চাপে ‘বেসামাল’ বিআরটিএ

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫৯ পিএম, ০১ ডিসেম্বর ২০১৯

নতুন ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’কার্যকর শুরু হয়েছে গত ১ নভেম্বর থেকে। যার প্রভাব পড়েছে সড়কেও। ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে। আবার বিআরটিএ থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্তি নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা।

একদিকে আদালতের নির্দেশনা অন্যদিকে নতুন আইন কার্যকরের পর উদ্ভূত চাপে বেসামাল বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।

বিআরটিএ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, সাড়ে ছয় লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স পেন্ডিং। প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সহসাই সে সমস্যার উত্তরণ হচ্ছে না। আবার ফিটনেসবিহীন যানবাহনকে পাম্পে ধরতে আদালতের নির্দেশনা এবং নতুন আইনে জরিমানা ও শাস্তি বেড়ে যাওয়ায় বিআরটিএ কার্যালয়ে ভিড় বেড়েছে অনেক বেশি।

বিআরটিএ বলছে, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্স ছাড়া চালকদের যানবাহন বা গাড়িতে তেল, গ্যাস, পেট্রল ও জ্বালানি সরবরাহ না করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে পেট্রোবাংলা ও ঢাকা মহানগর পুলিশকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বিআরটিএ ঢাকা মেট্রোর মিরপুর কার্যালয় সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কার্যালয়ের সামনে বিভিন্ন পরিবহনের দীর্ঘলাইন। কার্যালয়ের ভেতরে হাজারের বেশি মোটরসাইকেল পার্ক করা। কেউ নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য, আবার কেউ নবায়ন করতে এসেছেন। বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতরে এনআরবি ব্যাংক শাখায় সেবাগ্রহীতাদের উপচেপড়া ভিড়। দীর্ঘলাইনে ঘণ্টাব্যাপী অপেক্ষায় থেকে টাকা জমা দিচ্ছেন। অনেকের আবার গাড়ির কাগজপত্র হলেও হয়নি স্মার্ট নম্বরপ্লেট। সেখানে সব সেবাই মিলছে, তবে চাহিদার তুলনায় সেবার গতি কম।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, মোটরযান নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরযানের ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ট্যাক্স টোকেন সেবা দিচ্ছে বিআরটিএ। মোটরযান নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মালিকানা বদলি, রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নম্বর প্লেট, ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, মোটরযানের ফিটনেসের ক্ষেত্রে ফিটনেস ইস্যু ও নবায়ন, ট্যাক্স টোকেন সেবার ক্ষেত্রে ট্যাক্স টোকেন ইস্যু ও নবায়ন এবং রুট পারমিট ইস্যু ও নবায়নের জন্য ভিড় অনেক বেশি।

বিআরটিএতে সেবা নিতে আসা এম বি আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘নতুন একটা আইন হয়েছে। আমি নিজে আগে আইনটা মানতে চাই। সেজন্য আমার বাইকের ডিজিটাল নম্বর প্লেট নিতে এসেছি। তবে এখানে আসার পর দেখছি উপচেপড়া ভিড়। খুব চাপ যাচ্ছে বিআরটিএর ওপর।’

পীযুষ কান্তি বর্মণ নামে আরেক সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘আমার গাড়ির সব কাগজপত্র আপডেট করতে এসেছি। এসে দেখছি খুব চাপ। সময় বেশি লাগছে। কিছু মিস ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে। এগুলো দেখার যেন কেউ নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় নতুন আইন হলেই শুধু হবে না, সার্বিক দিক দিয়ে অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। এখানে যারা সেবা নিতে আসছেন তাদের সবাইকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সেবাটা দিতে পারছে না বিআরটিএ। কারণ চাহিদা বেশি, সে তুলনায় বিআরটিএর নিজস্ব কাঠামো দুর্বল। এগুলোও আগে ঠিক করতে হবে।’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল আলম সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় ভিড় কমলেও ফিটনেস সনদ নিতে এখানে চাপ সবচেয়ে বেশি। পর্যায়ক্রমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সামাল দিতে আমরা চেষ্টা করছি। তবে সম্প্রতি ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে লার্নারের সংখ্যা অনেক বেশি। আর সব ধরনের নবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন ও টাকা জমা দেয়ার পর দ্রুতই কাগজ দেয়া হচ্ছে।’

ফিটনেস নবায়নে সময় বেধে দেয়ার পর গত ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করে। প্রায় পাঁচ লাখ গাড়ির মধ্যে হাইকোর্টের বেধে দেয়া দুই মাস সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র ৮৯ হাজার ২৬৯টি গাড়ির ফিটনেস নবায়ন করা হয়েছে বলে আদালতে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বিআরটিএ।

আদালতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বিআরটিএ জানায়, ঢাকাসহ সারাদেশে ফিটনেস নবায়ন না করা গাড়ির সংখ্যা চার লাখ ৭৯ হাজার ৩২০। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে দুই লাখ ৬১ হাজার ১১৩, চট্টগ্রামে এক লাখ ১৯ হাজার ৫৮৮, রাজশাহীতে ২৬ হাজার ২৪০, রংপুরে ছয় হাজার ৫৬৮, খুলনায় ১৫ হাজার ৬৬৮, সিলেটে ৪৪ হাজার ৮০৫ এবং বরিশাল বিভাগে পাঁচ হাজার ৩৩৮ গাড়ি ফিটনেসবিহীন রয়েছে।

প্রতিবেদন দাখিল হবার পর হাইকোর্টের সমন্বিত বেঞ্চ ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের যানবাহন বা গাড়িতে তেল, গ্যাস, পেট্রল ও জ্বালানি সরবরাহ না করতে নির্দেশ দেন। ফিটনেস নবায়নে আরও দুই মাস সময় নির্ধারণ করে দেন আদালত।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মো. মাহবুব-ই-রব্বানী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আদালতে উপস্থাপিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ফিটনেস নবায়ন না করা গাড়ির সংখ্যা চার লাখ ৭৯ হাজার ৩২০। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঢাকা মহানগর পুলিশসহ সকল জেলার ডিসি ও এসপি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে। বিপিসি ও পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষকেও চিঠি দেয়া হয়েছে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য। এরপর থেকে ভিড় বেড়েছে বিআরটিএর সকল কার্যালয়ে।’

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. তাজুল ইসলাম সম্প্রতি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সহজে লাইসেন্স পাই না। ভারী পরিবহনের চালকদের দেয়া হয় লাইট লাইসেন্স। সেই লাইসেন্স নিয়ে রাস্তায় গেলে মামলা দেয় খোদ বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশ। তাহলে বিআরটিএ স্ববিরোধিতা করে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা সহজ শর্তে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স চাই। গাড়ি চালনায় পারদর্শী চালককে কাঙ্ক্ষিত লাইসেন্স প্রদানে বিআরটিএর গাফিলতি ও কিছু কর্মকর্তার অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে।’

এ ব্যাপারে বিআরটিএ পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) এ কে এম মাসুদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, পেশাদার ভারী ড্রাইভিং লাইসেন্সপ্রাপ্তির জন্য প্রার্থীকে প্রথমে হালকা ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হবে। এর ন্যূনতম তিন বছর পর তিনি পেশাদার মিডিয়াম ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন। মিডিয়াম ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার কমপক্ষে তিন বছর পর ভারী ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু এসব না বুঝে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।

সম্প্রতি লাইসেন্স দেয়া নিয়ে খুব চাপ যাচ্ছে- এমন মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘চাপ সামলাতে আমরা অস্থায়ীভিত্তিতে একটা অনুমোদনপত্র দিচ্ছি। হয়তো মাস খানেকের মধ্যে সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে।’

জেইউ/এসআর/এমএআর/এমএস