শার্শার ৮০ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার
বাঙালি জাতির গর্ব ও অহংকারের নাম একুশে ফেব্রুয়ারি। এই দিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথভাবে উদযাপন করার সরকারি নির্দেশও রয়েছে। তবে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য যশোরের বেনাপোল ও শার্শার ৮২ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শহীদ মিনার। ফলে নির্দেশ থাকলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। যেসব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই, ২১ ফেব্রুয়ারির ৬৯ বছর পরে এসে সেগুলোতে নতুন করে নির্মাণের পরামর্শ দিচ্ছে শিক্ষা অফিস।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছরেও যশোরের শার্শা উপজেলা ও বেনাপোল পোর্ট থানার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি। বিশেষ করে মাদরাসাগুলোর একটিতেও শহীদ মিনার নেই। এছাড়া প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়েও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবসে শ্রদ্ধ জানানোর জন্য মিনারে ফুল দেয়া সম্ভব হয় না।
শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, শার্শা ও বেনাপোলে ২৬৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ১২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও প্রি-ক্যাডেট এবং কমিউনিটি স্কুল রয়েছে ৫৪টি। এর মধ্যে শহীদ মিনার আছে ১৮টিতে। ৩৮টি উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টিতে শহীদ মিনার থাকলেও ১২টি কলেজের মধ্যে মাত্র ৩টিতে শহীদ মিনার আছে। অন্যদিকে ৩৩টি মাদরাসার মধ্যে একটিতেও শহীদ মিনার নেই।
অভিযোগ আছে, মাদরাসাগুলোতে দিবসটি পালন করা হয় না। কোনো কোনো মাদরাসায় নামমাত্র মিলাদ মাহফিল ও পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।
এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনসহ কোনো ব্যক্তি উদ্যোগে গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ না হওয়ায় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারেন না শিক্ষার্থীসহ এলাকার মানুষ।
উপজেলার নাভারন বুরুজবাগান ফাজিল মাদরাসার সুপার এ.কিউ.এম ইসমাইল হোসাইন এ বিষয়ে বলেন, ‘মাদরাসাটি ১৯৬৫ সালে নির্মিত হলেও শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস পালন করা হয়।’
একই দাবি করেন উপজেলার লক্ষণপুরের রহিমপুর আলিম মাদ্রাসার সুপার মাওলানা শহিদুল্লাহ। মাদ্রাসায় শহীদ মিনার না থাকলেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। ধান্যখোলা ডি.এস সিনিয়র মাদরাসার সুপার মাওলানা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেক মাদরাসা মানুষের দানে চলে। তাছাড়া জায়গা সংকট রয়েছে। এ কারণে শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব না মাদরাসার পক্ষে। তারপরও আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবসে দোয়া অনুষ্ঠান করি।’
নাভারন ফজিলাতুন্নেছা মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী শারমীন নাহার বলেন, ‘আমাদের কলেজে শহীদ মিনার না থাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার পায়ে হেটে বুরুজবাগান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হয়।’
বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইজ্জত আলী বলেন, ‘১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের স্মরণে আজও শার্শা উপজেলায় ৮২ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শহীদ মিনার গড়ে না ওঠায় শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা জানাতে ও স্মরণ করতে পারে না।’
নাভারন ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খলিল জানান, ‘আমাদের কলেজের পাশেই হাইস্কুলের শহীদ মিনার থাকায় এখানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি।’
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও শার্শা-বেনাপোলের অনেক প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই। উপজেলার ১২টি কলেজ, ৩৮টি হাইস্কুল, ৩৩টি মাদ্রাসা ও অসংখ্য কিন্ডার গার্ডেনের মধ্যে মাত্র ২৯টিতে শহীদ মিনার আছে। আবার ৩৩টি মাদরাসার একটিতেও শহীদ মিনার গড়ে ওঠেনি। এসব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণে পত্র দেওয়ার পরও তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তৃণমূল পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের গুরুত্ব ছড়িয়ে দিতে বা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা জানাতে সব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা প্রয়োজন।’
শার্শা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রি-ক্যাডেট ও কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৫৪টি। মোট ১৮০টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৬২টিতে কোনো শহীদ মিনার নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা দরকার।’
জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো ফান্ড নেই। এ কারণে শহীদ মিনার নির্মাণ করা যায়নি।’
জেলা শিক্ষা অফিসার এএসএম আব্দুল খালেক বলেন, ‘শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। যেসব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শহীদ মিনার নেই তাদের নির্মাণ করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারিভাবে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য শহীদ মিনার নির্মাণে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।’
যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাম্মী ইসলাম বলেন, ‘প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে হবে। কোনো বিদ্যালয়ে যদি শহীদ মিনার না থাকে, তারা পাশের বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে ফুল দেবে। যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে সেহেতু এবার শুধু শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা করবেন।’
মো. জামাল হোসেন/এমএইচআর/এএসএম