স্বর্ণদ্বীপকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে ত্রিমুখী পরিকল্পনা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি নোয়াখালী
প্রকাশিত: ০৫:৪৪ পিএম, ০২ এপ্রিল ২০১৮

এক সময়ের উত্তাল মেঘনা, দস্যুদের অভয়ারণ্য দুর্গম বিশাল জাহাইজ্জার চর স্বর্ণদ্বীপ এখন সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনার দ্বীপ হিসেবে গড়ে ওঠছে।

স্বর্ণদ্বীপকে সেনাবাহিনীর আধুনিক প্রশিক্ষণ এলাকার পাশাপাশি বনায়ন, খামার ও আর্থ সামাজিকভাবে গড়ে তোলার লক্ষে চলছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপাকালে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে বঙ্গোপসাগর এবং মেঘনা নদীর মোহনায় জেগে ওঠে এই চর। আশির দশকে নদীর এ পথ দিয়ে দেশের বিভিন্নস্থানে মালবাহী কার্গো জাহাজ ও ভারি ট্রলার চলাচল করতো। নব্বইয়ের দশকের কোনো এক সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় একটি জাহাজ ডুবে যায়। এ কারণেই নামকরণ হয় জাহাইজ্জার চর।

Sarnodip-2

এক সময় এর চরে ছিল জলদস্যু ও বনদস্যুদের নিরপাদ আখড়া। নোয়াখালীর মূল-ভূখণ্ড থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, সন্দ্বীপ থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং হাতিয়া থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে এর অবস্থান। প্রাথমিভাবে চরটির দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটার হলেও আজ তা প্রায় ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৪ কিলোমিটার প্রশস্ত।

অর্থ্যাৎ তখনকার ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের স্বর্ণদ্বীপের আয়তন এখন ৪৫০ বর্গকিলোমিটারে এসে পৌঁছেছে। চরের পুরোটাই সমতল। ঝাউ আর কেওড়া গাছ দিয়ে ঘেরা এ চরটির পুরোটাই জুড়ে আছে অসংখ্য ছোট বড় খালে। বর্ষা মৌসুমসহ বছরের বেশির ভাগ সময় থাকে এখানে জলমগ্ন।

২০১২ সালে জাহাইজ্জার চরটিকে সেনবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৩ পদাতিক ডিভিশন এর অধীনে ২০১০ সালে ‘ইনএইড টু সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ এর আওতায় স্বর্ণদ্বীপে কার্যক্রম শুরু করে এবং জাহাইজ্জার চর থেকে স্বর্ণদ্বীপ নামকরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Sarnodip--(3)

২০১২ সালে স্বর্ণদ্বীপের প্রায় ১০ হাজার একর জমি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে সেনবাহিনীর নিজস্ব উদ্যোগে বনাঞ্চল ও দ্বীপটির দুর্গম এলাকায় বোম্বিংয়ের মাধ্যমে কেওড়া গাছের বীজ ছড়ানো হয়।

স্বর্ণদ্বীপের দক্ষিণ পশ্চিমে মেঘনা নদী, পূর্বে সন্দ্বীপ, পশ্চিমে হাতিয়া উপজেলার হরনী, চানন্দী ইউনিয়নসহ চেয়ারম্যান ঘাট এবং উত্তরে সূবর্ণচর উপজেলা। অপরদিকে দক্ষিণ-পূর্বে ঠেঙ্গারচর পেরিয়ে রয়েছে বিশাল বঙ্গোপসার।

সরেজমিনে স্বর্ণদ্বীপ ঘুরে দেখা গেছে, এক সময়ের জলদস্যুদের নিরাপদ অভ্য়ারণ্য জাহাইজ্জার চর বর্তমানে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনায় স্বর্ণদ্বীপ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে চলছে ত্রি-মাত্রিক নানা কর্মযজ্ঞ।

জেলা সদর থেকে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার দূরে এবং সূবর্ণচরের কাটাখাল থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ৬ কিলোমিটার সাগর পথ পেরিয়ে অবস্থিত চারদিকে ধূ-ধূ বালুময় চরটি এখন বনায়ন ও খামার, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও সেনাবাহিনীর জন্য আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকা।

Sarnodip--(4)

স্বর্ণদ্বীপকে আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। মূল-ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে নদী পারাপারের জন্য সেনাবাহিনীর নিজস্ব অর্থায়নে তিনটি ট্রলার তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া যানবাহন পারাপারের জন্য এলসিটি ও এলসিইউ ব্যবহার করা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি কল্পে ঘাট থেকে ময়নামতি ক্যাম্প পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার রাস্তা ও ৪টি স্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে।

স্বর্ণদ্বীপে ৬০ হাজার ঝাউ গাছ, ভিয়েতনাম থেকে সিয়াম জাতের ১৫শ’ নারিকের চারা, ২ হাজার ফলদ গাছ রোপন করা ছাড়াও গরু, মহিষ, হাঁস, ভেড়া, মুরগি ও মৎস্য খামার রয়েছে।

এখানে মহিষের দুধ থেকে উৎপাদিত পনির স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জেলার বাইরে সরবরাহ হচ্ছে। স্বর্ণদ্বীপ রক্ষায় ১শ’ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এছাড়া সেনবাহিনী ও জলবায়ু ট্রাস্ট এর আর্থিক সহায়তায় ৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে ২টি মাল্টিপারপাস সাইক্লোন শেল্টার নির্মিত হয়েছে। আরও ৩টি শেল্টার নির্মাণ কাজ চলছে।

ইতোমধ্যে নির্মিত ২টি সাইক্লোন শেল্টারের প্রতিটিতে ২০ হাজার গ্যালন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং সোলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু ও বজ্রপাত নিরোধক স্থাপন করা হয়েছে।

Sarnodip--(5)

প্রশিক্ষণ এলাকায় প্রতি বছরের নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে ৬ পদাতিক ব্রিগেড দুই সপ্তাহ করে বিভিন্ন ধরনের আভিযানিক কার্যক্রম অনুশীলন করেন। এযাবৎ ২৫ হাজার সেনা সদস্য সফলভাবে সামরিক ম্যানুয়েভার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এখান থেকে। প্রতিদিন এখানে যোগ হচ্ছে আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামের ব্যবহার।

২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর মহড়া পরিদর্শন করেন। সর্বশেষ গত ১৪ মার্চ স্বর্ণদ্বীপ পরিদর্শন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

এসময় তিনি ৩১ শর্য্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, মেলিটারি ফার্মসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন করেন। রাষ্ট্রপতি স্বর্ণদ্বীপে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন উদ্যোগ দেখে ভূঁয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে স্বর্ণদ্বীপ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার পাশাপাশি আরেকটি সিঙ্গাপুর হবে।

Sarnodip--(6)

সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের ট্রাস্ক ফোর্স ও স্বর্ণদ্বীপের সমন্বয়কারী মেজর মোরশেদুল আজাদ জাগো নিউজকে জানান, স্বর্ণদ্বীপের সার্বিক উন্নয়নে ২০১৩ সালে মূলত মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয় এবং সেটি থেকে ত্রিমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে স্বর্ণদ্বীপকে স্থিতিশীল রাখার জন্য কার্যক্রম, সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা এবং এতদাঞ্চলের জনগণের ভাগ্যন্নোয়নে আর্থসামাজিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা।

স্বর্ণদ্বীপকে নদীর হাত থেকে স্থিতিশীল করে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষে ইতোমধ্যে দুটি বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। স্বর্ণদ্বীপের পশ্চিম পাশে ভাঙনরোধ কল্পে রক্ষা বাঁধ নির্মাণের লক্ষে সরকারের জিওবি ফান্ড থেকে ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। দ্রুত এর কাজ শুরু হবে। আর এটি বাস্তবায়ন হলে স্বর্ণদ্বীপের পশ্চিমাংশ অধিক ভাঙনের মুখ থেকে রক্ষা করা যাবে।

প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকা জিও ব্যাগের মাধ্যমে দ্রুত ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা হবে। বিভিন্ন সার্ভে বা গবেষণায় প্রথম ভাঙনের মাত্রা বেশি পরিলক্ষিত হলেও ধীরে ধীরে বিভিন্ন অংশে ভাঙনের মাত্রা কমে আসছে। তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ দ্বীপকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

Sarnodip--(7)

তিনি আরও জানান, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যা থেকে স্বর্ণদ্বীপকে ম্যানগ্রোভ এবং নন ম্যানগ্রোভ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে নোয়াখালী বন বিভাগের উদ্যোগে এখানে ৮শ’ হেক্টর এলাকা বনায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ১১৬ হেক্টর এলাকা বনায়ন করা হয়েছে।

মেজর মোরশেদুল আজাদ জানান, এটি শুধু সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করা হচ্ছে না, কাজ করা হচ্ছে এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের আর্থসামাজিক এলাকা হিসেবেও।

মিজানুর রহমান/এমএএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :