মন ছুঁয়ে গেল ছুঁয়ে দিলে মন


প্রকাশিত: ০৮:০২ এএম, ১১ এপ্রিল ২০১৫

হৃদয়পুরের ছেলে আবির। এলাকার বড় ভাইয়ের প্রেমে সাহায্য করতে গিয়ে টিনেজ আবিরের পরিচয় হয় নীলার সাথে। সেই বয়সেই দুজনের মধ্যে ভাল লাগা তৈরি হয় কিন্তু এরপরই ঘটে যায় কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

আবির-নীলা হয়ে যায় আলাদা। দু’জন দু’জনের কাছ থেকে অনেক দূরে। বারো বছর পর একদিন হরতাল-অবরোধের বদৌলতে দুজনের দেখা হয়ে যায়। কিন্তু এই বারো বছরে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। এই পাল্টে যাওয়া ব্যাপারগুলো নিজেদের আয়ত্বে আনতে যুদ্ধে নামে আবির, আর সেই যুদ্ধে লুকিয়ে লুকিয়ে সাহায্য করে অদ্ভুত সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগতে থাকা নীলা। মূলত এখান থেকেই শুরু হয় ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ সিনেমার গল্প।


কাহিনীতে ঢুকে পড়ে অনেক ছোট ছোট চরিত্র, তৈরি হয় নতুন নতুন বাঁধা বিপত্তির। সকল সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে যেতে থাকে আবির-নীলা আর ছবির ডিরেক্টর শিহাব শাহীন নিজেও। উনি দর্শকদের কাছে এমনিতেই অনেক জনপ্রিয় চমৎকার কিছু টেলিফিল্ম নির্মাণের জন্য। ছোট পর্দায় যে সকল সফল নির্মাতারা সিনেমা বানানো শুরু করেছেন তাদের অধিকাংশই কেন জানি সিনেমাটা ঠিকভাবে তৈরি করতে পারছেন না, কোথায় যেন ঘাটতি থেকেই যায়।

সুনিপন কাজের জন্য ছোট পর্দায় পাওয়া সাফল্যটা সিনেমায় ধরে রাখতে পারেন না অনেকেই। সেক্ষেত্রে শিহাব শাহীন অনেকটাই সফল। পুরোপুরি বাণিজ্যিক ধারার খুবই এন্টারটেইনিং আর কালারফুল একটা সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি।


ছবিতে নীলা চরিত্রে অভিনয় করেছেন লাক্স সুন্দরী জাকিয়া বারী মম। নীলা চরিত্রে নিজের শতভাগ দিয়ে আরো বাড়তি কিছু দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। নিজের সাধারণ ঘরোয়া মেয়ের ইমেজটাকে ভেঙ্গে নতুন রূপে আবির্ভুত হয়েছেন ছুঁয়ে দিলে মনে।

মম নিজের অভিনয় দিয়েই সব সময় নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যান, কিন্তু চমৎকার এই অভিনেত্রী যে এতটা গ্ল্যামারাস সেটা এই ছবিতেই প্রথম চোখে পড়লো। ছবিটা রিলিজের আগে এটার কয়েকটা গান দেখে মম’র মেকাপ নিয়ে বিরক্ত ছিলাম, মাত্রাতিরিক্ত মেকাপ নিয়েছেন মনে হচ্ছিল। কিন্তু বড় পর্দায় মমকে দেখে তেমন কিছুই মনে হয়নি, বরং মম’র ড্রেস, গেটাপ আর প্রেজেন্টেশন দেখে রীতিমত মুগ্ধ হয়েছি। এজন্য সিনেমার কস্টিউম ডিজাইনারকে সাধুবাদ চমৎকার কাজ দেখানোর জন্য।


সাধারণত বর্তমানের বাংলা সিনেমাগুলোতে দেখা যায় অধিকাংশ নায়িকারাই অভিনয়ে পিছিয়ে থাকে, নিজের সৌন্দর্য দিয়ে সিনেমাটা এগিয়ে নিয়ে যায়। কয়েক বছর ধরে এমন একটা ট্রেন্ড তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু মম এটাকে পুরোপুরি ভেঙ্গে নিজের সৌন্দর্যের সাথে চমৎকার অভিনয় দিয়ে সিনেমাটায় দাপটের সাথে এগিয়ে গেছেন।

অন্যদিকে আবির চরিত্রে ছিলেন আরিফিন শুভ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একদম মাপা মাপা অভিনয় করে গেছেন। গত কয়েক বছর ধরে শুভ অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করলেও কেন জানি নিজের সেরাটা ঠিকমত দিতে পারছিলেন না। কখনো ড্যান্স বা অ্যাকশনে এগিয়ে গেলেও অভিনয়ে ঘাটতি থেকে যেত। কিন্তু এই ছবিতে ফুল প্যাকেজ নিয়ে আরিফিন শুভ পর্দায় হাজির হয়েছেন।


শুভ’র অন্য ছবির তুলনায় এই ছবিতে তার ড্যান্স আর অ্যাকশনের সুযোগ কম ছিল, তাই পুরোটা সময় অভিনয়েই বেশি জোর দিতে হয়েছে। এবং সেক্ষেত্রে আরিফিন শুভ এবার সফল। কোন অতি অভিনয় ছিল না, পুরোটা সিনেমা জুড়ে একদম মেপে মেপে অভিনয় করে গেছেন। এক্সপ্রেশন আর ডায়ালোগ ডেলিভারি পারফেক্ট। এই ছবির জন্য নিজের সূক্ষ সূক্ষ ব্যাপারগুলোকেও শুভ অনেক আমলে নিয়েছেন সেটা বুঝাই যাচ্ছিল। পুরো ছবিতে আবির চরিত্রে এক কমপ্লিট শুভকে পেয়েছে দর্শক।

প্রথমবারের মত কোন ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ছোট পর্দার প্রিয় মুখ ইরেশ যাকের। এখন পর্যন্ত অনেকগুলো সিনেমায় ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি এবং সেগুলোতে পারফরমেন্সও ছিল হতাশা জনক। উনি বরাবরই অনেক ভাল অভিনয় করেন কিন্তু সিনেমায় আসলে কি যেন এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দেয়। ডিরেক্টররা উনার কাছ থেকে ইরেশ যাকেরীয় পারফরমেন্সটা আদায় করে নিতে পারেন না। কিন্তু এই সিনেমায় ছিল তার ভিন্ন রূপ।


ব্যাডবয় ড্যানি চরিত্রে এক কথায় ফাটিয়ে দিয়েছেন ইরেশ যাকের। কখনো হাস্যরস, কখনো ভয়ংকর চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছেন পর্দায়। মূল অভিনেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছেন। উনার লুক আর চুলের কাটটা ছিল দূর্দান্ত। অনেক কারণেই ড্যানি চরিত্রের প্রতি একটা বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে ফেলেছিলেন। দর্শককে দেখলাম উনার সব কিছুই পছন্দ করছে, ভাল খারাপ সব কিছুতেই শিষ বাজিয়ে হাত তালি দিচ্ছে। এক সময় মনে হলো সাধারণ দর্শক কনফিউজ, তারা কার পক্ষে যাবে নায়কের নাকি ভিলেনের। আমিও সেই দলেরই একজন।

সিনেমায় ছোট ছোট অনেকগুলো চরিত্র ছিল। এই ছবির ভাল দিক গুলোর একটা হচ্ছে এই ছোট ছোট চরিত্রগুলোতে পারফেক্ট কাস্টিং। আবিরের বড় বোনের চরিত্রে ছিলেন সুষমা সরকার। উনি অনেক ভাল অভিনেত্রী কিন্তু কাজ করেন কম। ভাল অভিনয়ের সুবাদেই উনাকে চেনা। কিন্তু এই সিনেমার শুরুতে বিয়ের আগের চরিত্রটাতে উনাকে খুবই আকর্ষনীয়ভাবে প্রেজেন্ট করার কারণে তার সৌন্দর্যের সাথেও পরিচয় হয়ে গেল। উনার স্বামীর চরিত্রে মানে আবিরের দুলাভাইয়ের চরিত্রে ছিলেন মিশা সওদাগর। প্রায় ৬-৭ শত সিনেমায় ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করা মিশা সওদাগর এই ছবিতে করেছেন পজেটিভ চরিত্রের কাজ। খুবই মজার একটা চরিত্র। পুরোটা সময় জোকস বলার চেষ্টা করে দর্শককে মাতিয়ে রেখেছেন। শান্তশিষ্ট-ভদ্র চরিত্রটা যখন প্রতিবাদ করতে গিয়ে কঠিন রূপ ধরলেন তখন দর্শক অনেক উপভোগ করেছে। উনার সংলাপগুলো ছিল খুবই ইন্টারেস্টিং। এরকম একটা নিরীহ চরিত্রে উনার পারফরমেন্স ছিল অসাধারণ। সবার সামনে নীলা আবিরকে বিয়ে করবে না জানানোর পর তার কষ্ট পেয়ে বসে পড়ার দৃশ্যটাতে সাধারণ দর্শকের চোখেও পানি চলে এসেছিল। এটাই তো একজন অভিনেতার সাফল্য-তাই নয়?

আবিরের মজার বন্ধু হাতির বাচ্চা পাভেল চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনন্দ খালেদ। পুরো সিনেমায় হাস্যরসের সিংহভাগই এসেছে আনন্দের অভিনয় থেকে। বিশাল স্বাস্থ্য নিয়ে পর্দায় তাকে অধিকাংশ সময়ই দৌঁড়াতে আর বন্ধুকে সাহায্য করতে দেখা গেছে। কখনো চাপাতি হাতে ভিলেনের তাড়া খেয়ে দৌঁড়িয়েছেন। কখনো বন্ধুর কারণে তৈরি হওয়া ঝামেলায় পড়েছেন। ছবিতে আনন্দের মজার অভিনয়ের জন্য পুরো হল মেতে ছিল।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নীলার বদরাগী বাবা আফজাল খানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলীরাজ। ইদানিং বিভিন্ন বাংলা ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কিছু ক্যারেক্টার করে চমৎকার পারফর্ম করছেন এ জাদরেল অভিনেতা। এ ছবিতেও জমিদার বংশের বদরাগী উত্তরধিকারী চরিত্রে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন।

সিনেমায় আরো কিছু ছোট ছোট চরিত্রে নওশাবা, মাহবুবুজ্জামান, মিঠু, উজ্জ্বল, মেজবাহ উদ্দিন সুমনসহ ড্যানির সাঙ্গ-পাঙ্গ সবাই যার যার চরিত্রে ভাল করেছেন। তবে যাদের কথা আলাদা ভাবে না বললেই না তারা হলো আবির আর নীলার ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করা পিদিম আর অর্পা। ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে প্রত্যেকেই ভাল পারফর্ম করেছেন তারপরও যদি ভাল অভিনেতাদের ক্রমানুসারে সাজানো হয় তাহলে এই বাচ্চা দুটো উপরের দিকে থাকবে। এই বয়সেই অসাধারণ অভিনয় করেছে এরা।

তাহসানের ছুঁয়ে দিলে মন টাইটেল ট্র্যাকটা যখন বাচ্চার ভয়েসে পিদিম পারফর্ম করছিল তখন তার এক্সপ্রেশন ছিল দূর্দান্ত, শিশু কন্ঠশিল্পীর গলায় গানটা শুনে তখন একটা বাড়তি আবেদন তৈরি হয়েছিল।


ছুঁয়ে দিলে মনকে উপভোগ্য একটা সিনেমা হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে অনেক বড় অবদান এই ছবির মিউজিক ডিরেক্টর সাজিদ সরকারের। ছবির প্রত্যেকটা সিক্যোয়েন্সের সাথে মিল রেখে চমৎকার সব ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করেছে এই তরুন মিউজিশিয়ান। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের জন্যই সিনেমাটার প্রত্যেকটা দৃশ্য বেশি উপভোগ্য ছিল। এগুলোর পাশাপাশি গানগুলোও ছিল চমৎকার। আসলে গত কয়েক বছর ধরে বাংলা সিনেমায় অনেক ভাল গান হচ্ছে, সেগুলো জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। প্রায় সব ছবিতেই চমৎকার কিছু গান থাকছে, অনেক সময় গানের জন্যই ছবিটা ব্যবসা সফলতা পাচ্ছে। কিন্তু কোন ছবিরই সবগুলো গান অসাধারণ- এমন নজির বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে না ইন্ডাস্ট্রিতে।

এ ছবির গানগুলোর মধ্যে হাবিব ওয়াহিদের ‘ভালবাসা দাও’ গানটা সবেয়ে বেশি ভাল লেগেছে। গানে মারজুক রাসেলের লিরিকটাও ছিল অসাধারন। এই ছবির মাধ্যমেই সম্ভবত প্রথমবারের মত তাহসান কোন ছবিতে প্লেব্যাক করলেন। তাও আবার ছবির টাইটেল ট্র্যাক। শাহান কবন্ধের লেখায় শাকিলা সাকির সাথে তাহসানের গাওয়া এই ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ গানটাকে গত কয়েক বছরের সেরা রোমান্টিক গানগুলোর একটা বলা যায়। অন্য গানগুলোও ভালো লেগেছে।

শিহাব শাহীনের বাণিজ্যিক ধারার এই ছবিটা এতই উপভোগ্য ছিল যে এটার ছোট ছোট ভুলগুলো তেমন আমলে আসেনি, বা চোখ এড়িয়ে গেছে। তারপরও যদি সমালোচনা করার কোন দিক থাকে সেটা হলো সিনেমার প্লট। গল্পটা একেবারেই গতানুগতিক। এমন গল্পের অনেক ছবির সাথেই দর্শক পরিচিত। তবে এটা ঠিক আমাদের রোমান্টিক ছবির প্রায় সব গল্পই একই লাইনের হয়, তখন গল্পটা কিভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এটা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে নৈপুন্য ও চমৎকার উপস্থাপনের কারনে শিহাব শাহীন এটাতে উৎরে গেছেন। দর্শক চেনা গল্প এড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে সিনেমার প্রেজেন্টেশন দেখছিলেন। অন্য বাংলা কমার্শিয়াল ছবিগুলোর মত এটাতেও লজিকের বাইরে বেশ কিছু কাজ ছিল। তবে শুধু মাত্র আনন্দ পাওয়ার জন্য দর্শক এই ছোট ভুলগুলো এড়িয়ে গেছে।

সবকিছু মিলিয়ে অনেক কারনেই ছবিটা দর্শকের কাছে ভাল লাগতে পারে। এই মানের এন্টারটেইনিং বাংলা সিনেমা অনেকদিন হয় না। বুঝাই যাচ্ছিল শিহাব শাহীন নিজের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছেন এই ছবিতে। এবং তিনি সফল। বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমা হিসেবে ‘ছুঁয়ে দিলে মন’কে রেটিং করতে গেলে সহজেই ১০-এ ৬-৭ দেয়া যায়। সর্বোপরি ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ আমার মন ছুঁয়ে গেছে, অনেকদিন পর কোন বাংলা ছবির সবকিছু এতটা ভাল লাগলো।

জয় হোক বাংলা ছবির, জয় হোক চলচ্চিত্রে নতুন প্রজেন্মের।

-লেখক
পরিচালক, বায়োস্কোপ ব্লগ

এলএ/আরআইপি

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]