বাগেরহাট জাদুঘর
৪২০ নিদর্শনে সুলতানি আমলের হাতছানি
একতলা ভবনের তিনটি গ্যালারি। ভেতরে কাচের মধ্যে সাজিয়ে রাখা সুলতানি আমলের বিভিন্ন নিদর্শন। কোনোটির বয়স ৫০০ বছর, কোনোটি আবার তারচেয়েও বেশি।
বলা হচ্ছে বাগেরহাট জাদুঘরের কথা। ইতিহাস সংরক্ষণ করতে ১৯৯৫ সালে বাগেরহাট শহরের সুন্দরঘোনায় ষাট গম্বুজ মসজিদ চত্বরের দক্ষিণ পূর্ব কোণে নির্মাণ করা হয় জাদুঘরটি। মুসলিম সংস্কৃতি, খানজাহান আলীর (রহ.) স্মৃতি ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষিত স্থাপনাটির নামকরণ করা হয় ‘বাগেরহাট জাদুঘর’। ২০০১ সালে এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

সুলতানি আমলের নানা প্রত্নবস্তু ও ঐতিহাসিক প্রদর্শনী সামগ্রী দেখতে প্রতিদিন এই জাদুঘরে ভিড় করেন দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরা। জাদুঘরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে প্রাচীন মসজিদের অলঙ্কৃত ফলক ও ইট, পুষ্পশোভিত ইট, প্রাচীন বাটখারা, কালির দোয়াত, পোড়ামাটির কারুকাজ, পোড়ামাটির পাইপ, পোড়ামাটির শিকল, তৈল প্রদীপ, শঙ্খের খোলক, আরবি অঙ্কিত লিপি ও খানজাহানের বসতভিটা থেকে প্রাপ্ত পানপাত্রসহ ৪২০টির বেশি প্রদর্শনী সামগ্রী। প্রতিটি নিদর্শনের পাশেই রয়েছে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, যা দর্শনার্থীদের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা দর্শনার্থী আব্দুল কুদ্দুস জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে এসে যা কিছু দেখলাম সবকিছু শিকড়ের টান। অতীতে আমাদের মানবজাতির জীবনযাপন কেমন ছিল, তাদের সংস্কৃতি কেমন ছিল—তারই ঐতিহ্য ধারণ করে আমাদের এই জাদুঘর। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমরা অতীতকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি। আমরা আমাদের শিকড়কে হারাতে শুরু করেছি। শুধু বাগেরহাট নয়, সারাদেশের জাদুঘরে আমাদের বাঙালি ও মুসলমানদের যে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আছে, সেগুলো স্মৃতিস্বরূপ ধরে রেখে এগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রচার করা দরকার।’

আরও পড়ুন:
হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর
কড়ি থেকে কাগুজে নোটের সমাহার ‘টাকা জাদুঘর’
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুঘর চালু মিশরে, কী আছে সেখানে?
এত নিরাপত্তার পরও ল্যুভর মিউজিয়ামে কীভাবে হলো দুর্ধর্ষ চুরি?
আরেক দর্শনার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘এই জাদুঘরে আগেও দুইবার এসেছি, আজ আবার এলাম। এখানকার অনেক পুরোনো নিদর্শনগুলো দেখছি। আগেরকার মানুষের জীবনযাপন ও তাদের সংস্কৃতি দেখতে ভালোই লাগে।’
‘জাদুঘরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে প্রাচীন মসজিদের অলঙ্কৃত ফলক ও ইট, পুষ্পশোভিত ইট, প্রাচীন বাটখারা, কালির দোয়াত, পোড়ামাটির কারুকাজ, পোড়ামাটির পাইপ, পোড়ামাটির শিকল, তৈল প্রদীপ, শঙ্খের খোলক, আরবি অঙ্কিত লিপি ও খানজাহানের বসতভিটা থেকে প্রাপ্ত পানপাত্রসহ ৪২০টির বেশি প্রদর্শনী সামগ্রী’
চিতলমারী থেকে এসেছেন বাদশা শেখ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে দাদারও দাদার আমলের জিনিসপত্র দেখে ভালোই লাগছে। সকাল থেকে ঘুরেফিরে দেখছি। এখানে কালাপাহাড়ের মমি রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, খানজাহান আলী (রহ.) এই কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড়ের পিঠে চরেই বাগেরহাটে এসেছিলেন।’

বাগেরহাট জাদুঘর অনেক সমৃদ্ধ বলে মনে করেন ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ক গবেষক সুব্রত কুমার মুখার্জি।
‘বাগেরহাট জাদুঘর একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। বিশেষ করে সুলতানি আমলের নিদর্শন ও পুরাকীর্তি নিয়ে জাদুঘরটি নির্মিত। এই অঞ্চলের ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত নিদর্শন নিয়ে জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে’—কাস্টডিয়ান
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে খানজাহান আমলের অনেক নিদর্শন রয়েছে। এই জাদুঘরে এলে প্রাচীন আমলেও মুসলিম স্থাপত্যের যে সমৃদ্ধ ছিল সেটি বোঝা যায়। তবে এই জাদুঘরকে আরও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। বাগেরহাটের আরও ঐতিহ্য ও বিভিন্ন পুরাকীর্তি, প্রত্নতত্ত্ব এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য এসব জাদুঘরে যুক্ত করা যেতে পারে।’

বাগেরহাট জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মো. যায়েদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাগেরহাট জাদুঘর একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। বিশেষ করে সুলতানি আমলের নিদর্শন ও পুরাকীর্তি নিয়ে জাদুঘরটি নির্মিত। এই অঞ্চলের ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত নিদর্শন নিয়ে জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে। খানজাহান আলীর (রহ.) বসতভিটা খনন করে যে প্রত্নতত্ত্ব পাওয়া গেছে, সেগুলোও গ্যালারিতে সাজানো হয়েছে। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন দর্শনার্থীরা এসে বাগেরহাটের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন।’

জাদুঘরটি দেখতে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে বলেও জানান তিনি। কাস্টডিয়ান মো. যায়েদ বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় চার লাখ দর্শনার্থী এসেছিল। চলতি অর্থবছরে সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করি।’
নাহিদ ফরাজী/এসআর/এএইচ/এমএস