হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে বিক্রমপুর জাদুঘর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মুন্সিগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৭:৪১ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
যদুনাথ রায় বাহাদুরের জমিদার বাড়ি। পরবর্তীতে এটিকেই জাদুঘরন করা হয়। ছবি/ জাগো নিউজ

দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে একদিকে বয়ে গেছে প্রমত্তা পদ্মা আর অন্য প্রান্তে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাহার আড়িয়াল বিল। বিলের ধারেই ভাগ্যকূলের বালাশুর গ্রামে যদুনাথ রায় বাহাদুরের জমিদার বাড়ি।

লোকমুখে কথিত আছে, এক সময় এ বাড়িতে পূর্ণিমা তিথিতে খুব ঘটা করে পালন হতো রাশ উৎসব। এখন খুব ঘটা করে রাশ উৎসব না হলেও আশ্বিন মাসে জাঁকজমক করে দুর্গা মন্দিরে দুর্গাপূজা হয়। প্রতিদিনই মন্দিরের পূজারি শাক বাজিয়ে প্রদীপ জ্বেলে পূজা-অর্চনা করেন এই বাড়ির প্রাঙ্গণে।

মনোমুগ্ধকর পুরোনো প্রাসাদের বাড়িটিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে একই রকম দেখতে কারুকাজ সজ্জিত মুখোমুখি দুটি জরাজীর্ণ প্রাসাদ। আরও আছে কাছারি ঘর, দূর্গা মন্দির, লক্ষ্মী নারায়ণ জিউ মন্দির, কালী মন্দির। বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ সব ফুল ও ফলদ গাছগাছালি। রাজকীয় এই পরিবারের সর্বশেষ জমিদার ছিলেন যদুনাথ রায়।

হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে বিক্রমপুর জাদুঘর

জমিদার বাড়ি থেকে জাদুঘর

স্থানীয় জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জমিদার যদুনাথ রায়ের এ বাড়িটির স্মৃতি রক্ষার্থে প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গাজুড়ে ২০১৩ সালে গড়ে তোলা হয় বিক্রমপুর জাদুঘর। বাড়িটিতে এখনো কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে দুশো বছর আগে নির্মিত মন্দিরসহ বিশাল বিশাল পুরাতন ভবন।

আরও পড়ুন-
ঢাকার জাদুঘরগুলো যেমন আছে, চলছে যেভাবে
৪২০ নিদর্শনে সুলতানি আমলের হাতছানি
ফসিল থেকে একতারা—সবই আছে, নেই শুধু দর্শনার্থী

অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ও তৎকালীন সরকারের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে জাদুঘর ও গেস্ট হাউজ। জাদুঘরের প্রথম তলায় দুইটি গ্যালারি করা হয়। গ্যালারি দুটির নামকরণ করা হয়েছে জমিদার যদুনাথ রায় ও বিজ্ঞানী স্যার জগদ্বীশ চন্দ্র বসুর নামে। আর দ্বিতীয় তলায় মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি।

হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে বিক্রমপুর জাদুঘর

বাড়িটিতে ঢুকেই পুকুরে দেখা মেলে বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নৌকা। তার মধ্যে সাম্পান নৌকাও দেখতে পাবেন। এটি জাদুঘরের প্রতীকী।

বিক্রমপুর জাদুঘরের কিউরেটর নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গা জুড়ে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ও সরকারি অর্থায়নে এই প্রাঙ্গণে বিক্রমপুর জাদুঘর ও গেস্ট হাউজ- ‘পান্হশালা’, নৌ-জাদুঘর বা বোট মিউজিয়াম, শহিদ মুনীর-আজাদ স্মৃতি পাঠাগার, অগ্রসর বিক্রমপুর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তিনি বলেন, রাজধানীতে শত ব্যস্ততার শহরে একটু খোলামেলা জায়গায় দম ফেলার যেন ফুসরত নেই। কাজের ফাঁকে একটু ছুটি পেলেই তাই অনেকেই ছোটেন নিরিবিলি পরিবেশে ঘুরে বেড়াতে। প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে রাজধানীর খুব কাছেই (ঢাকা-মাওয়া হাইওয়েতে) মাত্র ৫০ মিনিটে আসা যায় এ জাদুঘরে।

যা আছে জাদুঘরে

জাদুঘরের কিউরেটর নাছির উদ্দিন আহমেদ জানান, তিনতলা বিশিষ্ট এই জাদুঘরের একই প্রাঙ্গণে রয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট একটি গেস্ট হাউজ। মোট ৭টি গ্যালারিতে রাখা হয়েছে জাদুঘরের গুরুত্বপূর্ণ সব নিদর্শন।

হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে বিক্রমপুর জাদুঘর

নিচতলার বাম পাশের গ্যালারি যদুনাথ রায়ের নামে। এ গ্যালারিতে বিক্রমপুরের প্রাচীন মানচিত্র, বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া মাটির পাত্র, পোড়া মাটির খেলনাসহ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শন আছে।

নিচতলার ডান পাশের গ্যালারিটি স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর নামে। এ গ্যালারিতে আছে ব্যাসাল্ট পাথরের বাটি, গামলা, পাথরের থালা, পোড়া মাটির ইট, টালি ইত্যাদি। এছাড়া বিক্রমপুরের নানা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার ছবিসহ বিভিন্ন নিদর্শন।

এছাড়া জাদুঘরের ভবনের দ্বিতীয় তলার বাম পাশের মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি, ইতিহাস, দলিল, বই ও বিভিন্ন নমুনা। আর ডান পাশের গ্যালারিতে আছে বিক্রমপুরে জন্ম নেওয়া মনীষীদের জীবন ও কর্মের বৃত্তান্ত। আরও আছে কাগজ আবিষ্কারের আগে প্রাচীন আমলে যে ভূর্জ গাছের বাকলে লেখা হতো সেই ভূর্জ গাছের বাকল।

আরও পড়ুন-
১৭০ বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেশের একমাত্র চা জাদুঘর
অস্তিত্ব সংকটে এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর
গুদামেই বন্দি হাজার বছরের অমূল্য প্রত্নবস্তু

পাশাপাশি জাদুঘরের ভবনটির তৃতীয় তলায় তালপাতায় লেখা পুঁথি, পুরাতন খাট পালং, চেয়ার, টেবিল, আলমারি, কাঠের সিন্দুক, আদি আমলের মুদ্রা, তাঁতের চরকা, পোড়া মাটির মূর্তি, সিরামিকের থালাসহ প্রাচীন আমলে স্থানীয় মানুষদের ব্যবহার্য বিভিন্ন নিদর্শন।

ঐতিহ্যের টানে জাদুঘরে

নাছির উদ্দিন আহমেদ জানান, বিক্রমপুরের হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল এতদিন। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের বৌদ্ধনগরীসহ বেশ কিছু প্রত্ননিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়। এর নির্মাণশৈলী শুধু বাংলাদেশের নয়, মানবজাতির ইতিহাসে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হবে।

তিনি আরও জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা বিশেষ দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সফরে আসে শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও সামাজিক সংগঠন ও কর্পোরেট অফিসের উদ্যোগে জাদুঘর প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন হয়ে থাকে। আঞ্চলিক জাদুঘরটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এখানে। মাঝেমধ্যে অনেক বিদেশি পর্যটকও ঘুরতে আসেন জাদুঘরে।

হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে বিক্রমপুর জাদুঘর

কিউরেটর নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশিষ্ট কবি, লেখক, বাচিক শিল্পী এবং পর্যটক এসেছেন বিক্রমপুর জাদুঘর পরিদর্শন করতে। অনেকে শুধুমাত্র বিক্রমপুর জাদুঘর পরিদর্শন করার জন্য ভারত থেকে এসেছেন।

বৃহস্পতিবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ৬ দিন জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

শ্রীনগর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতুর খুব নিকটে জমিদার বাড়িটির অবস্থান হওয়ায় সহজেই রাজধানী ও অন্যান্য জেলা থেকে এসে ঘুরে দেখা যাবে এটি।

কীভাবে যাবেন বিক্রমপুর জাদুঘরে

ঢাকার গুলিস্তান থেকে শ্রীনগর হয়ে দোহারের উদ্দেশে ছেড়ে আসা যেকোনো যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া মাত্র ১০০ টাকা। এছাড়া ঢাকার পোস্তগোলা বুড়িগঙ্গা সেতুর গোড়া থেকেও সেবা পরিবহনে করে যেতে পারেন। সময় লাগবে প্রায় দুই ঘণ্টা। নামতে হবে শ্রীনগর পার হয়ে বালাশুর চৌরাস্তায়। এরপর রিকশা বা অটোবাইক দিয়ে যাওয়া যাবে জমিদার যদুনাথ রায়ের বাড়ি অর্থাৎ বিক্রমপুর জাদুঘর। ভাড়া লাগবে মাত্র ৫০ টাকা। খোলা থাকে শনিবার থেকে বুধবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। শুধুমাত্র বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে। আর শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানে কোনো প্রবেশমূল্য নেই।

প্রাচীন নগরী বিক্রমপুর

প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা গেছে, বিক্রমপুরের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এক সময় পূর্ববঙ্গ বা সমতটের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। আর এ মাটিতেই জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক মনীষী। বিক্রমপুরের মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে হাজার বছর আগের নৌকা, কাঠের ভাস্কর্য, পাথরের ভাস্কর্য, টেরাকোটাসহ অসংখ্য অমূল্য প্রত্নবস্তু।

হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে বিক্রমপুর জাদুঘর

এসব অতীত ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে প্রদর্শনের জন্য অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন এ বিক্রমপুর জাদুঘর। ‘আমরা আলোর পথযাত্রী’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অন্বেষণে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্য

রাজা সীতানাথ রায়ের দুই ছেলে যদুনাথ রায় এবং প্রিয়নাথ রায় চল্লিশের দশকে পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে আড়িয়ল বিলের কিনারে মনোরম জোড়া প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলেন। যদুনাথ রায় বর্তমানের রাড়িখাল ইউনিয়নের উত্তর বালাশুরে (সে সময় ভাগ্যকুল নামে পরিচিত ছিল) হুবহু একই ধরনের দুটি ত্রিতল ভবন নির্মাণ করেন। যার একটি ছিল জমিদার যদুনাথ রায়ের। আর অন্যটি ছিলো তারই ছোট ভাই প্রিয়নাথ রায়ের। সেখানে বিশালাকৃতির দিঘি খনন করেন, নাট মন্দির ও দূর্গামন্দির স্থাপন করেন তিনি।

পূর্বধারের ভবনে থাকতেন যদুনাথ রায় এবং পশ্চিমধারের ভবনে থাকতেন প্রিয়নাথ রায়। তার তিন ছেলে- মেঘনাদ রায়, শরতচন্দ্র রায় ও সতীশচন্দ্র রায়। এই বাড়িতে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিলেন, ছিল সোয়ারেজ লাইন, বিশালাকৃতির দুটি দিঘি, বাড়ি জুড়ে ছিল বহু রকমের ফুল ও ফলের গাছ।

শুভ কুমার ঘোষ/এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।