১১ বছরেও শুরু হয়নি রামু-ঘুমধুম রেললাইনের কাজ

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ কক্সবাজার থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ০৮:১৪ এএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১

অডিও শুনুন

ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে কক্সবাজারের রামু থেকে ঘুমধুম একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। এই রেলপথে মিয়ানমার-চীনের সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। ১১ বছর অতিবাহিত হলেও এ রেললাইন স্থাপনে কোনো নেয়নি উদ্যোগ বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রথমে জটিলতা তৈরি হয় ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে। রেলওয়ে বলছে, গাছ ও পাহাড় কাটা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সময়ে আবার নকশার মধ্যের এলাকায় আবাস গেড়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তাই কাজ শুরু করতে এত বিলম্ব।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পথে রেললাইন স্থাপনে ২০১০ সালের জুনে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদন দেয় সরকার। যে পথে রেললাইন স্থাপনের কথা সেদিকে বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ রয়েছে। রেললাইন স্থাপন করতে হলে প্রচুর গাছ ও পাহাড় কাটতে হবে। যা পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাবে। এছাড়া রেললাইনের নকশা বরাবর উখিয়ায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসতি গড়ে উঠেছে। এসব কারণে ওই পথে শুরু হচ্ছে না রেললাইন স্থাপনের কাজ।

২০১০ সালের ৬ জুলাই ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় সময়মতো কাজ শুরু হয়নি। পরে এ প্রকল্পের সংশোধিত এডিপি অনুমোদন হয় ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল। এ প্রকল্পে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা অর্থায়ন করেছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম) সূত্র জানায়, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, পর্যটন শহর কক্সবাজারকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা, পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তন, সহজে ও কম খরচে মাছ, লবণ, রাবারের কাঁচামাল এবং বনজ ও কৃষিজ দ্রব্যাদি পরিবহনের উদ্দেশ্যে এ রেললাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখন দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজারে ১০০ দশমিক ৮৩১ কিলোমিটার রেললাইন সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ করা হচ্ছে। এ কাজের ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনো রামু থেকে ঘুমধুম রেললাইন স্থাপনে ভূমি অধিগ্রহণই করা হয়নি।

গত ৩১ অক্টোবর ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ দশমিক ৭২৫ কিলোমিটার (মেইন লাইন ২৮ দশমিক ৩১৮ কিলোমিটার ও লুপ সাইডিং ৩ দশমিক ৯৮৬ কিলোমিটার) নতুন সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ, ১৩টি বড় সেতু, ৪৫টি কালভার্ট, বিভিন্ন শ্রেণির ২২টি লেভেল ক্রসিং, হাতি চলাচলের জন্য আন্ডারপাস ও ওভারপাস, উখিয়া ও ঘুমধুমে দু’টি নতুন স্টেশন নির্মাণ করার কথা রয়েছে। এজন্য ৩৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করা লাগবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোনোটিই শুরু হয়নি।

শনিবার (২৭ নভেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, অসংখ্য পাহাড়, টিলা, গাছপালা কেটে তৈরি করা হয়েছে রামু-টেকনাফ সড়ক। এ পথে ২৮ কিলোমিটার যেতেই কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে সড়কের দু’পাশে পাহাড়-টিলায় হাজারো রোহিঙ্গার বসতি ও বিদেশি সংস্থার অফিস। রেললাইন স্থাপনে কোথাও সমতল ভূমি দেখা যায়নি। অর্থাৎ রামু থেকে ঘুমধুম রেললাইন স্থাপন করতে হলে পাহাড়, টিলা ও গাছপালা কাটতে হবে। পাশাপাশি সরাতে হবে রোহিঙ্গাদের বসতি ও দাতা সংস্থাগুলোর অফিস।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ঘুমধুম থেকে এ রেললাইন মিয়ানমার-চীন পর্যন্ত যাওয়ার কথা। সে মোতাবেকই প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। ওই সময় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাই রামু-ঘুমধুম রেললাইন নির্মাণে রোহিঙ্গাদের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এসব কারণেই মূলত রামু-ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয় সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্যই প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এখন এ রুট বাস্তবায়ন নিয়ে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্তারা ভালো বলতে পারবেন।

ঊর্ধ্বতন কর্তা বলতে তিনি কাকে বুঝিয়েছেন বা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তারা কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি মফিজুর রহমান।

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বিদেশে অবস্থান করায় এ বিষয়ে জানা সম্ভব হয়নি।

এমএমএ/এমএএইচ/এএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]