নওগাঁয় টুপি তৈরিতে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে নারীদের

আব্বাস আলী
আব্বাস আলী আব্বাস আলী , জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৪:০৩ পিএম, ১৪ এপ্রিল ২০২২

অডিও শুনুন

সংসারে অভাব থাকায় একসময় স্বামী-স্ত্রী দুজনই ধানের চাতালে কাজ করতেন। সেখানে অনেক পরিশ্রম হতো। বসবাস করতেন ঝুপড়িতে। এক যুগ আগে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার কুঞ্জবন ঈদগাহপাড়া গ্রামের হাবিব ও জুলেখা বেগম দম্পতির জীবন-সংগ্রাম এমনই ছিল। তবে বিশেষ ধরনের টুপি সেলাইয়ের কাজ করার পর থেকে তাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে।

এখন জমি কিনে আধাপাকা ইটের ঘরে বসবাস করছেন এ দম্পতি। নিজে টুপি সেলাইয়ের পাশাপাশি নারী কারিগরদের টিম লিডার হিসেবে কাজ করছেন জুলেখা। স্বামী হাবিব জমি বর্গা নিয়ে সেখানে কৃষিকাজ করেন।

টুপি সেলাইয়ের কাজ করে এখন অনেকের সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে। সংসারে কাজের পাশাপাশি টুপি সেলাইয়ের কাজকেই তারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আর এসব টুপি চলে যাচ্ছে মধ্যপাচ্যের বিভিন্ন দেশে

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একযুগ আগে জেলার মহাদেবপুর উপজেলায় টুপি ব্যবসা শুরু করেন ফেনীর একদল ব্যবসায়ী। এরপর নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে টুপি সেলাইয়ের কাজ শুরু হয়। এসব টুপির কারিগর মূলত নারীরা। সাদা কাপড়ের ওপর সুঁইয়ের সাহায্যে বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে নকশার ওপর ফুল তোলা হয়। সুঁইয়ের ফোঁড়ে নান্দনিক নকশা ফুটে উঠে একেকটা কাপড়ে। বিশেষ কায়দায় সেলাই ও ভাঁজ করে এ কাপড় দিয়ে বানানো হচ্ছে টুপি।

বোতাম, চেইন, দানা ও মাছ কাটা নামে চার ধরনের টুপিতে সেলাই করা হয়। কয়েক হাত বদল হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ টুপি তৈরি হয়। টুপির মধ্যে বেশি সময় ও পরিশ্রম হয় দানা সেলাইয়ে। টুপি ব্যবসায়ীরা টুপি তৈরির সব ধরনের উপকরণ কারিগরদের সরবরাহ করেন। কারিগররা মজুরি পান এক থেকে দেড় হাজার টাকা। টুপি তৈরিতে সময় লাগে প্রায় এক মাস।

নওগাঁয় টুপি তৈরিতে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে নারীদের

উপজেলার মধুবন, কুঞ্জবন, খাজুর, রনাইল, খোসালপুর, ভালাইন, সুলতানপুর, উত্তরগ্রাম শিবগঞ্জ, গোয়ালবাড়ি এবং তাতারপুরসহ অন্তত ৫০টি গ্রামের বিভিন্ন বয়সী নারী বিশেষ ধরনের এ টুপি তৈরির কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

এটি এক ধরনের বিশেষ টুপি, যা ওমানের ‘জাতীয় টুপি’ নামে পরিচিত। এসব টুপি এখন পাকিস্তান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। মানভেদে এসব টুপি দেড় থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

নওগাঁয় টুপি তৈরিতে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে নারীদের

টুপি তৈরির পর ঢাকার চকবাজার, বাইতুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে পাঠানো হয়। সেখানকার ব্যবসায়ীরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এসব টুপি রপ্তানি করেন।

কুঞ্জবন ঈদগাহপাড়া গ্রামের গৃহবধূ জুলেখা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধানের চাতালে কাজ করেছি। সেখানে কাজ করা খুবই কঠিন ছিল। পরে চাতালের কাজ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু কী কাজ করবো ভাবছিলাম। সে সময় এলাকায় টুপি সেলাইয়ের কাজ আসে। একটি সেলাই মেশিন কিনে টুপির নকশা তৈরির কাজ শিখি। প্রতিটি টুপি সেলাইয়ে প্রায় আধাঘণ্টা সময় লাগতো। প্রতি টুপিতে মজুরি পেতাম ২০ টাকা। এরপর ওই সেলাইয়ের মাঝ দিয়ে সুঁই দিয়ে মোটা সুতা ঢুকানো হতো। এতে মজুরি ছিল ১৫ টাকা। এভাবে সপ্তাহে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হতো।

তিনি বলেন, টুপি তৈরির কাজে যোগ দেওয়ার পর আধাপাকা ইটের পাঁচ কক্ষের বাড়ি দিয়েছি। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। আল্লাহর রহমতে এখন জীবন ভালোভাবে চলে যাচ্ছে।

নওগাঁয় টুপি তৈরিতে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে নারীদের

উপজেলার গোয়ালবাড়ী গ্রামের গৃহবধূ ইয়াসমিন বেগম। স্বামী রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তিন ও পাঁচ বছর বয়সী তাদের দুই সন্তান আছে। তিনি গত পাঁচ বছর ধরে টুপি সেলাইয়ের কাজ করেন

ইয়াসমিন বেগম বলেন, প্রতিবেশীরা টুপি সেলাই করে বাড়তি আয় করতো। তাদের কাছ থেকে সেলাইয়ের কাজ শিখেছি। প্রতি টুপিতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা মজুরি পাই। মাসে টুপি সেলাই করে দুই হাজার টাকা আয় করা যায়। যা দিয়ে সংসারে বাড়তি কাজ করা হয়। বসে বসে সময় নষ্ট না করে টুপি সেলাইয়ের আয় থেকে স্বামীকে সহযোগিতা করছি।

টুপি তৈরির প্রাথমিক কাজ করেন সেলাই মাস্টার শুভ ও প্রিন্টিং মাস্টার সজিব। তারা বলেন, কাপড়ের থান থেকে টুপি মাপ মতো কাটার পর নারী শ্রমিকদের হাতে দেওয়া হয়। এরপর প্রাথমিক সেলাই ও বিভিন্ন প্রিন্ট (নকশা) করা হয়। প্রতি পিস সেলাইয়ের জন্য তারা আড়াই টাকা এবং প্রিন্টের জন্য আড়াই টাকা মজুরি পান। এভাবে তারা প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০টি টুপির কাজ করেন।

নওগাঁয় টুপি তৈরিতে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে নারীদের

গত ১০ বছর ধরে টুপির ব্যবসা করছেন মহাদেবপুর উপজেলার সরস্বতীপুর গ্রামের আমজাদ হোসেন। পাশাপাশি কৃষিকাজও করেন। প্রতিবেশীর দেখাদেখি তিনি এ পেশায় এসেছেন। এখন তার অধীনে ১২ জন এজেন্ট কাজ করেন। যারা বিভিন্ন গ্রামের নারী কারিগরদের টুপি দিয়ে কাজ শেষে নিয়ে আসেন। প্রায় ৫০০ জন নারী করিগর টুপি সেলাইয়ের কাজ করেন। কাজ শেষে স্থানীয় মহাজনদের কাছে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০০টি টুপি বিক্রি করা হয়। প্রতি টুপিতে গড়ে তিনি ১০০ টাকা লাভ করেন।

আমজাদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে মজুরি বেড়েছে। প্রকারভেদে প্রতি টুপি সেলাইয়ের মজুরি ২০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা। মাঝে করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসার কিছুটা সমস্যা হলেও এখন ঠিক হয়ে গেছে। টুপির কাজ সারাবছরই থাকে। তবে ঈদুল ফিতরের তিনমাস আগ থেকে ঈদুল আজহা পর্যন্ত টুপির চাহিদা বেশি থাকায় কাজও বেশি হয়।

তিনি বলেন, এসব টুপি দেশের বাইরে চলে যায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ওমানে। আমরা সরাসরি সে দেশে না পাঠিয়ে স্থানীয় মহাজনদের কাছে সামান্য লাভে বিক্রি করি। উপজেলায় আমার মতো প্রায় ১৫০ জন টুপি ব্যবসায়ী আছেন।

আব্বাস আলী/এসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।