তিন কিশোরকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয়, আহতদের ৭ ঘণ্টা পর
যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নির্যাতনে তিন কিশোর হত্যা ও ১৫ জনকে আহতের ঘটনায় বন্দি আট কিশোরকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যশোরের চাঁচড়া ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক রকিবুজ্জামান বন্দি আট কিশোরকে গ্রেফতার দেখান। রোববার আদালতে তাদের গ্রেফতারের আবেদন করলে বিচারক নামঞ্জুর করেন।
তারা হলেন- চুয়াডাঙ্গার আনিছ, গাইবান্ধার খালিদুর রহমান তুহিন, নাটোরের হুমাইদ হোসেন ও মোহাম্মদ আলী, পাবনার ইমরান হোসেন ও মনোয়ার হোসেন, রাজশাহীর পলাশ ওরফে শিমুল এবং কুড়িগ্রামের রিফাত আহমেদ।
এদিকে শনিবার যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের পাঁচ কর্মকর্তাকে কারাগারে প্রেরণ করে পুলিশ। এদিন আদালতে সোপর্দের পর সন্ধ্যায় ওই পাঁচজনের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। মর্মান্তিক এ ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি তাদের কাজ শুরু করেছে। এ ঘটনায় পাঁচ সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
গত ১৩ আগস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কিশোর বন্দিদের মারপিট করা হলে তিন কিশোর নিহত ও ১৫ জন আহত হয়। এ ঘটনায় ১৪ আগস্ট রাতে নিহত কিশোর রাব্বির বাবা রোকা মিয়া বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের অজ্ঞাত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসামি করা হয়। এ মামলায় কেন্দ্রের সহকারী পরিচালকসহ পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শনিবার তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক রকিবুজ্জামান বলেন, শনিবার বিকেলে আদালত পাঁচজনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করার পরপরই তাদের পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রোববারও তা চলমান।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের এ ঘটনায় সমাজসেবা অধিদফতর দুই সদস্যের যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, সে কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
কমিটির প্রধান সমাজসেবা অধিদফতর ঢাকার পরিচালক সৈয়দ নূরুল বাসির বলেন, ইতোমধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত কিশোরদের সঙ্গে কথা বলেছি। তদন্তের জন্য যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে যাব। এরপর ঢাকায় গিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট দেব। এই তদন্ত কমিটির অপর সদস্য হলেন সমাজসেবা অধিদফতর ঢাকার উপ-পরিচালক এমএম মাহমুদুল্লাহ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত পেয়েছে। কিশোরদের নির্মমভাবে মারপিটের পরও সময় মতো যদি তাদের হাসপাতালে নেয়া হতো তাহলে প্রাণহানির ঘটনা নাও ঘটতে পারতো। নিহত তিন কিশোরকে হাসপাতালে নেয়া হয় মৃত অবস্থায়। ঘটনার প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা পর আহতদের হাসপাতালে নেয়া হয়।
একই ঘটনার তদন্তে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবু লাইছকে প্রধান করে তিন সদস্যের যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, সেই কমিটিও তাদের কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ তমিজুল ইসলাম খান।
বৃহস্পতিবার এ ঘটনার পর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। বলেন, কেন্দ্রের শিশু-কিশোরদের দুটি গ্রুপের মধ্যে মারামারিতে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। কিন্তু পরে আহত কিশোরদের বক্তব্য ও পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হতে থাকে যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দয় মারপিটের কারণেই তিন কিশোর নিহত ও ১৫ কিশোর আহত হয়।
পরে নিহত কিশোর রাব্বির বাবা রোকা মিয়া বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের অজ্ঞাত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসামি করা হয়। পুলিশ এ মামলায় কেন্দ্রের সহকারী পরিচালকসহ পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করে।
তারা হলেন- যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক (প্রবেশন অফিসার) মাসুম বিল্লাহ, কারিগরি প্রশিক্ষক ওমর ফারুক, ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর একেএম শাহানুর আলম ও সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমান।
শুক্রবার ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী হেফাজতে নেয়া হলে মামলার পর রাতে এই পাঁচজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়। শুনানি শেষে যশোরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহাদী হাসান কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমানের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। কারিগরি প্রশিক্ষক ওমর ফারুক ও ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর একেএম শাহানুর আলমের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
মিলন রহমান/এএম/এমকেএইচ