আহরণী জাদুঘর

৫৫ বছর আগেই চবিতে স্থানান্তর, একাত্তরে লুটপাট

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন
সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন হবিগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৮:৫১ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা প্রতিষ্ঠিত ‘আহরণী জাদুঘর’। একসময় কক্ষটি লোকে লোকারণ্য থাকতো/ছবি-জাগো নিউজ

অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশের প্রথম ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা হবিগঞ্জের আহরণী জাদুঘর। বিশাল সংগ্রহশালার এ জাদুঘরের সম্পদ ৫৫ বছর আগেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন লুটও হয়েছে অনেক দুর্লভ সংগ্রহ। এখন সেটির অস্তিত্ব টিকে আছে একটি লাইব্রেরির মধ্যে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বরেণ্য সাহিত্যিক দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা প্রতিষ্ঠিত বিশাল সংগ্রহশালার লাইব্রেরিটিও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নষ্ট হচ্ছে দুর্লভ বইয়ের অমূল্য ভান্ডার। কবি বাসার লাইব্রেরির কথা জানলেও আহরণী জাদুঘর সম্পর্কে তেমন কারও জানা নেই। একসময়ের লোকে লোকারণ্য কবি বাসার লাইব্রেরিটি এখন অনেকটাই নিস্তব্দ হয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাহিত্যচর্চার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ছাড়া এখন আর কেউ তেমন যাতায়াত করেন না। দিন দিন মানুষ ভুলতে শুরু করেছে বরেণ্য এ সাহিত্যিককে। অথচ সাহিত্যিক দেওয়ান গোলাম মোর্তাজার লেখা বই ভারতের গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল কোর্সে পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয়। বইগুলো হচ্ছে ‘ব্রাহ্মী লিপি ও সম্রাট প্রিয়দর্শী’ এবং ‘বর্ণমালার বোধন বিকাশ ও লিপি সভ্যতার ইতিহাস’।

৫৫ বছর আগেই চবিতে স্থানান্তর, একাত্তরে লুটপাট

কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা ১৯১৯ সালের ১৯ জুলাই হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এ গ্রামেই তার শৈশব কেটেছে। তিনি ভারতের কলকাতা ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব ফাইন আর্টস’-এ পড়াশোনা করেন। শৈশব থেকেই লেখালেখিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি কমপক্ষে ১৬টি বই রচনা করেছেন।

‘কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা তার ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু আমরা তাকে সে অনুযায়ী সম্মান জানাতে পারিনি। তার বই ভিনদেশে পড়ানো হয়। আমাদের দেশে তার বইয়ের কদর নেই। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের’

জীবদ্দশায় ১৯৬৮ সালে কবি শহরের প্রেসক্লাব রোডে অবস্থিত নিজ বাসার একটি কক্ষে আহরণী জাদুঘর, প্রজ্ঞানী পাঠাগার ও চিত্রশালা গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক দুর্লভ জিনিস লুটও হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি জাদুঘরের অবশিষ্টাংশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেন।

৫৫ বছর আগেই চবিতে স্থানান্তর, একাত্তরে লুটপাট

কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে ১৯৯০ সালে জার্মানিতে মৃত্যুবরণ করেন। হবিগঞ্জ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ প্রেসক্লাব সড়কটি তার নামে ‘কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা’ সড়ক নামকরণ করে।

আরও পড়ুন:
অস্তিত্ব সংকটে এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর
বেশিরভাগ সময় গেটে ঝোলে তালা, আসে না পাঠক
বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম
বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘরে নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন
ফসিল থেকে একতারা—সবই আছে, নেই শুধু দর্শনার্থী

স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তোফাজ্জল সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাসাটি নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। এখন তেমন কেউ যাতায়াত করেন না। বইও পড়তে আসেন না। হাতেগোনা কয়েকজন মাঝে মধ্যে এসে বই পড়েন। বই নিয়ে যান। পড়া শেষে আবার ফিরিয়ে দেন।’

৫৫ বছর আগেই চবিতে স্থানান্তর, একাত্তরে লুটপাট

তিনি বলেন, “এই বাসাটি ‘কবি বাসা’ নামেই পরিচিত। কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার লেখা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তিনি আমাদের এ অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার কমপক্ষে ১৬টি প্রকাশনা গ্রন্থ রয়েছে। ১৯৬৮ সালে তিনি আহরণী জাদুঘর এবং প্রজ্ঞানী পাঠাগার গড়ে তুলেছিলেন। আহরণী জাদুঘরে অনেক মূল্যবান সম্পদ ছিল। এর মধ্যে কিছু অংশ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় লুট হয়ে যায়। অবশিষ্টগুলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দান করে দেন।”

‘১৯৬৮ সালে কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা দেশের প্রথম বেসরকারি জাদুঘর ‘আহরণী জাদুঘর এবং প্রজ্ঞাণী পাঠাগার’ ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী তার তিলে তিলে গড়ে তোলা আহরণী জাদুঘর এবং প্রজ্ঞাণী পাঠাগার লুট করে এবং অনেক জিনিস নষ্ট করে ফেলে। স্বাধীনতার পর জাদুঘরের অবশিষ্ট সামগ্রীগুলো তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের জাদুঘরে এবং ঢাকা জাদুঘরে দান করেন’

কবি ও সাহিত্যিক সিদ্দিকী হারুন বলেন, ‘দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা। তিনি পাঠাগার, জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। লিপিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি যেদিকেই হাত দিয়েছেন সেদিকেই অতলস্পর্শী সফলতা পেয়েছেন। রচনাসম্ভার গড়ে তুলেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি নিজের জীবদ্দশায় এখান থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, তার বিষয়ে হবিগঞ্জের মানুষ খুব একটা জানেন না।’

কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজার লিপিতত্ত্ব নিয়ে দুটি গবেষণা গ্রন্থ আছে। এর একটি হলো ‘সম্রাট প্রিয়দর্শী ও ব্রাহ্মী লিপি’, অপরটি হলো ‘বর্ণমালার বোধন বিকাশ ও লিপি সভ্যতার ইতিহাস’। এ দুটি বইয়ের সংকলন অনেক আগে প্রকাশিত হয়েছে। এখন বই দুটির আর কোনো সংকলন নেই। নতুন করে প্রকাশেরও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে জানান সিদ্দিকী হারুন।

হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা তার ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু আমরা তাকে সে অনুযায়ী সম্মান জানাতে পারিনি। তার বই ভিনদেশে পড়ানো হয়। আমাদের দেশে তার বইয়ের কদর নেই। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের।’

৫৫ বছর আগেই চবিতে স্থানান্তর, একাত্তরে লুটপাট

কবির সহকারী ও ভাতিজা পারভেজ চৌধুরী। তিনি জানান, ১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে বাংলা সাহিত্যের পাঠ নির্মাণে কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজার অবদান অপরিসীম। তিনি শুধু কবি সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি মানবসেবার ব্রত নিয়ে জেলার মাধবপুর উপজেলার সুন্ধাদিল গ্রামে ‘দুঃস্থ দুনিয়া’ নামের একটি সেবা সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেবা সংঘের মাধ্যমে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, নিরক্ষর মানুষদের জন্য নৈশস্কুল প্রতিষ্ঠা এবং গ্রামের মানুষদের বিবাদ মেটাতে সালিশের আয়োজন করেন। এ কার্যক্রম যখন সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আইয়ুব (আইয়ুব খান) সরকার এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৬৮ সালে কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা দেশের প্রথম বেসরকারি জাদুঘর ‘আহরণী জাদুঘর এবং প্রজ্ঞাণী পাঠাগার’ ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী তার তিলে তিলে গড়ে তোলা আহরণী জাদুঘর এবং প্রজ্ঞাণী পাঠাগার লুট করে এবং অনেক জিনিস নষ্ট করে ফেলে। স্বাধীনতার পর জাদুঘরের অবশিষ্ট সামগ্রীগুলো তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের জাদুঘরে এবং ঢাকা জাদুঘরে দান করেন। পরবর্তী সময়ে প্রজ্ঞাণী পাঠাগারকে আবার পুনঃগঠিত করেন তিনি।

এসআর/এএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।