মোদীর ইউটার্ন

ভোটের আগে ‘সংকট নেই’, ভোটের পরে ‘মহাসংকট’

খান আরাফাত আলী
খান আরাফাত আলী খান আরাফাত আলী , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৮:০৭ পিএম, ১২ মে ২০২৬
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী/ ছবি: ফেসবুক@মোদী, গ্রাফিকস: জাগোনিউজ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের দামামা যখন ভারতের জ্বালানি বাজারে অশনিসংকেত নিয়ে হাজির হলো, তখন দিল্লির গদিতে বসা সরকার আর খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কণ্ঠে ছিল কেবলই আশ্বাসের সুর। ‘ভারত প্রস্তুত’, ‘তেলের সংকট নেই’, ‘মজুত যথেষ্ট’—এমন সব চটকদার শব্দে ভারতবাসীকে শান্ত রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই বদলে গেছে সেই সুর। একে অনেকে দেখছেন মোদী সরকারের চরম ‘রাজনৈতিক ইউটার্ন’ হিসেবে।

ভোটের আগে যেখানে সংকটের কথাগুলো ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে এখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেশবাসীকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ থেকে শুরু করে সোনা না কেনার মতো কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ দিচ্ছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি ব্যালট বাক্সে প্রভাব পড়ার ভয়েই এতদিন সংকটের খবর ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল?

ভোটের আগে ‘সব চাঙ্গা’র গল্প

গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি যখন পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে, তখন ২৩ মার্চ লোকসভায় দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী এবং দেশের কাছে পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল ও এলপিজির মজুত রয়েছে।’ এমনকি ইরান যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় ভারত ‘অভূতপূর্বভাবে প্রস্তুত’ বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন>>
এক বছর সোনা কিনবেন না, বিদেশ যাবেন না, ঘরে বসে কাজ করুন: মোদী
পশ্চিমবঙ্গে এক ধাক্কায় বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম বাড়লো ৯৯৪ রুপি
জ্বালানি সংকটেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিশ্চিন্ত যেসব দেশ

২৬ মার্চ দেশটির পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, ভারতের কাছে অন্তত ৬০ দিনের তেল এবং ৪৫ দিনের এলপিজি মজুত রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষায়, জ্বালানি ঘাটতির খবর কেবলই ‘ভিত্তিহীন গুজব’। এপ্রিলের শেষ দিকেও মোদী সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অভিন্ন সুরে জানানো হয়েছিল, উৎস বহুমুখীকরণের ফলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা পুরোপুরি সুরক্ষিত।

ভোটের পর ভোলবদল ও কৃচ্ছ্রসাধনের ডাক

গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্যের ভোটের ফল প্রকাশের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় চিত্রটি আমূল বদলে যায়। ১০ মে তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মোদীকে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। ভোটের আগের সেই ‘চাঙ্গা’ ভাব উধাও; পরিবর্তে তিনি শোনালেন বিপদের বার্তা।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে অনুরোধ জানালেন পেট্রোল-ডিজেল সাশ্রয়ের জন্য করোনা মহামারির সময়ের মতো ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু করতে, অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমাতে ভার্চুয়াল মিটিং ও গণপরিবহন ব্যবহার করতে, বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে অন্তত এক বছর সোনা কেনা এবং বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে। কৃষকদের রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার নজিরবিহীন পরামর্শও দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পরদিন যখন ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরী সাংবাদিকদের সামনে এলেন, তার কণ্ঠেও শোনা গেল আশঙ্কার সুর। তিনি স্বীকার করলেন, ভারতের তেল কোম্পানিগুলো প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কোটি রুপি লোকসান গুনছে। যদিও তিনি আগের মতোই দাবি করেন, সরবরাহে ঘাটতি নেই, তবে তার দেওয়া লোকসানের পরিসংখ্যানটিই বলে দিচ্ছিল কেন নরেন্দ্র মোদী হঠাৎ দেশবাসীকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

সরকারের বিরুদ্ধে ‘ব্যর্থতার’ অভিযোগ

এই পরিস্থিতিকে মোদী সরকারের ‘দ্বিচারিতা’ ও ‘ব্যর্থতার’ ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখছে ভারতের বিরোধী দলগুলো।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, ‘মোদীজি জনগণের কাছে ত্যাগ স্বীকারের দাবি করেছেন- সোনা কিনবেন না, বিদেশে যাবেন না, কম পেট্রোল ব্যবহার করুন, সার ও রান্নার তেল কমান, মেট্রোতে যাতায়াত করুন, বাড়ি থেকে কাজ করুন। এগুলো কোনো উপদেশবাণী নয়, এগুলো ব্যর্থতার প্রমাণ।’

রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, গত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদীর সরকার দেশকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে যে জনগণকে বলে দিতে হচ্ছে- কী কিনবে, কী কিনবে না, কোথায় যাবে, কোথায় যাবে না। প্রতিবারই তারা জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে দেয়, যাতে নিজেরা জবাবদিহিতা থেকে বাঁচতে পারে।’

কংগ্রেস নেতার মতে, এমন একজন ‘আপসকামী’ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে আর দেশ চালানো সম্ভব নয়।

আসল দৃশ্যটা কী?

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০-১২৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভারতের আমদানি খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতীয় মুদ্রার ওপর, যা ১২ মে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সর্বকালের সর্বনিম্ন ৯৫ দশমিক ৬৩ রুপিতে গিয়ে ঠেকেছে। মাত্র এক বছরে রুপির মান প্রায় ১০-১২ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে এপ্রিল মাসে ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মে মাসে আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুদ্রার এই রেকর্ড দরপতন এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভারতকে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা সামাল দিতে রিজার্ভ ব্যাংক হিমশিম খাচ্ছে।

সাধারণের নাভিশ্বাস: সাশ্রয়ের চাপে পিষ্ট জনতা

ভোটের ফল ঘোষণার আগপর্যন্ত যে সাধারণ মানুষকে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’র গল্প শোনানো হয়েছিল, এখন তারাই সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন শেষ হতেই গ্যাসের দাম একলাফে বেড়ে যায় ৯৯৪ রুপি। রান্নার জন্য ব্যবহৃত ১৯ কেজি গ্যাস সিলিন্ডারের নতুন দাম দাঁড়ায় ৩ হাজার ২০২ রুপি, যা আগে ছিল ২ হাজার ২০৮ রুপি। গত ২ মে থেকে কার্যকর হয়েছে এই নতুন দাম, যা সাধারণ মানুষের হেঁশেলের বাজেট তছনছ করে দিয়েছে।

এর ওপর প্রধানমন্ত্রীর ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এবং ‘সোনা না কেনা’র মতো পরামর্শগুলো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর মানসিক এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যাতায়াত খরচ কমাতে গণপরিবহন ব্যবহারের পরামর্শ দিলেও বাস ও অটোভাড়া এরই মধ্যে অনেক জায়গায় বেড়ে গেছে। খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের থালা থেকে পুষ্টিকর খাবার উধাও হওয়ার দশা।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় ভারত সত্যিই বড় সংকটে। কিন্তু এই সত্যটি জনগণকে আগেভাগে জানালে তাদের জন্য প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হতো।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী কি জানতেন না বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে বা ভারতে তেলের কোম্পানিগুলো লোকসান করছে? যদি জানতেন, তবে কেন তখন ‘ঘাটতি নেই’ বলে বুক ফুলিয়ে প্রচার করেছিলেন? তা কি শুধু ভোট পাওয়ার জন্য? আর এখন কেন জনগণকে এত সাশ্রয়ী হতে বলছেন? পরিস্থিতি কি তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?

সূত্র: ডেকান হেরাল্ড, ভারতীয় তেলগ্যাস মন্ত্রণালয়, সিএনবিসি, নিউজ ১৮, টাইমস অব ইন্ডিয়া
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।