কিডনি রোগের ঝুঁকিতে আছেন যারা, জানুন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

আনিসুল ইসলাম নাঈম
আনিসুল ইসলাম নাঈম আনিসুল ইসলাম নাঈম , ফিচার লেখক
প্রকাশিত: ০৭:১৭ পিএম, ১৭ মার্চ ২০২৬
কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই এগিয়ে যায়, তাই অনেক ক্ষেত্রে এটিকে উপসর্গহীন বলা হয়। ছবি/জাগো নিউজ

কিডনি আমাদের শরীরের একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রতিদিন এই দুটি ছোট অঙ্গ রক্ত পরিশোধন করে, শরীরের বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হাড় ও রক্ত তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অথচ দুঃখজনক সত্য হলো - কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় কোনো লক্ষণই থাকে না। ফলে অনেক মানুষ জানতেই পারেন না যে তাদের কিডনি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কিডনি রোগের লক্ষণ, প্রতিকার ও চিকিৎসার নানা বিষয় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ।

কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী কী?

কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই এগিয়ে যায়, তাই অনেক ক্ষেত্রে এটিকে ‘উপসর্গহীন’ বলা হয়। ফলে রোগী ধীরে ধীরে জটিল অবস্থায় পৌঁছে যান।

প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণত অস্পষ্ট এবং অনেক সময় অন্যান্য সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিডনির প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত কিডনি বিকলের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না।

যেসব লক্ষণ দেখা দিলে কিডনি সমস্যার সন্দেহ করা উচিত, সেগুলো হলো

>> প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তন
>> পা ও গোড়ালি এবং চোখের নিচে ফোলাভাব
>> অবসাদ ও দুর্বলতা
>> শ্বাসকষ্ট
>> বমিভাব বা বমি
>> অকারণে শরীর চুলকানো
>> রাতে বারবার প্রস্রাব করা
>> প্রস্রাবে ফেনা বা রক্ত দেখা দেওয়া
>> প্রস্রাবের সময় জ্বালা-পোড়া বা ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
>> এছাড়া মেরুদণ্ডের এক পাশে বা তলপেটে ব্যথাও হতে পারে।

শিশদের ক্ষেত্রে কখন সাবধান হবেন

শিশুদের গলা ব্যথা, জ্বর ও ত্বকে খোস-পাঁচড়া হলে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা করা উচিত। কারণ এগুলো থেকে কিডনিতে প্রদাহ বা নেফ্রাইটিস দেখা দিতে পারে।

হঠাৎ রক্তক্ষরণ, তীব্র ডায়রিয়া, বমি বা রক্ত আমাশয়ের কারণে শরীরে রক্ত, পানি ও লবণের ঘাটতি তৈরি হয়ে কিডনি বিকল হতে পারে। তাই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। প্রা

থমিক অবস্থায় খাবার স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে এবং প্রয়োজন হলে শিরায় স্যালাইন দিতে হয়। প্রস্রাবের ঘন ঘন সংক্রমণ হলেও যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া দরকার।

কিডনি রোগের ঝুঁকিতে আছেন যারা, জানুন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

কেন উপসর্গহীন বলা হয়

কিডনির প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষতি হওয়ার আগে পর্যন্ত স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। কারণ শরীর অন্যভাবে এই ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করে। এছাড়া লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে বাড়ে এবং অনেক সময় বয়স, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের সঙ্গে গুলিয়ে যায়।

প্রাথমিক পরীক্ষা যেমন রক্তে ক্রিয়েটিনিন বা ইউরিয়া পরীক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো কিডনি রোগ ধরা সম্ভব।

কারা কিডনি রোগের বেশি ঝুঁকিতে?

কিছু মানুষের কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। যেমন -

>> ডায়াবেটিস রোগী
>> উচ্চ রক্তচাপের রোগী
>> হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
>> অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
>> পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস থাকা

এছাড়াও ঝুঁকিতে আছেন -

>> যাদের আগে একিউট কিডনি ইনজুরি হয়েছে
>> গর্ভাবস্থায় কিডনি জটিলতা হয়েছে এমন নারী
>> লুপাস বা ভাসকুলাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
>> কম ওজন নিয়ে বা সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশু
>> প্রস্রাবের পথে বাধা বা বারবার কিডনিতে পাথর হওয়া

যত্রতত্র ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক সেবন কিডনির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক সেবন কিডনির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে কিডনির রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে হঠাৎ কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগস (এনএসএআইডি) যেমন আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক বা নেপ্রোক্সেন কিডনির রক্তনালী সংকুচিত করে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। ফলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বয়স্ক, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ঝুঁকি বেশি।

অন্যদিকে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক যেমন জেন্টামাইসিন, নিওমাইসিন, কানামাইসিন, পলিমিক্সিন বা কিছু সিফালোস্পোরিন কিডনির টিউবুলার ক্ষতি করতে পারে। ভুলভাবে সেবন করলে কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রতিরোধের উপায়

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা, ওষুধের নির্ধারিত মাত্রা মেনে চলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি রোগ থাকলে ওষুধের মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সামঞ্জস্য করতে হয়।

কিডনি সুস্থ রাখতে ব্যায়ামের ভূমিকা

নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম কিডনি সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং ক্রনিক কিডনি রোগের ঝুঁকি কমায়।

>> রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে কিডনির কার্যকারিতা উন্নত করে
>> ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়
>> প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়
>> পেশিশক্তি বাড়ায়

সপ্তাহে প্রায় ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম ক্রনিক কিডনি রোগের ঝুঁকি প্রায় ১৭–২০ শতাংশ কমাতে পারে।

তবে কিডনি রোগ থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।

কিডনি বিকলের শেষ পর্যায়ে চিকিৎসা

কিডনি বিকলের শেষ পর্যায়কে বলা হয় এন্ড-স্টেজ রেনাল ডিজিজ (ইএসআরডি)। এ অবস্থায় ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া কার্যকর বিকল্প চিকিৎসা নেই, কারণ তখন কিডনি আর নিজে থেকে শরীরের বর্জ্য অপসারণ করতে পারে না।

কিডনি প্রতিস্থাপন দীর্ঘমেয়াদি সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। তবে দাতা পাওয়া এবং অস্ত্রোপচারের জটিলতার কারণে অনেক রোগীর জন্য এটি সহজলভ্য নয়।

বিকল্প হিসেবে হেমোডায়ালাইসিস বা পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস করা হয়, যা কৃত্রিমভাবে রক্ত পরিশোধনের কাজ করে।

দেশে কিডনি চিকিৎসার অবস্থা

বাংলাদেশে কিডনি চিকিৎসার সুযোগ বাড়লেও ব্যয় এখনও অনেকের জন্য বড় বাধা। ঢাকার কিছু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নেফ্রোলজি বিভাগ, ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের সুবিধা রয়েছে।

সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের খরচ মাসে প্রায় ২০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্যবিমা ও ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ চালু হলে কিডনি রোগীদের চিকিৎসা পাওয়া সহজ হবে এবং অনেক অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

এএমপি/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।