হাম শুধু শরীর নয়, শিশুর মনেও ফেলছে প্রভাব

জান্নাত শ্রাবণী
জান্নাত শ্রাবণী জান্নাত শ্রাবণী , সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১০:৪৬ এএম, ২০ মে ২০২৬
ছবি: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জেবুন নাহার

বর্তমানে দেশে শিশুদের মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, কেউ কেউ জটিল অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তবে শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি এই রোগ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা, আইসোলেশনে থাকা, স্কুল ও বন্ধুদের থেকে দূরে থাকা-সব মিলিয়ে শিশুর আচরণ ও মানসিক বিকাশেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

এসব বিষয় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জেবুন নাহার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জান্নাত শ্রাবণী।

জাগো নিউজ: বর্তমানে শিশুদের মধ্যে হামের যে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কোনো সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক আপনি কীভাবে দেখছেন?

ডা. জেবুন নাহার: অবশ্যই সম্পর্ক আছে। হাম মূলত একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ হলেও এটি শিশুর মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। যখন একটি শিশু দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকে, দুর্বল থাকে কিংবা ঘরের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে, তখন তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে বাধা তৈরি হয়। শিশুরা সাধারণত খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা ও পরিবারের স্বাভাবিক পরিবেশের মাধ্যমে মানসিকভাবে বেড়ে ওঠে। কিন্তু হামের সময় তারা হঠাৎ করেই সেই স্বাভাবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে উদ্বেগ, ভয়, বিরক্তি কিংবা একাকীত্ব তৈরি হতে পারে। এছাড়া পরিবারের আতঙ্কও শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

জাগো নিউজ: হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কী ধরনের মানসিক বা আচরণগত পরিবর্তন বেশি দেখা যায়?

ডা. জেবুন নাহার: ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত খিটখিটে আচরণ, অতিরিক্ত কান্না, ঘুমের সমস্যা বা খাবারে অনীহা দেখতে পাই। কিছু শিশু আগের তুলনায় চুপচাপ হয়ে যায়, আবার কেউ কেউ অস্বাভাবিকভাবে রেগে যায়। যেসব শিশু একটু বড়, তাদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় তারা অসুস্থ হওয়ার অভিজ্ঞতাকে ভয়ঙ্কর হিসেবে মনে রাখে। কিছু শিশু বারবার জিজ্ঞেস করে, আমি কি আবার অসুস্থ হব? বা আমি কি মারা যাব?-এ ধরনের চিন্তাও দেখা যায়।

জাগো নিউজ: দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা বা আইসোলেশনে থাকার কারণে শিশুদের মানসিক অবস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়ে?

ডা. জেবুন নাহার: আইসোলেশন শিশুদের জন্য খুব কঠিন অভিজ্ঞতা হতে পারে। কারণ শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। যখন তাকে আলাদা ঘরে থাকতে হয় বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না, তখন সে নিজেকে একা মনে করতে শুরু করে। এতে মানসিক অস্থিরতা বাড়ে। কিছু শিশুর মধ্যে বিষণ্নতার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। আবার দীর্ঘদিন স্ক্রিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে বিরক্তি ও আচরণগত সমস্যা বাড়তে পারে।

জাগো নিউজ: হামের সময় জ্বর, দুর্বলতা ও শারীরিক অস্বস্তি শিশুদের মানসিক বিকাশ বা আচরণে কতটা প্রভাব ফেলে?

ডা. জেবুন নাহার: শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন জ্বর বা দুর্বলতায় ভুগলে শিশুর স্বাভাবিক খেলাধুলা, শেখা ও সামাজিক আচরণে প্রভাব পড়ে। একটি শিশু যখন বারবার ক্লান্ত বোধ করে, তখন তার মনোযোগ কমে যায়। সে আগের মতো সক্রিয় থাকে না। দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চলতে থাকলে মানসিক বিকাশেও সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে।

জাগো নিউজ: অনেক শিশু অসুস্থতার অভিজ্ঞতা থেকে ভয় বা ট্রমার মধ্যে পড়ে, হামের ক্ষেত্রেও কি এমনটা দেখা যায়?

ডা. জেবুন নাহার: হ্যাঁ, অবশ্যই। বিশেষ করে যদি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় বা ইনজেকশন, চিকিৎসা ও কঠিন শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা ট্রমা হিসেবে থেকে যেতে পারে। কিছু শিশু পরে হাসপাতাল বা ডাক্তার দেখলেই ভয় পায়। আবার কেউ অসুস্থ হওয়ার নাম শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাই চিকিৎসার সময় শিশুর সঙ্গে কোমল আচরণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জাগো নিউজ: এই সময়টাতে অভিভাবকদের আচরণ ও মানসিক চাপ শিশুদের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে?

ডা. জেবুন নাহার: শিশুরা খুব সহজেই বাবা-মায়ের আবেগ বুঝতে পারে। যদি অভিভাবক অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন বা আতঙ্কিত হন, তাহলে শিশুও ভয় পেতে শুরু করে। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা সারাক্ষণ নেতিবাচক আলোচনা করছেন, কে মারা গেল, কতজন আক্রান্ত হলো-এসব কথাবার্তা শিশুর সামনে বলা হলে তার মানসিক চাপ আরও বাড়ে। তাই অভিভাবকদের শান্ত থাকা এবং শিশুকে নিরাপত্তাবোধ দেওয়া জরুরি।

জাগো নিউজ: হাম থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পরও কি শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা থেকে যেতে পারে?

ডা. জেবুন নাহার: বেশিরভাগ শিশু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে, বিশেষ করে যদি অসুস্থতার অভিজ্ঞতা খুব ভয়াবহ হয়। যেমন-দুঃস্বপ্ন দেখা, অতিরিক্ত ভয় পাওয়া, বাবা-মাকে আঁকড়ে থাকা বা সামাজিকভাবে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। যদি এসব উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকে, তাহলে অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন:

জাগো নিউজ: স্কুল থেকে দূরে থাকা বা সামাজিক মেলামেশা কমে যাওয়ায় শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে?

ডা. জেবুন নাহার: স্কুল শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, এটি শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন স্কুল থেকে দূরে থাকলে শিশুদের মধ্যে একঘেয়েমি, একাকীত্ব এবং সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেলে শিশুর মানসিক আনন্দও কমে যায়। তাই সুস্থ হওয়ার পর ধীরে ধীরে তাকে স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ।

জাগো নিউজ: হামের সময় ও পরবর্তী সময়ে শিশুদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে অভিভাবকরা কী কী পদক্ষেপ নিতে পারেন?

ডা. জেবুন নাহার: প্রথমত, শিশুকে মানসিক নিরাপত্তা দিতে হবে। তাকে বুঝতে দিতে হবে যে সে নিরাপদ আছে এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠবে। দ্বিতীয়ত, তার সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। গল্প করা, ছবি আঁকা, হালকা খেলাধুলা বা পছন্দের কাজগুলো করতে উৎসাহ দিতে হবে। তৃতীয়ত, ভয়ভীতি তৈরি হয় এমন খবর বা আলোচনা শিশুর সামনে কম করতে হবে। আর যদি শিশুর আচরণে দীর্ঘদিন পরিবর্তন দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

জাগো নিউজ: এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসক, স্কুল ও সরকারের সমন্বিতভাবে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

ডা. জেবুন নাহার: এটি শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, সামাজিক ও মানসিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই সমন্বিত উদ্যোগ খুব প্রয়োজন। সরকারকে টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুলগুলোকে শিশুদের মানসিক অবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। অন্যদিকে চিকিৎসকদেরও শুধু শারীরিক চিকিৎসা নয়, শিশুর মানসিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি শিশু মানসিকভাবে সুস্থ থাকলে তার শারীরিক সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও দ্রুত হয়।

জেএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।