পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ্যানা টনক নড়ুক বাহে


প্রকাশিত: ০৮:২৬ এএম, ০৯ এপ্রিল ২০১৫

"নদী ভাঙনে হামারঘরে সগ্যে (সব) গেইচ্যে, আর মাইনস্যের যাতে সর্বনাশ না হয় সেই চেষ্টা করব্যার নাগচ্যি (করছি)। নিজের খ্যায়া বিনা পয়সায় কাজ করতেচ্যি। তবুও যদি পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ্যানা (একটু) টনক নড়ে বাহে।" নদী ভাঙন রোধে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণের কাজ করতে এসে তীর্যক কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ছকু মিয়া (৫৫)।

প্রায় একই সুরে বললেন গৃহবধু ললিতা রাণী (৩৫)। তিনি বললেন, গত বন্যায় ঘর বাড়ি দেবে গেল। এখন কোনো রকমে মাথা গুঁজে আছি কলেজের পাশে বাঁধের ঝুপড়িতে। এখানে মানুষের জন্য কাজ করতে এসেছি। বৃহস্পতিবার গজারিয়া গিয়ে দেখা গেছে বিশাল ওই কর্মকাণ্ড।

গজারিয়ার নদী ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষজন স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাঁশ, চাটাই, বালির বস্তা দিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মাণ করছেন ৯শ’ মিটার একটি বাঁধ। তাদের যুক্তি, এতে ব্রহ্মপুত্র নদীর পানির স্রোত নির্মিত ওই বাঁধে বাঁধাগ্রস্থ হয়ে অন্যদিকে প্রবাহিত হবে। এতে করে নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে বধ্যভূমি, গণকবর, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দিরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

তাদের অভিযোগ, শুকনো মৌসুম পেরিয়ে বর্ষা আসন্ন হলেও সরকার কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ভাঙন প্রতিরোধে কোনো কাজ এখনো হাতে নেয়নি। তাদের লাফ ঝাঁপ শুরু হবে তুমুল বর্ষার মধ্যে। যখন ভাঙনের কবলে পড়ে মানুষের নাভিশ্বাস উঠবে। তাই ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনতা একত্রিত হয়ে স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নদীভাঙন প্রতিরোধ কল্পে ও ব্রহ্মপুত্র  নদের পানির স্রোত অন্যদিকে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে বাঁধ নির্মাণ করছেন।

ভাঙন প্রতিরক্ষা কমিটির আহবায়ক মনিরুল ইসলাম টিপু জাগো নিউজকে জানান, ৯শ’ মিটার দৈর্ঘ্যে ও ২০ মিটার প্রস্থের এ বাঁধটি সফলভাবে নির্মিত হলে ৭১’এর বধ্যভূমি, গণকবর, ফুলছড়ি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ফুলছুড়ি সিনিয়র আলিম মাদ্রসা, দু’টি মন্দিরসহ শহীদ মিনার, সাবেক উপজেলা পরিষদ ভবন এবং নামাপাড়া, কামারপাড়া, সাঘাটার বরমতাইড় গ্রামের শত শত একর আবাদি জমি ও বসতবাড়ি নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

তিনি বলেন, সবাই সহযোগিতা করলে যেকোনো কঠিন কাজ সহজেই করা যায় তার জলন্ত প্রমাণ শত শত লোকের স্বেচ্ছাশ্রমে কাজে অংশগ্রহণ।

গত বন্যার সময় পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি ফুলছড়ি উপজেলার নদী ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শনে এসে গাইবান্ধার ঘাঘট নদীর সীমানা থেকে ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়ার গণকবর পর্যন্ত নদী শাসনের জন্য ৩২০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিলেও আজ পর্যন্ত সে কাজের কোনো হদিস নেই।

স্বেচ্ছাশ্রমে কাজে অংশ নেয়া ননী মোহন দাস বললেন, বাপ-দাদার ভিটামাটি সব হারিয়ে পরিত্যক্ত উপজেলা পরিষদে কোনোমতে মাথাগোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছি। সেটুকুও যাতে নদী গ্রাস করতে না পারে সেজন্যই কাজ করছি। কোনো টাকার বিনিময়ে নয়।

সাঘাটা উপজেলার ভরতখালী ইউপি চেয়ারম্যান সামছুল আজাদ শীতল জাগো নিউজকে বললেন, এলাকার লোকজন যে কাজটি করার চেষ্টা করছেন তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ। নদী ভাঙন রোধে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিলে গজারিয়া ও ভরতখালী ইউনিয়ন রক্ষা পাবে। তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নদী ভাঙন রোধে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

গজারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মনোতোষ রায় মিন্টু জাগো নিউজকে জানান, গত কয়েক বছরে ওই এলাকার অন্তত ৬০টি  বসত বাড়ি, মন্দির, ইদগাহ মাঠ, বেশকিছু আবাদি জমি ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অসহায় পরিবারগুলো এখন উদ্বাস্তু। এ বছর শুকনো মৌসুম পার হয়ে গেলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন পর্যন্ত নদীভাঙনের কাজ শুরু করেনি। তাই সকলে মিলে স্বেচ্ছাশ্রমে একটি বাঁধ নির্মাণ করছি। এটি নির্মিত হলে বিশাল এলাকা নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

ফুলছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, নদী ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে ধর্ণা দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। এলাকার লোকজন উদ্যোগ নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করছেন। তাদের এ কাজ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে সরকারি উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী প্রতিরোধ গড়া সম্ভব নয়।

এমজেড/বিএ/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।