বাঁচার চান্সই ছিল না, নতুন জীবন দিয়েছেন আল্লাহ

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশিত: ০৪:৩৫ পিএম, ২৫ মে ২০১৯

৯ মে রাতে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে ৬০ জন আরোহীসহ একটি নৌকা ডুবে যায়। নৌকা থেকে ১৫ বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করে স্থানীয় জেলে ও নৌবাহিনী।

ওই দিন অনেক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে অনেকেই নিখোঁজ হন। ডুবে যাওয়া নৌকার অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন বাংলাদেশি। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ১৫ জন অভিবাসীর মধ্য দুইজনের বাড়ি ভৈরবে। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে স্থানীয় দালাল জাফর মিয়ার মাধ্যমে স্বপ্নের দেশ ইতালিতে যেতে চেয়েছেন ভৈরবের সম্ভুপুর এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন (৩৫) ও শহরের পঞ্চবটি এলাকার বাসিন্দা ইফরান রাজু (২৩)।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ মে) সকালে তারা দুইজন বাড়িতে ফিরে আসেন। তারা বাড়ি ফেরার মধ্য দিয়ে পরিবারের মধ্যে স্বস্তি নামে। তাদের দেখতে বাড়িতে ভিড় জমান আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া দুইজন বাড়িতে ফেরায় তাদের পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।

অপরদিকে, একই ঘটনায় ভৈরব শহরের চন্ডিবের এলাকার যুবক আশিক (২৮) ও ছাব্বির (২৫) এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তারা নিখোঁজ থাকায় তাদের পরিবারের সদস্যরা দুশ্চিন্তায় আছেন। প্রিয়জন ফেরার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন তারা। তাদের পরিবারে চলছে কান্না-আহাজারি। তারা বেঁচে আছেন কিনা জানে না পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন।

নৌকাডুবির দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে বাড়ি ফেরা ইফরানের বাবা বলেন, ইতালিতে আমার ছেলে যেতে পারেনি, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ছেলেকে জীবিত ফিরে পেয়েছি আমরা। এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।

আমির হোসেন ও ইফরান রাজু সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে জানান, দালাল জাফর মিয়ার মাধ্যমে ইতালি যেতে চুক্তি করি আমরা। চুক্তি অনুযায়ী তাকে ৪ লাখ টাকা করে দেয়া হয়। পরে আমাদেরকে প্রথমে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। লিবিয়ায় যাওয়ার পর লিবিয়ার দালালরা আমাদেরকে জিম্মি করে নির্যাতন করে।

লিবিয়ায় আমাদেরকে একটি ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। সেখানে অনাহারে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। তিন বেলা খাবার না দিয়ে একবেলা শুকনা খাবার দেয়া হয়। রুমের ভেতর বাথরুম করতে হয়েছে আমাদের। দালালদের সঙ্গে আমাদের কথা বলতে দেয়া হয়নি। মোবাইলে বাড়িতে যোগাযোগ করতে দেয়নি। পানি বা খাবার চাইলে মারধর করা হতো। এ অবস্থায় বোবা হয়ে রুমে বসে থাকতাম আমরা। পরে দালাল জাফরের কথামতো আমাদের পরিবার মুক্তিপণের টাকা দিলে মুক্তি দেয়া হবে বলে জানানো হয়। দীর্ঘ এক বছরে জাফরকে ৯ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়েছি আমরা।

আমির হোসেন ও ইফরান রাজু আরও জানান, সর্বশেষ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে দিলে ৯ মে ইতালি যেতে লিবিয়া থেকে আমাদেরকে নৌকায় উঠিয়ে দেয়া হয়। ৩০ জনের ধারণক্ষমতার নৌকাটিতে ১০৫ জন যাত্রীকে গাদাগাদি করে উঠিয়ে দেয় দালালরা। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাটি ডুবে যায়।

এ সময় নৌকায় থাকা একটি ড্রামের ওপর ভর দিয়ে সাগরে ভাসতে থাকি আমরা। একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যাই। যখন জ্ঞান ফিরে তখন দেখি তিউনিসিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আমরা। পরে একটি মানবিক সংস্থার সহায়তায় দেশে ফিরে আসি। বলতে গেলে এটি আমাদের দ্বিতীয় জীবন। সেদিন বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন, দিয়েছেন নতুন জীবন। কারণ সেদিন বাঁচার কোনো চান্সই ছিল না।

আমির হোসেন ও ইফরান রাজু বলেন, জাফর মিয়ার মতো প্রতারক দালালের হাত ধরে কেউ যেন আর ইউরোপে না যায়। দালাল জাফরের কঠোর বিচার শাস্তি চাই আমরা।

এ ব্যাপারে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত সাদমিন বলেন, মানব পাচারকারী দালাল চক্রের বিরুদ্ধে প্রমাণসহ কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

আসাদুজ্জামান ফারুক/এএম/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :