জীবনযুদ্ধে সফল রাশিদা খন্দকার
কৈশোর থেকে জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার দুই সন্তানের জননী রাশিদা খন্দকার। কিশোরী থাকাবস্থায় তার বিয়ে হয়। বেকার স্বামীর অবহেলা এবং শাশুড়ির অত্যাচার নির্যাতনেও তিনি থেমে থাকেননি। দীর্ঘ সময় ধরে দারিদ্রতা, সমাজের মানুষের নানা প্রকার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, মানুষের অবহেলা আর মানুষের নানা কথা সহ্য করে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত। জনপ্রতিনিধি হিসেবে সেবা দিচ্ছেন সমাজের মানুষকে। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন শিশুসহ সাধারণ মানুষের মাঝে।
শনিবার দুপুরে কথা হয় রাশিদা খন্দকারের সঙ্গে। তিনি জানালেন, দশম শ্রেণিতে লেখাপড়া করা অবস্থায় ১৯৯৪ সালে তার মা তাকে বিয়ে দেন পার্শ্ববর্তী গ্রামের কলেজ পড়ুয়া এক বেকার যুবকের কাছে। রাশিদা খন্দকারের বয়স যখন এক বছর তখন তার বাবা খন্দকার মোছলেছুর রহমান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা তাদের ৪ ভাই-বানেকে খুবই কষ্ট করে বড় করেছেন। ভালোভাবে লেখাপড়া করার আশায় ১০ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৯৯৪ সালে বিয়ে হলেও স্বামী কলেজ পড়ুয়া বেকার হওয়ায় শ্বশুর বাড়িতে তাকে আর্থিক ও মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়। শাশুড়ির অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ভাইয়ের সংসারে চলে আসেন। ১৯৯৫ সালে ১ম বিভাগে এসএসসি পাস করার পরই তিনি একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। এক পর্যায়ে পারিবারিক অশান্তির কারণে স্বামী বিদেশে চলে যায়। বিদেশ গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযাগ বন্ধ করে দেয় স্বামী। সন্তানকে লালন-পালন, আর্থিক অস্বচ্ছলতা, পারিবারিক অনিচ্ছয়তার কারণে মাঝখানে লেখাপড়া বন্ধ হলেও ২০০০ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ৮ বছর শিক্ষকতার পাশাপাশি বিএ ও এমএ পাস করেন। তিনি শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজে প্রভাষক হিসেবে কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন।
তিনি গ্রামের অশিক্ষিত মানুষের শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিজ উদ্যোগে দাদা খন্দকার আলহাজ মাওলানা আব্দুল বাছিরের নামে পাঠাগার স্থাপন করেন। সেই মাদরাসার মাধ্যমে তিনি একশ গরিব ছাত্রকে বিনা বেতনে পাঠদান করাচ্ছেন। তিনি হতদরিদ্র মহিলাদের আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন।
বর্তমানে তিনি গাজীপুর জেলা পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচিত সদস্য। ২০১৬ সালে গাজীপুর জেলা পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এলএলবি সম্পন্ন করে গাজীপুর আদালতে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে তিনি কাজ করছেন রাশিদা খন্দকার।
জীবন সংগ্রামে নিজে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন যুদ্ধ করছেন এক ছেলে ও এক মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়া নিয়ে। বর্তমানে ছেলে স্নাতক শ্রেণিতে এবং মেয়ে ৮ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করে।
জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এখন মানুষকে খুব কাছে থেকে সেবা করা যায়। তিনি নিজে যে সুবিধা পাননি সমাজের অবহেলিত নারীদের সেসব সুযোগ সুবিধা প্রদান করছেন। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন রাশিদা খন্দকার।
তার মতে কেবল ধৈর্য, ইচ্ছে শক্তির মাধ্যমে সমাজের কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে নারীরা সামনে এগিয়ে যেতে পারে।
আমিনুল ইসলাম/এমএএস/এমকেএইচ