দিনটি ছিল ওদের কাছে ব্যতিক্রমী
নদীপাড়ের খালি জায়গায় টঙ জাতীয় ঘরগুলোতে তাদের বসবাস। তবে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ হয় না তাদের। প্রতিনিয়ত জায়গা বদল করতে হয়। যাযাবর জীবন এদের। এরা বেদে সম্প্রদায়। কবির কবিতায় উঠে এসেছে এদের জীবনযাপনের গল্প- ‘মোরা এক ঘাটে রন্ধি বাড়ি আরেক ঘাটে খাই, মোদের সুখের সীমা নাই।’
আগে এরা নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতো এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে। এখন নদীর সেই জৌলুশ নেই। তাই নদীর তীরবর্তী জায়গাতেই বসবাস করতে হয় তাদের।
ফরিদপুর শহরের অদূরে মুন্সীবাজার এলাকায় কুমার নদের পাড়ে বসবাস করছেন ২১টি বেদে পরিবার। এ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫৭। এর মধ্যে শিশু আছে ২০ জন।
‘নতুন বছরের হাসি ফুটুক তাদের মুখে’-এ প্রত্যয় সামনে রেখে ফরিদপুরে তরুণ-তরুণীদের একটি স্বেচ্ছাসেবী সমাজ কল্যাণমূলক সংগঠন ‘উৎস’ শনিবার (২ জানুয়ারি) সারাটা দিন বেদেপল্লির শিশুদের সঙ্গে কাটাই। তারা সারাদিন খেলেছে। তিন বেলা খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়। সঙ্গে নতুন জামা ও শীতবস্ত্রও পেয়েছে তারা। এ আয়োজনে মুখরিত হয়ে ওঠে সমগ্র বেদেপল্লি। একটি ব্যতিক্রমী দিনের আমেজ পায় তারা।
শনিবার (২ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে বেদেপল্লির এই মুখরিত অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। শিশুদের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হন বড়রাও। সবমিলিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ ছিল সেখানে।

শিশুদের জন্য খেলাধুলার আয়োজনের মধ্যে ছিল সাজগোজ, মার্বেল দৌড়, বিস্কুট দৌড়, এক পায়ে দৌড়, বাদাম কুড়ানো, ঝুড়িতে বল ফেলা ইত্যাদি। পল্লির পুরুষ ও নারীরাও এ খেলার বাইরে ছিলেন না। তাদের জন্য ছিল বল বদল খেলা। এ খেলায় অংশ নেন উৎস পরিবারের সদস্যরাও। তারাও বল বদল ও চেয়ার সেটিং খেলায় অংশ নেন। প্রতিটি খেলায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়স্থান অধিকারীদের হাতে তুলে দেয়া হয় পুরস্কার।
এর আগে সকালে নাস্তার আগে শিশুদের হাতে তুলে দেয়া হয় নতুন পোশাক। দুপুরে পল্লির সকলের জন্য আয়োজন করা হয় খিচুড়ি ও মাংস এবং বিকেলে পরিবেশন করা হয় হালকা নাস্তা।
বেদেপল্লির যেসব শিশুরা নাচ ও গান করতে পারে বিকেলে তাদের নিয়ে আয়োজন করা হয় সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সবশেষে বেদে পরিবারের সদস্যদের হাতে শীতবস্ত্র হিসেবে তুলে দেয়া হয় কম্বল।
এরকম একটি ব্যাতিক্রমধর্মী দিনটি কেমন কাটালেন বেদেপল্লির লোকজন, সেকথা শোনা যাক তাদের মুখে। বেদে মাহমুদ ধনী মিয়া (৮৪) বলেন, ‘কলেজের পোলাপানরা আমাগো আর আমাগো ছেলেমেয়ের ফুর্তির জন্য যে আয়োজন করেছে, তা আমাদের নিয়ে এর আগে কেউ করেনি। বাচ্চাদের চোখেমুখে খুশি দেখে মন ভইরা গেছে।’
বেদেনি সফিয়া বেগম (৫২) বলেন, ‘নাতিপুতিরা খেলাধুলা করছে। দেখে চোখ জুড়ায় যায়। আমাদের আজ রান্না করতে মানা করেছে। পোলাপানরাই খাওয়াবে।’
রত্মা বেদেনি (৭) বলেন, ‘আজ কোনো কাজ নাই। শুধু খেলা আর খেলা। খুব ভালো লাগছে।’

সাগর ইসলাম (১০) বলে, ‘আমি অনেকগুলা খেলা খেলছি। সারা বছর এরকম খেলতে পারলে ভালো লাগত।’
এই বেদেপল্লির সর্দার জমিরুল মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষের ভালোবাসা পাই না। সবাই দূর দূর কইরা তাড়ায় দেয়। আজ বুঝলাম, এ সমাজে অনেক ভালো মানুষ আছে। যারা আমাদের কথাও ভাবে।’
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উৎস’ ফরিদপুরের সভাপতি দিদারুল ইসলাম সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘সমাজের যারা অবহেলিত, সমাজ যাদের যোগ্য মর্যাদা দেয়নি; তাদের জন্য এ আয়োজন করতে পেরে ভালো লাগছে। বছরের একটি দিনের জন্য তো তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলাম। এটা ভেবেই ভালো লাগছে।’
বি কে সিকদার সজল/এসআর/এমকেএইচ