সারের দামে দিশেহারা কৃষক
রাজবাড়ী একটি কৃষি প্রধান জেলা। এ জেলায় পেঁয়াজ ও পাটের পাশাপাশি অধিক হারে ধানের আবাদ হয়ে থাকে। কিন্তু জ্বালানি তেল, সার ও শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এবার দিশেহারা রাজবাড়ীর চাষিরা।
রোপা আমনে সেচ, সার ও বীজ অপরিহার্য। বর্তমানে রাজবাড়ীতে ইউরিয়া সার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে ৪ থেকে ৮ টাকা এবং টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার প্রায় দিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। উপায় না পেয়ে উচ্চ মূল্যেই সার কিনছেন চাষিরা।
চলতি রোপা আমন মৌসুমে রাজবাড়ীতে ৫০ হাজার ৪০০ হেক্টরের বেশি জমিতে ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ধান লাগানো সম্পন্ন হয়েছে। জেলায় আমন ধান চাষি রয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার। এ বছর ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪২ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন। যা গতবছরের চেয় প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন বেশি।

এদিকে রাজবাড়ীতে সার বিক্রির জন্য ৪৮টি বিসিআইসি ডিলারের পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে ৯ জন করে খুচরা সার বিক্রিতা রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি (আগস্ট) মাসে রাজবাড়ীতে ৫ হাজার ১১৮ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ পেয়েছেন ৩ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন। বর্তমানে মজুত রয়েছে ৭০৩ মেট্রিক টন। টিএসপি ৬২৪ মেট্রিক টন চাহিদায় বরাদ্দ পেয়েছেন ১৬৪ মেট্রিক টন। মজুত রয়েছে ৭১ মেট্রিক টন। ডিএপির ৩ হাজার ৫ মেট্রিক টন চাহিদায় বরাদ্দ ১ হাজার ৪০ মেট্রিক টন। মজুত ৪৪৭ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২ হাজার ৭৮৯ মেট্রিক টন চাহিদায় বরাদ্দ পেয়েছেন ৫৫১ মেট্রিক টন। মজুত রয়েছে ৯৪ মেট্রিক টন।

সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের বিলনয়াবাগ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বড় এক মাঠে আমনের ক্ষেত প্রস্তুত, চারা ওঠানো, ধোয়া, সার ছিটানো ও লাগানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।
কৃষক আব্দুর রাজ্জাক, ওহেদ শেখ, রাসেলসহ কয়েকজন বলেন, কৃষি কাজ করেই তাদের সংসার চলে। কিন্তু বর্তমান যে অবস্থা তাতে কৃষি কাজ করলে না খেয়ে মরতে হবে। সব কিছুর দাম বেশি। কিন্তু তারা ফসলের দাম পান না। সরকার বলে এক রকম, কিন্তু হয় আরেক রকম। এখন ধান লাগানোর মৌসুম। সার ও তেলের দাম বেশি। চাষাবাদ না করলে না খেয়ে মরতে হবে, তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনে চাষ করছেন।

তারা বলেন, ডিলারের কাছে গেলে নানা তালবাহানা শুরু করে। সার নাই, অল্প নিতে হবে এবং আনতে খরচ হয়েছে, যার কারণে দাম বেশি। আসলে প্রকৃত কৃষকরা সুবিধা পায় না, পায় দল করা নেতা ও তাদের স্বজনরা। ইউরিয়া কিনতে হচ্ছে ২৬ থেকে ২৮ টাকা কেজিতে, টিএসপি ৩২ টাকা, পটাশ সার ৩৪ টাকা ও ডিএপি সার ৩২ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে সেই দামে তো কিনতে পারছি না।
তারা অভিযোগ করে বলেন, দাম ও স্বজনপ্রীতির কারণে চাষাবাদ কমিয়ে দিয়েছেন তারা। গতবছর তাদের অনেকে ৮ থেকে ১৪ বিঘা পর্যন্ত আবাদ করেছেন। কিন্তু এবার ৬ থেকে ৭ বিঘা করে আবাদ করছেন। ধার দেনা ও কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান উৎপাদন করেন। কিন্তু সময় মতো দাম পান না। কৃষক সবদিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। এদিকে চাল কিনতে গেলে পাগল হয়ে যেতে হয়।

সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়নের সিঙ্গা বাজারে সারের ডিলার মো. শুকুর আলী বলেন, শুধু পটাশ সারের সংকট রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সেটা পাচ্ছেন না। তাছাড়া বেশি দামে কোনো সার বিক্রিও করছেন না। সরকারের নির্ধারিত দামেই ইউরিয়া কেজি প্রতি ২২ টাকা, টিএসপি ২২ টাকা, এমওপি (পটাশ) ১৫ টাকা, ডিএপি ১৬, গুটি ইউরিয়া ১৮ টাকায় সার বিক্রি করছেন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. বাহাউদ্দিন শেক বলেন, জেলাসহ উপজেলা পর্যায়ে সারের কোনো সংকট নেই। যে সার রয়েছে তা ডিলারদের মাধ্যমে সঠিকভাবে বন্টন এবং কৃষকরা যেন সার পায় সেজন্য নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং করা হচ্ছে। তাছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে সারের দাম বেশি নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ওই ডিলারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

তিনি আরো বলেন, আমন বৃষ্টি নির্ভর ফসল। গত ৩৪ বছরের মধ্যে এবার রাজবাড়ীতে বৃষ্টি সবচেয়ে কম হয়েছে। যে কারণে চাষিদের প্রচুর পরিমাণে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করতে একটু দেরি হয়েছে। তারপরও তিনি আশাবাদী কাঙ্ক্ষিত ফলন পাবেন। তবে দেরিতে আবাদ হওয়ায় ফলন ঘরে তোলা নিয়ে একটু শঙ্কা রয়েছে।
তবে ফোন করে না যাওয়ায় ব্যস্ত আছেন বলে কথা বলতে রাজি হননি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এস এম সহীদ নূর আকবর।
রুবেলুর রহমান/এফএ/জেআইএম