‘১০০ পূর্ণ হওয়ার পর মনে হলো ওহ শতরান হয়ে গেল!’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১১:২৯ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০২১

অবশেষে দেশের বাইরে প্রথম সেঞ্চুরি হলো। এতকাল ঘরের মাঠে ১০ সেঞ্চুরিই ছিল নামের পাশে। দেশের বাইরে ছয়-ছয়বার পঞ্চাশের ঘরে পা দিলেও তিন অংকে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সর্বোচ্চ স্কোর ছিল পচেফস্ট্রমে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৭।

এছাড়া নিউজিল্যান্ড আর শ্রীলঙ্কায়ও দুটি ষাটোর্ধ ইনিংস ছিল। এবার আগের সব বাধা অতিক্রম করে আজ ২২ এপ্রিল ক্যান্ডির পাল্লেকেল্লে স্টেডিয়ামে বিদেশে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি হলো পূর্ণ। এ অপূর্ণতা পরিপূর্ণ করতে পেরে কেমন লাগলো?

সেঞ্চুরিটি কিভাবে দেখছেন বাংলাদেশ ক্যাপ্টেন? দলের খারাপ সময়েও ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শতরান করেছিলেন। এবার শ্রীলঙ্কায়ও শতরানের দেখা মিললো। এটাকে কি অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার মত আদর্শ উদাহরণ বলে মনে হয়? দীর্ঘ লালিত শতরানের পর টাইগার ক্যাপ্টেনের ভেতরকার অনুভূতি কী?

আজ বৃহস্পতিবার ক্যান্ডি টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে তিনি আর মিডিয়ায় কথা বলেননি। তবে জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য সুখবর, মুমিনুল মুঠোফেনে কথা বলেছেন শুধুই জাগো নিউজের সাথে।

শুনে অবাক হবেন, এতকাল যে বিদেশে কোন টেস্ট সেঞ্চুরি ছিল না। বা টেস্ট শতক হাকাতে পারেননি, তা নিয়ে কোন সিরিয়াস আক্ষেপ অনুশোচনা ছিল না তার। দীর্ঘদিন পর সেই শতরান করতে পেরেও বরাবরের মতই নির্লিপ্ত মুমিনুল।

আসুন শোনা যাক কেমন ছিল সে কথোপকোথন?

জাগো নিউজ : এতদিন যে বিদেশে সেঞ্চুরি ছিল না, তা নিয়ে কতটা আক্ষেপ ছিল?

মুমিনুল : সত্যি বলতে কি, আমি আসলে এটা নিয়ে ওভাবে ভাবিনি। আসলে আমার প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য থাকে টেস্ট খেলা এবং সামর্থ্যের সেরাটা উপহার দেয়া। আমি দলের কথা ভাবি। দলকে কন্ট্রিবিউট করার চিন্তা মাথায় থাকে। হয়ত দরকারি সময় একটা ভাল ইনিংস উপহার দেয়া, কোন সংকটে একটা ভাল পার্টনারশিপ তৈরি করা- এগুলোই আমার মাথায় থাকে। আমি নিজে সেঞ্চুরি করবো, সেঞ্চুরি হয়নি দেশের বাইরে- এসব নিয়ে আসলে তেমন ভাবি না। ভাবি না এই কারণে যে সেটা খুব ধর্তব্য নয়। কারণ আপনি নিজে সেঞ্চুরি করলেন; কিন্তু তা কোন কাজে আসলো না। দল হারলো। তাতে লাভ হলো কী? সেই সেঞ্চুরি দেশে না বিদেশে? তার কী আর কোন মূল্য থাকে?

জাগো নিউজ : আচ্ছা এই টেস্টের আগে আপনার লক্ষ্য কী ছিল? টিম একটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, দল ভাল করতে হলে আপনাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। সেঞ্চুরি করতে হবে। এমন কোন চিন্তা কী মাথায় ছিল?

মুমিনুল : আসলে আপনি যখন কোন পেশাদার দলের নেতৃত্ব দেবেন, তখন প্রফেশনাল প্লেয়ার হিসেবে এসব মাথায় আসাই ঠিক না। এতে করে প্রত্যাশার চাপ বাড়ে। নিজ থেকে একটা চাপ কাজ করে ভিতরে। সেটা বরং ভালোর চেয়ে খারাপই হয়।

Muminul

আমার ক্রিকেট দর্শনটা আসলে একটু ভিন্ন। আপনারা কিভাবে নেবেন জানি না, আমি টেস্টে ও যখন ব্যাটিংয়ে নামি, তখন নিজেকে ব্যাটসম্যান মুমিনুল মনে করি। মাথায় থাকে আমি ব্যাটসম্যান মুমিনুল। ইভেন ক্যাপ্টেন যে তাও মাথায় আনি না। আমি নিজেকে অধিনায়ক মুমিনুল ভাবি যখন ফিল্ডিংয়ে থাকি। বোলার ব্যবহার, ফিল্ডিং সাজানোর সময় মনে হয় আমি অধিনায়ক। এখন আমাকে ভাল সিদ্ধান্ত দিতে হবে। আর কিছু না।

জাগো নিউজ : এই টেস্ট শুরুর আগে তাহলে আপনার ব্যক্তিগত তেমন কোন লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ছিল না?

মুমিনুল : পরিকল্পনা বলতে ভাল খেলার ইচ্ছে, আকাঙ্খাতো অবশ্যই ছিল। আমি আসলে প্রতিটি টেস্টেই মন-প্রাণ উজাড় করে দিয়ে খেলি। সব ম্যাচেই আমার লক্ষ্য থাকে নিজের সেরাটা উপহার দেয়ার।

জাগো নিউজ : লোকজন বলাবলি করে, মুমিনুল দেশে ১০টা সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন, অথচ দেশের বাইরে একটিও শতক নেই। সেটা কী ভিতরে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতো না? কখনো নিজের ভিতরে কোনরকম আফসোস-আক্ষেপ জন্মায়নি?

মুমিনুল : এটা নিয়ে আক্ষেপ-অনুশোচনা করবো কেন? এটাতো আসলে আমিই ক্রিয়েট করেছি। আমি যদি এর আগেই বিদেশে টেস্ট সেঞ্চুরি করে ফেলতাম, তাহলেতো আর কেউ এমন কথা বলতো না। আমি পারিনি বলেই না এমন কথা-বার্তার উদ্রেক ঘটেছে। আমি আগেভাগে দেশের বাইরে টেস্ট সেঞ্চুরি করলে তো আর কোন কথাই উঠতো না।

এমন নয় আমার সামনে কোন সুযোগ আসেনি, বা কখনোই কোন শতরানের সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। হয়েছে। আমি নিউজিল্যান্ডের মাটিতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজেও আগে পঞ্চাশের ওপরে রান করেছি। কিন্তু সেঞ্চুরি করতে পারিনি। সাউথ আফ্রিকায় ৭৭, নিউজিল্যান্ডে ৬০ প্লাস ইনিংস আছে আমার। এগুলো যদি হান্ড্রেড হতো, তাহলে আর কোন কথাই শুনতে হতো না।

তাই বলছি যে তীর্য্যক কথা বার্তা হয়, সেগুলো আমার নিজের সৃষ্টি করা। যখন আমি করতে পারিনি, তখন লোকজন এমন বলবেই। আর এ পর্যায়ে খেললে সাধারণ দর্শক ও মানুষের নানা ধরনের কথাবার্তা শুনতেই হয়। হবেই।

আমি কোন ডিপ্লোমেটিক উত্তর দেইনি কিন্তু; একদম মন থেকে সোজা ভাষায় বলছি। আমি আসলে এগুলো মন থেকে মেনেই খেলি। প্রেসার না। আমি কন্ট্রিবিউট করতে চাই। করতে পারলেই খুশি।

জাগো নিউজ : এই ম্যাচে কখন মনে হয়েছে যে সেঞ্চুরি হয়েই যাচ্ছে।

মুমিনুল : (হেসে) আসলে যখন ১০০ পূর্ণ হয়েছে, তখনই মনে হলো ওহ শতরান হয়ে গেল! তার আগে মাথায়ই আনিনি যে সেঞ্চুরি করবো।

জাগো নিউজ : আগের দিন যখন ৬৪’তে নটআউট ছিলেন, তখনও কী মনে হয়নি যে এবার বুঝি দেশের বাইরে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি হয়েই যাবে?

মুমিনুল : আমি আসলে সেঞ্চুরি নিয়ে ভাবিনি। তার চেয়ে বেশি ভেবেছি, দ্বিতীয় দিন মানে আজ প্রথম সেশন উইকেটে কাটাতে। গতকাল মঙ্গলবার মাঠ থেকে হোটেল রুমে ফিরে রাতে শুয়েশুয়ে ভেবেছি কালকের প্রথম সেশনটা আমাদের টিমের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথম দিন শেষে আমাদের স্কোর ছিল ২ উইকেটে ৩০২। তাই চিন্তা করেছি আমরা যদি দ্বিতীয় দিনের ফার্স্ট সেশনটা ভালমত পার করে দিতে পারি , তাহলে পরের দিকে রানটা বাড়বে।

Muminul

আমার মূল লক্ষ্যই ছিল যে কোনো মূল্যে দ্বিতীয় দিন প্রথম সেশনটা যাতে ভালভাবে পার করা যায়। আমার বিশ্বাস ছিল, যদি দ্বিতীয় দিনের প্রথম দুই ঘণ্টা ক্রিজে কাটিয়ে দিতে পারি, তাহলে আমার ১০০ রান হয়ে যাবে। টিমও একটা শক্ত ও মজবুত অবস্থানে চলে যাবে। যদি এক কথায় বলতে বলেন, তাহলে বলবো- আমি নিজের ১০০ রানের চেয়ে আজকের ফার্স্ট সেশনটা নিয়েই চিন্তা করেছি বেশি।

জাগো নিউজ : তবে কী আপনি বলতে চান দেশের বাইরে এ ম্যাচেও টেস্ট সেঞ্চুরি করতে মরিয়া ছিলেন না আপনি?

মুমিনুল : না, না। মোটেই এমন কোন সুনির্দিষ্ট টার্গেট বেঁধে নামিনি। আসলে আমার মত করে ভাবি। আমার লক্ষ্যই থাকে প্রতি টেস্টে আমি যেন চার থেকে পাঁচ সেশন ব্যাটিং করতে পারি। এটা আমি চেষ্টা করি। আপনি টেস্টের বড় বড় প্লেয়ারদের দিকে ভাল মত খেয়াল করলে দেখবেন, তারাও প্রতি ম্যাচে চার থেকে পাঁচ সেশন উইকেটে কাটানোর লক্ষ্যে ব্যাটিং করেন।

বড়বড় ব্যাটসম্যানরাও কখনো ১০০ বা ২০০ করার কথা চিন্তা করে টেস্ট খেলতে নামেন না। এর মধ্যে ভাল বল আপনার ভাগ্যে চলে আসলে তো আর কিছু করার থাকে না। আসলে এটাই আমার টেস্ট দর্শন। আমি দীর্ঘ সময় উইকেটে কাটানোর লক্ষ্যে খেলতে নামি। জানি উইকেটে বেশি সময় থাকতে পারলে নিজের স্কোরটাও ভাল হবে। তারপরও আমার প্রথম লক্ষ্য থাকে উইকেটে বেশি সময় ধরে অবস্থান করা বা বেশি সময় ব্যাট করা।

জাগো নিউজ : এখন টিম বাংলাদেশ কোন অবস্থায় আছে?

মুমিনুল : আমি বলবো না যে খুব ভাল অবস্থায়, মানে একদম শতভাগ নিরাপদ বা খুব ভাল জায়গায় আছি। আমার মনে হয় আলোর স্বল্পতা ও বৃষ্টির কারণে যদি দেড় ঘণ্টা খেলা নষ্ট না হতো, তাহলে খুব ভাল হতো। তাহলে অন্তত আরও ৬০ থেকে ৭০ রান বেশি থাকতো স্কোর বোর্ডে। তাতে একটু পিছিয়ে গেছি। যদি পুরো দিন খেলা হতো, তাহলে আরও এগিয়ে যেতাম।

কালকে সকালে বোঝা যাবে আমরা কতদুর যাব। প্রতি ম্যাচের প্রতিটি দিনের প্রথম সকালই কিন্তু ইম্পরট্যান্ট। ফার্স্ট সেশনটা যদি লিটন আর মুশফিক ভাই ভাল ব্যাটিং করতে পারেন, তাহলে অনেক ভাল পজিসনে চলে যাব। অবশ্য এখনো আমরা ভাল পজিসনেই আছি। যদিও আমাদের ব্যাটসম্যান কম।

জাগো নিউজ : শতরান পূরণের মুহূর্তটা কেমন ছিল? কী মনে হচ্ছিল তখন?

মুমিনুল : আসলে এমন সময় আল্লাহর শুকরিয়া করা ছাড়া আর কিইবা বলার থাকে? আমি মন থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে আলহামদুল্লিল্লাহ বলেছি । অন্তর থেকে আল্লাহর শুকরিয়া বলাটাই শেষ কথা। আমি চেষ্টা করেছি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের। তার প্রতি সর্বোচ্চ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের। আসলে আমি সব সময়ই সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে চেষ্টা করি ভাল কিছু করতে। দলকে এগিয়ে নিতে। কাজেই ভিতরে ভাল লাগা কাজ করেছে অবশ্যই।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]