২০১০ : অন্ধকার আফ্রিকা থেকে বিশ্বকাপের আলো স্পেনে

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল , স্পোর্টস এডিটর
প্রকাশিত: ১০:০৭ পিএম, ০৬ জুন ২০১৮

টোটাল ফুটবলের পর নতুন কোনো ট্যাকটিসের আমদানি ঘটে ২০১০ বিশ্বকাপে। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা এবং কোচ পেপ গার্দিওলার হাত ধরে তিকি-তাকার উৎকর্ষতা পায় ফুটবলের ইতিহাসে। ২০১০ বিশ্বকাপে যার সফল প্রয়োগ ঘটান স্প্যানিশ কোচ ভিসেন্তে দেল বকস। সেই তিকি-তাকায় ভর করে অষ্টম দল হিসেবে বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নিলো স্পেন। অন্ধকার আফ্রিকা থেকে বিশ্বকাপের আলো টেনে নিয়ে গেলো স্প্যানিশরা। ব্রাজিলের পর দ্বিতীয় কোনো দল হিসেবে নিজ মহাদেশের বাইরে থেকে বিশ্বকাপ জিতলো স্পেন। অথচ, সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল স্পেনের।

১৯৩০ সালে যখন ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকাকে নিয়ে শুরু হলো বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর, তখন সত্যিই অন্ধকারচ্ছন্ন ছিল পুরো আফ্রিকা। সভ্যতার আলো থেকে ছিল অনেক দুরে। ইউরোপের উপনিবেশে নিস্পেষিত হতে হতে আফ্রিকানরা নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্বের কথাই ভুলে গিয়েছিল যেন। সবচেয়ে বড় কথা, জাহাজভর্তি করে আফ্রিকানদের দাস বানিয়ে নিয়ে আসা হতো ইউরোপ কিংবা আমেরিকার উপকুলে। সেখানে বিক্রি হতো তারা দাস হিসেবে।

jagonews24

গত শতাব্দীর শুরুতেই বিশ্বকে ওলট-পালট করে দেয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে ঘটে গেলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দুই বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিশ্বব্যাপি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। পর্তুগিজ কিং ফরাসীদের শৃঙ্খলও ভাঙতে শুরু করে। অন্ধকারচ্ছন্ন আফ্রিকা নিজেদের শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। আলোর রোশনাই পড়তে থাকে আফ্রিকার দিগ থেকে দিগন্তে। ধীরে ধীরে স্বাধীন স্বত্ত্বা হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে আফ্রিকান জাতি-রাষ্ট্রগুলো। সে সঙ্গে বিশ্বকাপেও অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে আফ্রিকানদের।

বিশ্বকাপের নানা পট পরিবর্তন কিংবা বিবর্তনের ধারায় ১৯৯৮ বিশ্বকাপে এসে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২টিতে। এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান কিংবা ওশেনিয়ান অঞ্চল থেকেও অংশগহণকারী দলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আফ্রিকার জন্য ৫টি জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। লাতিন আমেরিকার জন্য যেখানে সরাসরি জায়গা মাত্র ৪টি। আরেকটি সুযোগ পায় প্লে-অফ থেকে। সেখানে আফ্রিকার জন্যই সরাসরি ৫টি জায়গা বরাদ্ধ।

jagonews24

কিন্তু বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ তো বড় কথা নয়, বিশ্বকাপ আয়োজনের যে সক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে আফ্রিকা মহাদেশ, সেটাও তো জানান দিতে হবে। সেই জানান দেয়ার কাজটা করে আসছিল পশ্চিম আফ্রিকান দেশ মরক্কো। কিন্তু বেশ কয়েকবার বিশ্বকাপ আয়োজনের দৌড়ে অংশ নিয়েও নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ইউরোপ কিংবা লাতিন আমেরিকার ফুটবল রথি-মহারথিদের চোখে, ‘আফ্রিকা পুরোপুরি অন্ধকারচ্ছন্ন। এই মহাদেশ আবার বিশ্বকাপের মত এত বড় একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারবে না কি!’ একই মনোভাব ছিল এশিয়া মহাদেশ সম্পর্কেও।

তবে, ফুটবল যেহেতু বৈশ্বিক খেলা। সেহেতু একে সারাবিশ্বেই ছড়িয়ে দেয়ার ব্রত গ্রহণ করে ফুটবলের আন্তর্জাতিক অভিভাবক সংস্থা ফিফা। তারা বিশ্বকাপ আয়োজনে রোটেশন পদ্ধতি গ্রহণ করে। সে রোটেশন পদ্ধতিতেই ২০০২ সালে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে এশিয়া। কোরিয়া এবং জাপান প্রথমবারেরমত যৌথভাবে আয়োজন করে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর।

মাঝে ইউরোপ আয়োজন করলো একটি বিশ্বকাপ। ২০০৬ সালে জার্মানি থেকে ঘুরে বিশ্বকাপ ঠাঁই পেলো সেই অন্ধকারচ্ছন্ন আফ্রিকা মহাদেশেই। রোটেশন পলিসির কারণেই ২০১০ বিশ্বকাপের আয়োজক হবে আফ্রিকার কোনো একটি দেশ। আয়োজনের দৌড়ে নাম লেখায় নেলসন মেন্ডেলার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা, আফ্রিকার আরেক পরাশক্তি মরক্কো, মিশর এবং লিবিয়া ও তিউনিসিয়া যৌথভাবে। ফিফা জানিয়ে দেয়, এই আসরটিতে কোনো যৌথ আয়োজক থাকতে পারবে না। এ কারণে তিউনিসিয়া নাম প্রত্যাহার করে নেয়। লিবিয়া ফিফার দেয়া শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।

২০০৪ সালে জুরিখে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা পেয়েছে ১৪ ভোট। মরক্কো পেয়েছে ১০ ভোট এবং মিশর কোনো ভোটই পায়নি। ২০০৬ সালেও আয়োজকের দৌড়ে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। খুব অল্প ভোটে তারা হেরে যায় জার্মানির কাছে। অবশেষে ২০১০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়, আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে দক্ষিণের আলোকিত এই দেশটি। বিশেষ করে নেলসন মেন্ডেলা যখন বিশ্বকাপ আয়োজনের দৌড়ে অংশ নেন, তখন অন্যদের আর শক্তিই বাকি থাকার কথা ছিল না। যদিও, ইউরোপের ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়াররা সব সময়ই মেতেছিল আফ্রিকায় বিশ্বকাপ আয়োজনের বিপক্ষে।

jagonews24

২০১০ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল মোট ২০৪টি দেশ। ২০০৮ অলিম্পিক গেমসের জন্যও অংশ নিয়েছিল মোট ২০৪টি দেশ। যদিও ফিফার সদস্য দেশ ছিল ২০৮টি। কোনো নির্দিষ্টি টুর্নামেন্টের জন্য অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যায় এটাই রেকর্ড। ২০০৭ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হয় বিশ্বকাপের প্রক্রিয়া। দীর্ঘ বাছাই প্রক্রিয়া শেষেই ৩২টি চূড়ান্ত অংশগ্রহণকারী দল পাওয়া যায়।

বাছাই পর্বেই বিতর্কের জন্ম দেয় ফ্রান্স। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হাত দিয়ে গোল করেছিলেন থিয়েরি অঁরি। এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক। কিন্তু রেফারি দেখতে পাননি অঁরির হ্যান্ডবল। এ কারণে, ম্যাচটিতে জিতে ফ্রান্স নিশ্চিত করে ফেলে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলা। আয়ারল্যান্ড ফিফার দ্বারস্থ হয়েও কিছু করতে পারেনি। কোস্টা রিকাও অভিযোগ করেছিল উরুগুয়ের বিপক্ষে। অন্যদিকে আফ্রিকায় মিশর-আলজেরিয়া ম্যাচ নিয়েও দারুণ বিতর্ক তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সব বিতর্ক চাপিয়ে আফ্রিকা বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হয়ে যায় ৩২টি দল।

চেকোস্লোভাকিয়া ভেঙে স্বাধীন হওয়ার পর স্লোভাকিয়া প্রথম এই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়। ১৯৬৬ সালের পর আবারও বিশ্বকাপে উঠে আসে উত্তর কোরিয়া। ১৯৮২ সালের পর বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে হন্ডুরাস এবং নিউজিল্যান্ড। ১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপে নাম লেখায় আলজেরিয়া। আগের আসরগুলোতে খেলা সৌদি আরব, তিউনিসিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, পোল্যান্ড, সুইডেন, ইউক্রেন, রাশিয়া এবং তুরস্ক নাম লেখাতে ব্যর্থ হয় দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। এবারই প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় আফ্রিকার ৬টি দেশ। দক্ষিণ আফ্রিকা স্বাগতিক। বাকি ৫টি ফিফা কর্তৃক নির্ধারিত।

পুরো দেশজুড়ে ১০টি স্টেডিয়াম প্রস্তুত করে দক্ষিণ আফ্রিকা। এর মধ্যে নতুন তৈরি করা হয় ৫টি। ৫টিকে সংস্কার করা হয়। সব মিলিয়ে ১০০ কোটি ডলার (১ বিলিয়ন) ব্যায় করা হয় স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং সংস্কার কাজে। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপ উপলক্ষে পুরো দেশেরই চেহারা পাল্টে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। যে শহরগুলোতে বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করা হয়, সে শহরগুলো ঘিরে নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। নতুন করে তৈরি করা হয় মেট্রো সিস্টেম।

আফ্রিকায় বিশ্বকাপ, নিরাপত্তা নিয়ে পুরো বিশ্বই ছিল শঙ্কিত। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়। বিশ্বকাপের ১০০ দিন বাকি থাকতে দক্ষিণ আফ্রিকার এসব আয়োজন দেখে ফিফা প্রেসিডেন্ট সেফ ব্লাটার তো বলেই দিলেন, ‘বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা আয়োজন হতে যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায়।’

রাজধানী জোহানেসবার্গেই তৈরী করা হয় দুটি স্টেডিয়াম। অর্থ্যাৎ ৯টি শহরে মোট ১০টি ভেন্যু। ১১ জুন জোহানেস বার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে শুরু হয় টুর্নামেন্ট। সারা দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে ১১ জুলাই আবার সকার সিটি স্টেডিয়ামেই শেষ হয় বিশ্বকাপের ১৯তম আসর। আগের আসরের মতই ৩২টি দলকে ভাগ করা হরো ৮টি গ্রুপে। প্রতি গ্রুপে ৪টি করে দল। সেরা দুটি দল উঠেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ১৬টি দলকে নিয়ে নকআউট স্টেজ, দ্বিতীয় রাউন্ড। এরপর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। মোট ৬৪টি ম্যাচ।

লাতিন আমেরিকান দেশগুলো দারুণ খেলেছে প্রথম রাউন্ডে। ৫টি দেশের সবাই উঠেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ৪টি খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনাল। দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল চিলিকে। তবে, কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে বাকি তিনটি দেশ। কেবলমাত্র উরুগুয়ে উঠেছিল সেমিফাইনালে।

গ্রুপ পর্বেই একটা রেকর্ডের জন্ম দিয়েছে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। তারাই প্রথম কোনো স্বাগতিক দেশ, যারা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারেরমত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। তবে, বিদায় নিলেও বাফানা বাফানারা গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিদায় করে দিয়েছিল। ওই পরাজয়ের পরই ফ্রান্স দলের মধ্যে অন্তর্কোন্দল দেখা দেয়। যে কারণে কোচ রেমন্ড ডমেনেখের সঙ্গে সিনিয়র বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। যার জের ধরে কয়েকজনকে নিষিদ্ধও ঘোষণা করে ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশন।

আফ্রিকা থেকে শুধুমাত্র ঘানা উঠে যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে। বাকি ৫টি দেশ বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকেই। আর ইউরোপ থেকে মাত্র ৬টি দেশ উঠতে পেরেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ১৯৮৬ সালে শেষ ষোল নিয়ম চালু করার পর থেকে সবচেয়ে কম। ফ্রান্সের সঙ্গে আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালি বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকেই। গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচই জিততে পারেনি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। এমনকি শেষ ম্যাচে তারা হেরেছে নবাগত স্লোভাকিয়ার কাছে। ১৯৬৬ সালে ব্রাজিল এবং ২০০২ সালে ফ্রান্সের পর ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়ার ঘটনা এ নিয়ে তৃতীয়।

ইতালির সঙ্গে গ্রুপ এফ থেকে বিদায় নিয়েছিল নিউজিল্যান্ডও। যারা বিশ্বকাপে ছিল একমাত্র অপরাজিত দল। কোনো ম্যাচই হারেনি। তিনটি ম্যাচই ড্র করেছে; কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে ব্যর্থ হয় তারা।

দ্বিতীয় রাউন্ডেও লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর প্রাধান্য। তবে, বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল জার্মানি এবং ইংল্যান্ড ম্যাচটি। ওই ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের গোল বাতিল করে দেয়া হয় গোললাইন স্পর্শ করার পরও। যে কারণে, ওই ঘটনার পর থেকেই ফুটবলে গোললাইন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং এবার (২০১৮ সালে) এসে সেই গোললাইন টেকনোলজির বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ওই ম্যাচে জার্মানির কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড।

দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনার কার্লোস তেভেজ অফসাইড থেকে মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করলেও রেফারি সেটা দেখেননি। যার ফলে বিতর্ক তৈরি হয়। মাঠের খেলায় জিততে না পারলেও, শেষে ফিফা প্রেসিডেন্ট সেফ ব্ল্যটারের কাছ থেকে ‘দুঃখ’ প্রকাশ পেয়েছে মেক্সিকো এবং ইংল্যান্ড।

প্রথম রাউন্ড এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে দারুণ পারফরম্যান্স দেখানোর পর কোয়ার্টার ফাইনালে এসে লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর সবগুলোই থমকে দাঁড়ায় ইউরোপিয়ানদের সামনে পড়ে। একমাত্র উরুগুয়েই ঘানাকে হারিয়ে উঠতে পেরেছিল সেমিফাইনালে। তাও লুইস সুয়ারেজের হাত দিয়ে বল ফেরানোর বিতর্কিত ঘটনার পর। ওই ম্যাচে সুয়ারেজ গোললাইনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ঘানার একটি শট ফিরিয়ে দেন। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখান সুয়ারেজকে এবং পেনাল্টির বাঁশি বাজান। কিন্তু ঘানার আসামোয়াহ গায়ান পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ঘানাকে হারিয়ে সেমিতে উঠে যায় উরুগুয়ে।

অন্য তিন ম্যাচে বাকি তিনটি লাতিন দেশ মুখোমুখি হয় ইউরোপিয়ানদের। ব্রাজিল হেরে যায় নেদারল্যান্ডসের কাছে। আর্জেন্টিনা জার্মানির কাছে ৪ গোল খেয়ে বিদায় নেয়। প্যারাগুয়ে বিদায় নেয় স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে। সেমিফাইনালে ডাচদের কাছে হেরে যায় উরুগুয়ে। লাল কার্ডের কারণে খেলতে পারেননি লুইস সুয়ারেজ। যে কারণে ভুগতে হয়েছিল উরুগুয়েকে। না হয়, ফল ভিন্নও হতে পারতো নেদারল্যান্ডস-উরুগুয়ে ম্যাচে। কারণ, ম্যাচের ফল ছিল ৩-২ গোলের। সেমিফাইনালের অন্য ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় জার্মানি। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল দল হয়েও স্পেনের তিকিতাকার কাছে হার মানতে বাধ্য হয় জার্মানি।

jagonews24

১১ জুলাই জোহানেসবার্গের সকারসিটি স্টেডিয়ামে স্বর্ণখচিত জো’বুলানি বল দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় স্পেন-নেদারল্যান্ডস ফাইনাল। গ্রুপ পর্ব থেকেই ইউরোপের অধিকাংশ দল বিদায় নিলেও ফাইনাল ম্যাচটি হলো ‘অল-ইউরোপ ফাইনাল’। ফাইনাল ম্যাচটিতে নেদারল্যান্ডস পুরো শারিরীক শক্তির প্রয়োগ দেখায়। যে কারণে রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েবকে ১৪বার হলুদ কার্ড বের করতে হয়েছিল। বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৮৬ ফাইনালে আর্জেন্টিনা-পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার ফাইনালে সর্বোচ্চ ৬টি হলুদ কার্ড ব্যবহার হয়েছিল। ২০১০ ফাইনালে ১৪ বার। এর মধ্যে জন হেইটিঙ্গা দু’বার হলুদ কার্ড দেখে মাঠ থেকে বহিস্কার হন।

ম্যাচটিতে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ছিল গোলশূন্য ড্র। যদিও ৬০ মিনিটের সময় অ্যারিয়েন রোবেনের কাছ থেকে একেবারে ফাঁকায় বল পেয়ে যান ওয়েসলি স্নেইডার। কিন্তু অসাধারণ ভঙ্গিতে গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াস বাঁচিয়ে দেন স্পেনকে। সার্জিও রামোস দারুণ এক হেড মিস করেন। শেষ পর্যন্ত খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে এবং খেলার ১১৬ মিনিটের মাথায় সেস ফ্যাব্রেগাসের পাস থেকে দারুণ এক ভলিতে নেদারল্যান্ডসের জাল কাঁপিয়ে দেন আন্দ্রে ইনিয়েস্তা। ওই ১ গোলেই অষ্টম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের ট্রফি জিতে নেয় স্পেন।

এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৫টি করে গোল করেন চারজন। থমাস মুলার, ডেভিড ভিয়া, ওয়েসলি স্নেইডার এবং দিয়েগো ফোরলান। তবে গোল অ্যাসিস্টের হিসেবে গোল্ডেন বুটের পুরস্কারটা তুলে দেয়া হয় থমাস মুলারের হাতে। আর টুর্নামেন্ট সেরা গোল্ডেন বলের পুরস্কার ওঠে আন্দ্রে ইনিয়েস্তার হাতে। সে সঙ্গে আফ্রিকায় সমাপ্ত হলো একটি সফল আয়োজনের।

আইএইচএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :