অবহেলিত এক জনপদ ‘চর কুশাহাটা’

রুবেলুর রহমান
রুবেলুর রহমান রুবেলুর রহমান , জেলা প্রতিনিধি রাজবাড়ী
প্রকাশিত: ০৬:৪১ পিএম, ০৭ অক্টোবর ২০২২

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের নাম ‘কুশাহাটা চর’। এখানে সহস্রাধিক মানুষের বসবাস। যারা দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। কৃষিকাজ ও মাছ শিকার করে চলে তাদের জীবন-জীবিকা। তবে শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ওই চরবাসী। এতে চরে বাড়ছে নিরক্ষরতা ও বাল্যবিয়ের হার।

চরটিতে চলাচলের রাস্তা, হাট-বাজার, চিকিৎসা কেন্দ্র ও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। চর থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার পদ্মা নদী পারি দিয়ে মূল ভূখণ্ডে আসা-যাওয়ার একমাত্র ভরসা নৌকা।

Raj-(1)

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের পদ্মার বুকে জেগে ওঠে বিশাল চর ‘কুশাহাটা’। ৭-৮ বছর আগে এখানে বসতি শুরু হয়। এক এক করে বর্তমানে এই চরে ১৩০টি পরিবারের সহস্রাধিক মানুষ বসবাস করছে। এখানে বসবাসকারীদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। চরের বাসিন্দাদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ ও মাছ শিকার।

এই চরে কয়েকশ শিশু থাকলেও তাদের শিক্ষার জন্য নেই কোনো সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পায়াক্ট বাংলাদেশের উদ্যোগে একজন শিক্ষক দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি প্রি-প্রাইমারি স্কুল। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দেড় শতাধিক। তবে নেই কোনো ভবন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। ছেঁড়া চটের ওপর বসে চলে শিশুদের পাঠদান। স্কুলটিতে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে বেতন পরিশোধ করতে হয় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের।

Raj-(1)

ওই স্কুলের শিক্ষক মো. ওয়াজ উদ্দিন সরদার জানান, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাস। চরের শিশুদের পাঠদানের জন্য পায়াক্ট বাংলাদেশ এনজিও থেকে তাকে সামান্য কিছু সম্মানী দেওয়াসহ বই-খাতা সরবরাহ করা হয়। আর শিক্ষার্থীদের দেওয়া বেতন থেকেই তিনি বেতন নেন।

তিনি বলেন, ‘এখানকার সবাই খুব গরিব। তাই মাস শেষে সবাই ঠিকমতো বেতনও দিতে পারে না। রৌদ-ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী সংগ্রহ করে আমি পাঠদান করাই। তবে যে টাকা সম্মানী পাই তাতে সংসার চলাতে খুব কষ্ট হয়। তারপরও চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

Raj-(1)

স্থানীয় কিশোর রিপন মোল্লা জানায়, সে পায়াক্টের স্কুল থেকে চতুর্থ শ্রেণি শেষ করে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় তার নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা শুরু করেছিল। কিন্তু করোনার কারণে স্কুল বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায়। এখন বাবার সঙ্গে মাছ ধরাসহ অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করে সে। চরে কোনো স্কুল না থাকায় তার মতো অনেকেই চতুর্থ শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করতে পারেনি।

স্থানীয় আব্দুস সালাম মন্ডল জানান, একসময় এই কুশাহাটায় হাসপাতাল, পশু হাসপাতাল, স্কুল, রাস্তা-ঘাট সবই ছিল। ১৯৯৭/৮৮ সালের নদীভাঙনে সবকিছুই পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। আবার ২০১৪/১৫ সালে ফের চর জেগে ওঠে। এরপর থেকে অনেকেই আবার এই চরে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু এখানে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো নাগরিক সুবিধা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

Raj-(1)

গোয়ালন্দ রাবেয়া ইদ্রিস মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল কাদের শেখ বলেন, কুশাহাটা চরবাসী ও শিশুরা সবধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা ও চরবাসীর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে ব্যবস্থা নেই।

দৌলতদিয়া মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা—একটি শিশুও স্কুলের বাইরে থাকবে না। কুশাহাটা চরে এই ঘোষণার বাস্তবায়ন জরুরি।

Raj-(1)

এনজিও পায়াক্ট বাংলাদেশের ম্যানেজার মজিবর রহমান জুয়েল বলেন, দুর্গম কুশাহাটা চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তারা ২০১৭ সাল থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে তাদের কোনো প্রকল্প বা দাতা নেই। অভিভাবকদের সহযোগিতা ও পায়াক্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত অনুদানে শিক্ষককে সামান্য বেতন দেওয়া হয়।

গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা মুন্সি বলেন, সরকারিভাবে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন সম্পন্ন করে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা অনেকটা কঠিন ব্যাপার। তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে গোয়ালন্দের দুর্গম চর কুশাহাটায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছেন। জায়গা কিনে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী মাসে সেমিপাকা ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

Raj-(1)

তিনি বলেন, ঘর নির্মাণ কাজ শেষ হলে সেখানে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বেতন দিয়ে ৩-৪ জন শিক্ষক নিয়োগ করে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করবেন। একটি জনগোষ্ঠী যাতে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্যই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, স্কুলটি যাতে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত করা যায় সেজন্য প্রশাসন কাজ করছে। স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে একটি কক্ষে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করার কথা ভাবা হচ্ছে। স্বাস্থ্য সেবাসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে তারা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।