হামের পর যে জটিলতাগুলো ভয়ঙ্কর হতে পারে
হাম অনেকের কাছেই একটি সাধারণ ভাইরাল রোগ বলে মনে হলেও বাস্তবে এটি শিশুদের জন্য মারাত্মক জটিলতার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে হামের পরবর্তী জটিলতাগুলো কখনও কখনও জীবনঝুঁকিও তৈরি করে। তাই রোগটি হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা ইয়াসমীন। তার মতে, ‘হাম শুধু জ্বর আর ফুসকুড়িতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পরবর্তী জটিলতাগুলোই সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর।’
হাম কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি শরীরে প্রবেশ করার পর শুধু ত্বকেই প্রভাব ফেলে না, বরং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
হামের পর যে জটিলতাগুলো ভয়ঙ্কর হতে পারে
নিউমোনিয়া (ফুসফুসের সংক্রমণ)
হামের সবচেয়ে সাধারণ এবং মারাত্মক জটিলতা হলো নিউমোনিয়া। এতে শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটিই মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
হামের পর অনেক শিশুর ডায়রিয়া হয়, যা দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে এটি মারাত্মক আকার নিতে পারে।
কানের সংক্রমণ
হামের কারণে কানের সংক্রমণ হতে পারে, যা শিশুর শ্রবণক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। কখনও কখনও স্থায়ী ক্ষতিও হয়ে যায়।
এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ)
এটি হামের সবচেয়ে ভয়াবহ জটিলতাগুলোর একটি। এতে শিশুর মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যার ফলে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, এমনকি স্থায়ী মস্তিষ্কজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অপুষ্টি ও দুর্বলতা
হামের পর শিশুর শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। খাওয়ার রুচি কমে যায়, ফলে দ্রুত অপুষ্টি দেখা দেয়। এতে শিশুর সামগ্রিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চোখের সমস্যা ও অন্ধত্বের ঝুঁকি
হামের কারণে চোখে সংক্রমণ হতে পারে, যা কর্নিয়ার ক্ষতি করে। গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে, বিশেষ করে যেসব শিশুর ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস
ডা. শামীমা ইয়াসমীন জানান, হাম শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয়, ফলে পরবর্তী কয়েক মাস শিশু অন্যান্য রোগে সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।
কোন শিশুদের ঝুঁকি বেশি?
- ১ বছরের কম বয়সী শিশু
- অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
- যাদের টিকা দেওয়া হয়নি
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু
এই শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
জটিলতা এড়াতে কী করবেন?
- দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। জটিলতা শুরু হওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
- পুষ্টিকর খাবার ও তরল দিন। শিশুকে পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে, যাতে শরীর দ্রুত শক্তি ফিরে পায়।
- হামের সময় ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হলে চোখের জটিলতা কমানো যায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। শিশুর পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং সংক্রমণ থেকে দূরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। - হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা দিলে এই রোগ ও এর ভয়াবহ জটিলতা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।
- হামকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি যতটা সহজে ছড়ায়, ততটাই ভয়াবহ জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত লক্ষণ দেখা মাত্র সতর্ক হওয়া এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
ডা. শামীমা ইয়াসমীন বলেন, ‘হাম হলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। সময়মতো চিকিৎসা এবং সঠিক যত্নই শিশুকে বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে।’
শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে তাই এখন থেকেই সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, কারণ একটি ছোট অসতর্কতাই বড় জটিলতার কারণ হতে পারে।
জেএস/