আসেন, কেউ গবেষণার কাজে, আবার কেউ শুধুই ঘুরে দেখতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য অনেক স্থাপনার মতো এই জাদুঘরও শিক্ষার্থীদের কাছে আলাদা আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব ঠিকানা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর

জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে পাঁচটি গ্যালারি— প্রাগৈতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ব গ্যালারি, প্রাচীন ভাস্কর্য গ্যালারি, ইসলামিক শিল্পকলা গ্যালারি, লোকশিল্প গ্যালারি এবং সমকালীন শিল্পকলা গ্যালারি। প্রতিটি গ্যালারিতেই সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন যুগের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে মুঘল আমলের কামান ‘সার জং’। সম্রাট শাহজাহানের আমলে ব্যবহৃত প্রায় ১৯৭ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের এই কামানটি সূক্ষ্ম কারুকাজের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এছাড়া প্রাচীন মুদ্রা, শিলালিপি, হাতে লেখা পবিত্র কোরআন, টেরাকোটা ফলক, ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, লোকজ সামগ্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও পোস্টারও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্র।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব ঠিকানা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর

জাদুঘর ঘুরতে এসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর পরিদর্শন করে খুব ভালো লেগেছে। এখানে ইতিহাসের অনেক পুরোনো নিদর্শন স্বচক্ষে দেখতে পেরেছি, যেগুলো বাস্তব ইতিহাসেরই অংশ। বিশেষ করে মুঘল আমলের স্থাপত্য নিদর্শন দেখতে পেয়েছি। বইয়ে যা পড়ি, এখানে এসে তা আরও সহজে বোঝা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম বলেন, চবি জাদুঘর যেন জীবন্ত ইতিহাস। প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নানা নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত আছে। আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব ঠিকানা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর

শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবেই নয়, গবেষণার ক্ষেত্রেও জাদুঘরটির গুরুত্ব অনেক। নিচতলায় রয়েছে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ গ্রন্থাগার। এখানে বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি, আরবি ও পালি ভাষার বহু দুর্লভ পুঁথি সংরক্ষিত আছে। গবেষকদের জন্য রয়েছে আলাদা পাঠকক্ষ। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নিয়মিত এই গ্রন্থাগার ব্যবহার করেন।

জাদুঘর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এখানে দুই হাজারের বেশি প্রত্নসম্পদ সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্ম, সুলতানি ও মুঘল আমলের মুদ্রা, পাথর ও ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, টেরাকোটা ফলক, লোকশিল্প, মুক্তিযুদ্ধের দলিল এবং আদিবাসী অলংকার। সবচেয়ে পুরোনো সংগ্রহগুলোর একটি হলো নাসিরাবাদ পাহাড় থেকে পাওয়া টারশিয়ারি যুগের মাছের জীবাশ্ম।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব ঠিকানা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর

১৯৬৬ সালে মাত্র ২৪টি প্রত্ননিদর্শন দিয়ে জাদুঘরটির যাত্রা শুরু হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ড. এ আর মল্লিক এবং ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিমের উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রত্নসম্পদ সংগ্রহ করা হয়। ১৯৭৩ সালের ১৪ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর। বর্তমানে এটি দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর হিসেবে পরিচিত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের সুপারভাইজার আলী হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর বাংলাদেশের একমাত্র একাডেমিক জাদুঘর। এখানে পাঁচটি গ্যালারিতে বিভিন্ন যুগের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও গবেষক নিয়মিত এখানে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিকল্পনা রয়েছে ভবিষ্যতে জাদুঘরটিকে আরও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করার।

মোস্তাফিজুর রহমান/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।