আমাজনকে বাঁচাতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন ব্রাজিলের পরিবেশবিদরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৫৪ পিএম, ০৫ জুন ২০২৩

‘পৃথিবীর ফুসফুস’ নামে খ্যাত ব্রাজিল ও আশেপাশের লাতিন আমেরিকান দেশগুলোতে ছড়িয়ে থাকা রেইনফরেস্ট ‘আমাজন’। পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশই আসে ৫৫ লক্ষ্য বর্গ কিলোমিটার ক্ষেত্রবিশিষ্ট এ অরণ্য থেকে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বনভূমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার জন্য প্রায় পুরোটাই দায়ী আমরা মানবজাতি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর আমলেই ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে আমাজন। আর গত বছরই সবচেয়ে বেশি উজাড় হয়েছে এ বন।

সেসময় বলসোনারো প্রশাসন বলেছিল, দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আমাজন পরিষ্কার করে আরও বেশি মাইনিং (মূল্যবান পদার্থের খনি খনন) ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প করা হচ্ছে। আর তাতেই সুযোগ পেয়ে যায় সরকাদলীয় কিছু অসাধু মানুষ। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে তারা সমানে আমাজন নিধন করতে থাকেন, যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জলবায়ুর উপরে।

তবে বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান পরিবেশবিদরা বনটিকে বাঁচাতে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছেন। তারা বনটির গহীনে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু অংশে নতুন ধরনের আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। যাতে বাসস্থান নির্মানের জন্য আমাজনকে আর ধংস না করা হয়।

জানা যায়, আমাজনে প্রায় ৪০০-৫০০ উপজাতির বসবাস রয়েছে। তাছাড়া ১৯৬০ সালের পর সাধারণ মানুষের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার পর বনটিতে স্থানীয় আদিবাসীদের পাশাপাশি আধুনিক মানুষদেরও বসবাস শুরু হয়। আর এসব বাসিন্দা ও কতিপয় বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে নিজেদের পরিকল্পনাগুলো সফল করতে চান গবেষকরা।

এ প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে, যুক্তরাজ্যের ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্লোস পেরেসের নেতৃত্বে। সেসময় গবেষকরা চার মাস ধরে আমাজনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা জুরুয়া নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ১০০টি জনবসতি বা পাড়া ঘুরে দেখেন। তারা দেখতে পান, কিছু কিছু জনবসতি রয়েছে যেগুলোতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

জোয়াও ভিটর ক্যাম্পোস-সিলভা নামের এক গবেষক বলেন, যেসব জনবসতি ভূমিদস্যুদের অর্থাৎ আধুনিক মানুষদের মাধ্যমে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে, সেগুলোতে আধুনিক অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু অন্যান্য আদিবাসী জনবসতির দিকে তাকালে মনে হয়, সেগুলো আধুনিক সভ্যতার তুলনায় ৪০ বছর পিছিয়ে রয়েছে।

এ বিষয়টি বুঝতে হলে আমাজন ইনস্টিটিউট অব পিপল অ্যান্ড দ্য এনভাইরোনমেন্টের দেওয়া কিছু তথ্য জানতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আমাজনের ২৯ শতাংশ জায়গা মানুষের দখলে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের তিনগুন। এসব এলাকা হয় বিশেষ নিরাপত্তা বা গোপনীয়তা দিয়ে ঢাকা বা এসব এলাকা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

নতুন জনবসতি গড়ে তুলতে এসব এলাকাগুলো থেকে ব্যাপক পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে। আর এ কাজের নেতৃত্ব দেন স্থানীয় ভূমিদস্যুরা। একবার জায়গা খালি হয়ে বাসস্থান গড়ে তুলতে পারলেই তারা সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকে। আর অনুমোদন পেয়ে গেলেই জায়গাগুলোর মালিকানা তাদের হাতে চলে যায়।

জুরুয়া নদীর মেদিও জুরুয়া নামক অংশে গড়ে উঠেছে কারাউয়ারি নামের একটি শহর। আধুনিক শহরগুলোতে যেসব সুযোগ-সুবিধা ও প্রতিষ্ঠান থাকে কারাউয়ারিতেও তেমন সবই রয়েছে।

শহরটির বাসিন্দারা নদীর সংরক্ষিত স্থান থেকে পর্যাপ্ত মাছ এবং বন থেকে মাংস ও ফলের জোগাড় করতে পারেন। এর পাশাপাশি অনেকেই গৃহপালিত পশু পালন করেন। তাছাড়া এখানে সংরক্ষিত কিছু জমিও রয়েছে, যেখানে বাসিন্দার প্রয়োজনীয় শস্য চাষ করতে পারেন।

আমাজনকে বাঁচাতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন ব্রাজিলের পরিবেশবিদরা

কিন্তু সংরক্ষিত এলাকার বাইরে গিয়ে বাসিন্দারা কিছুই করতে পারেন না। যদি কেউ কিছু করতে চান তাহলে, স্বঘোষিত ভূমি-মালিকদের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ জানে না, কারা এসব জমির আসল মালিক।

ক্যাম্পোস-সিলভা বলেন, আমরা একটা নতুন জনবসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করি, যেখানে বসবাস করা লোকজন বন থেকে খাওয়ার উপযোগী ফল-মূল, সবজি ও নদী থেকে মাছ শিকার করতে পারবে। আমাদের মনে হয়, এসব সুযোগ-সুবিধা পেলে মানুষ শহরে যাবে না কিংবা অবৈধভাবে গাছ কাটা ও মাছ শিকার থেকে বিরত থাকবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী গবেষকরা জুরুয়া ইনস্টিটিউট নামের অলাভজনক সংস্থা গড়ে তোলেন ও জুরুয়া নদীর কোলঘেঁষা ১৩ কিলোমিটার (৮ মাইল) আয়তনের একটি জায়গা কেনেন। এ জায়গার মধ্যে রয়েছে ২০টি লেক, যেগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে সুস্বাদু পিরারুকু মাছ চাষের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে।

আমাজনকে বাঁচাতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন ব্রাজিলের পরিবেশবিদরা

জুরুয়া ইনস্টিটিউটের আশেপাশে রাবার সংগ্রহকারীদের ১২টি কমিউনিটি রয়েছে। অতীতে, রাবার সংগ্রহের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তাদের আমাজনে আসতে আকৃষ্ট করেছিল। তবে আজকাল তাদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে পিরারুকু চাষ।

নদীমাতৃক জনগোষ্ঠীকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য, ইনস্টিটিউটটি একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করে ও ‘স্বপ্নের সম্প্রদায়’ নামে একটি সিরিজ জনসভা চালু করে। এসব জনসভায় কমিউনিটিতে বসবাসরত লোকজন, তাদের সবচেয়ে বেশি কাঙ্ক্ষিত চাহিদাগুলো তুলে ধরে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রসার ঘটানো।

নদী সম্প্রদায় অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, ফারনান্দা দে আরাউজো মোরায়েস বলেন, জুরুয়া ইনস্টিটিউটের মূল উদ্দেশ্য হলো, নদীবাসীদের শহরে যেতে বাধা দেওয়া। এটা ভালো উদ্যোগ, কারণ শহরে বেকারত্ব বিকট ও মাদক পাচারের কারণে অধিকাংশ সময় সহিংসতা লেগেই থাকে।

আমাজনকে বাঁচাতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন ব্রাজিলের পরিবেশবিদরা

আরাউজো আরও বলেন, আমার নিজের সম্প্রদায় লাগো সেরাডোতে ১২টি পরিবার বসবাস করে। পরিবারগুলো জুরুয়া ইনস্টিটিউটের কাছে শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে ২৪ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসংযোগের দাবি তুলে ধরেছে। আর যুবকরা মাছ ধরার প্রশিক্ষণ নিতে চেয়েছে।

তিনি বিশ্বাস করেন, এ ধরনের সহযোগিতা আমাজন রক্ষা ও স্থানীয় আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। তিনি বলেন, আমরা আমাদের জীবনকে উন্নত করতে চাই ও জুরুয়া ইনস্টিটিউট আমাদের সহায়তা করতে চায়।

আমাজনকে বাঁচাতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন ব্রাজিলের পরিবেশবিদরা

জুরুয়া ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক কার্লোস পেরেস বলেন, আমরা ২০ জনের মতো গবেষক আমাজন নিয়ে কাজ করছি। আমাদের জন্য একটি হাউজবোট ও একটি কাঠের ঘর রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা যে কাজগুলো করছি তা, পশ্চিমা বিজ্ঞানের জ্ঞানকে একীভূত করে আমাজনজুড়ে যেসব সমস্যা রয়েছে তা সমাধান করার প্রচেষ্টা। আমাদের কাছে সব উত্তর নেই, কিন্তু বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার ও এগিয়ে যাওয়ার সাহস রয়েছে।

আমাজনকে বাঁচাতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন ব্রাজিলের পরিবেশবিদরা

ভারতের মোট আয়তনের দ্বিগুণ এলাকা জুড়ে থাকা আমাজন রেইনফরেস্টকে কার্বন সিংক বলা হয়। অর্থাৎ এটি বিপুল পরিমাণ কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ করে রেখে বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে বাধা সৃষ্টি করে। কিন্তু ভূমি-দস্যুদের কবলে পড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাজন এতটাই ধ্বংস হয়েছে যে, কার্বন সিংকের পরিবর্তে একটি কার্বনের উৎসে পরিণত হয়েছে।

আমাজন যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে এটির শোষণ করে রাখা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড থাকলেও তৈরি হবে না অক্সিজেন। পৃথিবীর তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। হুমকির মুখে পড়বে পুরো পৃথিবী।

সূত্র: সিএনএন

এসএএইচ/জেআইএম

টাইমলাইন  

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।