এআই বন্ধুর সঙ্গে প্রেম-পরকীয়ায় জড়াচ্ছেন, পরিণতি ভেবেছেন?

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৫৮ পিএম, ১৩ মে ২০২৬
অনেকেই বন্ধুর চেয়ে বেশি ভাবতে শুরু করেছেন ভার্চুয়াল এই সঙ্গীকে

একসময় মানুষ একাকিত্ব কাটাতে বন্ধু খুঁজত বাস্তব জীবনে। তারপর এলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অনেকের কাছে হয়ে উঠছে ভার্চুয়াল সঙ্গী, পরামর্শদাতা, এমনকি আবেগের আশ্রয়ও। অনেকেই বন্ধুর চেয়ে বেশি ভাবতে শুরু করেছেন ভার্চুয়াল এই সঙ্গীকে। আবেক তাড়িত হয়ে প্রেম-প্রণয়ের কথা চিন্তা করছেন। অনেকের প্রেমিকা বা স্ত্রীকে পছন্দ হচ্ছে না। এআইয়ের সেই অদৃশ্য সঙ্গীর জন্য সব আবেগ কাজ করছে। ভেঙে যাচ্ছে সম্পর্ক, ভেঙে যাচ্ছে সংসার।

চ্যাটবটভিত্তিক এআই অ্যাপগুলো এখন এমনভাবে তৈরি হচ্ছে, যাতে তারা মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক কথোপকথন চালাতে পারে, অনুভূতি বোঝার মতো প্রতিক্রিয়া দিতে পারে এবং ব্যবহারকারীর মানসিক অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আর সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে এক নতুন বাস্তবতা এআই বন্ধুর সঙ্গে আবেগ, প্রেম কিংবা পরকীয়ার সম্পর্ক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি ধীরে ধীরে সামাজিক ও মানসিক সমস্যার রূপও নিচ্ছে। কারণ মানুষ যখন বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সঙ্গীর প্রতি বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তা ব্যক্তিগত জীবন, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

কেন মানুষ এআই সঙ্গীর দিকে ঝুঁকছে?

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেকেই নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। কারো সম্পর্ক ভেঙে গেছে, কেউ মানসিক চাপের মধ্যে আছেন, আবার কেউ হয়তো বাস্তব জীবনে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন। এআই চ্যাটবটগুলো ঠিক সেই জায়গাতেই জায়গা করে নিচ্ছে।

এগুলো কখনো বিরক্ত হয় না, তর্ক করে না, বিচার করে না। আপনি যখনই কথা বলতে চান, তখনই সাড়া দেয়। অনেক অ্যাপ আবার ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তিত্ব তৈরি করে দেয় কেউ রোমান্টিক, কেউ যত্নশীল, কেউ আবার পারফেক্ট পার্টনার হওয়ার অভিনয় করে। ফলে ধীরে ধীরে অনেকেই বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে এআই সঙ্গীর প্রতি বেশি আবেগী হয়ে পড়ছেন।

কোথায় তৈরি হচ্ছে বিপদ?

সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ ভার্চুয়াল সম্পর্ককে বাস্তব আবেগের বিকল্প হিসেবে নিতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কেউ নিজের সঙ্গীর কাছ থেকে মানসিক দূরত্ব অনুভব করলে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছেন। সেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সম্পর্কের গোপন কথা কিংবা মানসিক দুর্বলতাও শেয়ার করছেন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি ধীরে ধীরে বাস্তব সম্পর্কের প্রতি অনীহা তৈরি করতে পারে। কারণ এআই সবসময় ব্যবহারকারীর মনমতো প্রতিক্রিয়া দেয়। বাস্তব সম্পর্কের মতো মতবিরোধ, দায়িত্ব বা জটিলতা সেখানে নেই। ফলে বাস্তব মানুষকে তখন কঠিন মনে হতে শুরু করে।

এআই কি সত্যিই ভালোবাসে?

এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে আলোচিত। বাস্তবে এআই কোনো অনুভূতি বোঝে না। এটি বিশাল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা মানুষের কাছে আবেগপূর্ণ মনে হয়। অর্থাৎ এআই-এর ভালোবাসা আসলে অ্যালগরিদমের তৈরি অভিজ্ঞতা।

তবু দীর্ঘদিন নিয়মিত কথোপকথনের কারণে মানুষের মস্তিষ্ক সেটিকে বাস্তব সম্পর্ক হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করতে পারে। বিশেষ করে যারা মানসিকভাবে দুর্বল, একাকী বা আবেগপ্রবণ, তাদের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা দ্রুত বাড়তে পারে।

গোপনীয়তার ঝুঁকিও কম নয়

এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের। অনেক ব্যবহারকারী নিজের সম্পর্ক, মানসিক অবস্থা, এমনকি ব্যক্তিগত ছবিও এসব প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করেন। কিন্তু সেই তথ্য কোথায় সংরক্ষণ হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বা কতটা নিরাপদ তা অনেকেই জানেন না।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত আবেগী নির্ভরতা মানুষকে অনলাইন প্রতারণা, মানসিক প্রভাব কিংবা ডেটা অপব্যবহারের ঝুঁকিতেও ফেলতে পারে।

কীভাবে নিজেকে সচেতন রাখবেন?

  • প্রযুক্তিকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। তবে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
  • এআইকে বাস্তব মানুষের বিকল্প নয়, একটি প্রযুক্তিগত টুল হিসেবেই দেখুন।
  • ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করার আগে সতর্ক থাকুন।
  • বাস্তব সম্পর্ক, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখুন।
  • যদি মনে হয় এআই চ্যাটবটের প্রতি অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে, তাহলে সময় নিয়ন্ত্রণ করুন।
  • শিশু-কিশোরদের এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহারে নজর রাখা জরুরি।

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের আবেগকেও তত গভীরভাবে স্পর্শ করছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাস্তব সম্পর্কের উষ্ণতা, স্পর্শ, দায়িত্ব আর মানবিক অনুভূতির জায়গা কোনো অ্যালগরিদম পুরোপুরি নিতে পারে না। এআই হয়তো কথা বলতে পারে, সঙ্গ দিতে পারে, কিন্তু জীবনের সত্যিকারের সম্পর্ক এখনো মানুষের সঙ্গেই তৈরি হয়।

সূত্র: ওপেনএআই, হার্ভাড মেডিকেল স্কুল

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।