স্নাস
যার টানে ধূমপানমুক্ত হচ্ছে সুইডেন
ধূমপানমুক্ত দেশ- অবিশ্বাস্য হলেও খুব শিগগির হয়তো এই তকমাটি পেতে চলেছে সুইডেন। আর সেটি হলে ইউরোপের প্রথম ধূমপানমুক্ত দেশ হবে তারা। কোনো দেশে নিয়মিত ধূমপায়ীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশের কম হলে সেটিকে ধূমপানমুক্ত বলা হয়।
সরকারি হিসাবমতে, সুইডেনে ২০০৫ সালে দৈনিক ধূমপান করা মানুষের হার ছিল ১৫ শতাংশ। কিন্তু গত বছর তা নেমে এসেছে মাত্র ৫ দশমিক ২ শতাংশে, যা গোটা ইউরোপের মধ্যেই রেকর্ড সর্বনিম্ন।
কীভাবে এই সাফল্য?
ধারণা করা হচ্ছে, সুইডেনে অবিশ্বাস্য গতিতে ধূমপায়ী কমার ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখছে স্নাস। এটি অনেকটা টিব্যাগের মতো একটি বস্তু, যাতে কাগজের ভেতরে তামাক ভরা থাকে। সাধারণত ওপরের ঠোটের নিচে স্নাস রেখে তামাকের স্বাদ গ্রহণ করেন ব্যবহারকারীরা।
আরও পড়ুন>> ধূমপান কমাতে ধূমপায়ীদের দিকে একযোগে তাকিয়ে থাকার পরামর্শ
সুইডেনে বর্তমানে প্রতি সাতজনের একজন স্নাস ব্যবহার করেন।
১৯৯২ সালে স্নাস নিষিদ্ধ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু এর তিন বছর পরে সুইডেন যখন জোটে যোগ দেয়, তখন সমঝোতার মাধ্যমে স্নাসের বিষয়ে ছাড় নেয়।
সুইডেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর গোথেনবার্গে রয়েছে স্নাস উৎপাদক সুইডিশ ম্যাচের কারখানা। কোম্পানিটি ২০২১ সালে সুইডেন ও নরওয়েতে ২৭ কোটি ৭০ লাখ বক্স স্নাস বিক্রি করেছিল।
সুইডিশ ম্যাচের মুখপাত্র প্যাট্রিক হিল্ডিংসন বলেন, সুইডেনে আমরা ২০০ বছর ধরে স্নাস ব্যবহার করছি। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে যেমন ওয়াইন সংস্কৃতি রয়েছে, তেমনি এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ।
আরও পড়ুন>> পাকিস্তানের ৭২ শতাংশ নারী ধূমপায়ী
স্নাস মূলত দুই ধরনের- প্রথাগত ও সাদা স্নাস। প্রথাগত বা ঐতিহ্যবাহী স্নাসের ভেতরে থাকে তামাক। আর সাদা স্নাস তৈরি হয় কৃত্রিম নিকোটিনে, যাতে কখনো কখনো স্বাদও যোগ করা হয়।

তরুণদের কাছে জনপ্রিয়
সুইডেন, নরওয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বেশি বিক্রি হয় ঐতিহ্যবাহী স্নাস। তবে বছর ১৫ আগে চালু হওয়া সাদা স্নাসে তামাক না থাকায় আইনি জটিলতায় পড়ে সেটি। এ বছর বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে নিষিদ্ধ হয়েছে সাদা স্নাস।
তারপরও এটি সুইডেনের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। ১৬ থেকে ২৯ বছর বয়সী সুইডিশ নারীদের মধ্যে এর ব্যবহার চার বছরে অন্তত চারগুণ বেড়েছে।
আরও পড়ুন>> ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর করতে চায় না মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ
সুইডেনের ১৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা প্রতিদিন কোনো না কোনো ধরনের স্নাস ব্যবহার করেন।
ধূমপানে অনাগ্রহ
স্নাসের বাড়বাড়ন্তের মধ্যে দেশটিতে ধূমপায়ীর সংখ্যায় বড় পতন হয়েছে। যদিও সেখানে সিগারেটের দাম আয়ারল্যান্ডের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
পাবলিক হেলথ এজেন্সির ২০২২ সালের তথ্যমতে, মাত্র পাঁচ শতাংশের কিছু বেশি সুইডিশ বলেছেন, তারা নিয়মিত ধূমপান করে থাকেন। এর ফলে, ২০৫০ সালের মধ্যে ধূমপানমুক্ত হওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তা থেকে প্রায় ২৩ বছর এগিয়ে রয়েছে সুইডেন।
ক্যানসারের কারণ?
ধূমপান কমানোর লক্ষ্যে সম্প্রতি সিগারেটের ওপর নয় শতাংশ কর বাড়িয়েছে সুইডিশ সরকার। একই সময় স্নাসের কর কমানো হয়েছে ২০ শতাংশ।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারেননি সুইডিশ ক্যানসার সোসাইটির প্রধান উলরিকা আরেহেদ কাগস্ট্রম। তার মতে, স্নাসে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কম থাকার বিষয়ে এখনো যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন>> অনুষ্ঠানে শাশুড়ির মুখে সিগারেট, রেগে বিয়ে ভেঙে দিলেন বর
তিনি বলেছেন, আমরা জানি, স্নাস এবং এ ধরনের নিকোটিন পণ্যগুলো মানুষের রক্তচাপের পরিবর্তন ঘটায় এবং দীর্ঘমেয়াদী কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
সিগারেটের মতো স্নাসও কতখানি ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা প্রমাণে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
২০২৩ সালের জুনে নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত স্নাস ব্যবহারকারীদের মধ্যে গলা ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি যথাক্রমে তিন ও দুইগুণ বেশি।
তবে ২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ক্যান্সের এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, ক্যানসার এবং স্নাসের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই।
সূত্র: এএফপি, এনডিটিভি
কেএএ/