ব্রাহ্মণবাড়িয়া তাণ্ডব : ঝুলে আছে ১৬ মামলার তদন্ত কাজ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ১১:৩৩ এএম, ১২ জানুয়ারি ২০১৮
ব্রাহ্মণবাড়িয়া তাণ্ডব : ঝুলে আছে ১৬ মামলার তদন্ত কাজ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি শহরজুড়ে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছিল মাদরাসা ছাত্ররা। সেদিন রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো শহর। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ আর লুটপাটের ঘটনায় অন্তত একশ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।

তাণ্ডবলীলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ উস্তাদ আলউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরের কয়েটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়। এ সব ঘটনায় দায়েরকৃত ১৬ মামলায় নাম উল্লেখ করে ১৬২ জন ও অজ্ঞাত সাত হাজার ১৫০ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে কেবল ৩২৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে বেশিরভাগই জামিনে এখন কারামুক্ত।

যদিও উল্লেখযোগ্য কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তাছাড়া দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ১৬ মামলার মামলার তদন্ত কাজে কোনো অগ্রগতি নেই। তবে পুলিশ বলছে, অচিরেই আদালতে সবগুলো মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।

২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরশহরের জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে অটোরিকশার ভাড়া নিয়ে অটোচালকের সঙ্গে স্থানীয় জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার এক ছাত্রের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে জেলা পরিষদ মার্কেটের বিজয় টেলিকমের স্বত্বাধিকারী জয় ওই মাদরাসা ছাত্রকে এসে থাপ্পড় দেন। এ নিয়ে সন্ধ্যায় অর্ধশত ছাত্র বিজয় টেলিকমে গিয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। পরে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মাদরাসা ছাত্রদের শান্ত করতে চাইলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়।

একপর্যায়ে তা রূপ নেয় সংঘর্ষে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরাও মাদরাসা ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ত্রিমুখী এ সংঘর্ষ চলাকালে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ২০/২৫টি ককেটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে। কয়েক দফা চলা ওই সংঘর্ষে তিন পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।

B-baria

মাদরাসা ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনায় ১২ জানুয়ারি ভোরে জেলা সদর হাসপাতালে হাফেজ মাসুদুর রহমান (১৮) নামে আহত এক মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যু হয়। মাসুদের সহপাঠীরা অভিযোগ করেন, সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে মাসুদের মৃত্যু হয়। মূলত মাসুদের মত্যুর পরই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর।

এদিন সকাল থেকে বিক্ষুব্ধরা শহরের হাসপাতাল রোড, লোকনাথ ময়দান ও টি.এ রোডে টায়ার জ্বালিয়ে ও বাঁশ ফেলে সড়ক অবরোধ করে। এরপর মাদরাসা ছাত্রদের একটি বিক্ষোভ মিছিল থেকে স্থানীয় ব্যাংক এশিয়ার শাখার গ্যাস ভাঙচুর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর-৩ আসনের সংসদ সদস্য র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর ছবি সম্বলিত বেশ কিছু ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়।

মাদরাসা ছাত্র মাসুদের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১২ জানুয়রি সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে দু’দফা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর এবং রেললাইনে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ মাদরাসা ছাত্ররা। এছাড়াও শহরের হালদারপাড়াস্থ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে তারা। এ সময় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের পাশের একটি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এরপর হামলাকারীরা উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গণে গিয়ে হামলা চালিয়ে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন এবং সঙ্গীতাঙ্গণের জাদুঘরে সংরক্ষিত উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র সরোদ ও জায়নামাজসহ অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র ভেঙ্গে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সময়ে শহরের ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ভাষা চত্বরের বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়েও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধরা।

বিকেলে কে বা কারা গুজব ছড়িয়ে দেয় যে হাসপাতাল থেকে নিহত মাদরাসা ছাত্রের মরদেহ দেয়া হচ্ছে না। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ মাদরাসা ছাত্ররা শহরের টি.এ রোডস্থ ফকিরাপুলে দাঁড়ানো অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের বহনকারী একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেয়। একই সময়ে জেলা সদর হাসপাতালে ভাঙচুর চালায় বিক্ষুব্ধরা। তাণ্ডবের পরেও হাফেজ মাসুদুর রহমানের মৃত্যুর প্রতিবাদে ও সদর মডেল থানার তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) তাপস রঞ্জন ঘোষ ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকুল চন্দ্র বিশ্বাসের প্রত্যাহারের দাবিতে হরতাল ডাকে কওমি ইসলামি ছাত্র ঐক্য পরিষদ।

B-baria

বিক্ষুব্ধ মাদরাসা ছাত্রদের নিবৃত করতে ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসায় বৈঠকে বসে জেলা প্রশাসন। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা ওই বৈঠক শেষে এসএসপি তাপস রঞ্জন ঘোষ এবং ওসি আকুল চন্দ্র বিশ্বাসকে প্রত্যাহার এবং নিহত ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস পেয়ে হরতাল প্রত্যাহার করে নেয় বিক্ষুব্ধরা।

এদিকে মাদরাসা ছাত্রদের চালানো তাণ্ডবের ঘটনার দুই বছরেও পুলিশ প্রকৃত হামলাকারীদের গ্রেফতার করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এ নিয়ে সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যেও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ মামলার বাদী আবদুল মান্নান সরকার বলেন, মৌলবাদীরা হামলা চালিয়ে সঙ্গীতাঙ্গনের যে ক্ষতি করেছে সেটি থেকে উত্তরণ হওয়া গেলেও সুর সম্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র ব্যবহৃত যে জিনিসপত্রগুলো ধ্বংস করা হয়েছে সেটি তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত বিচার না হওয়ায় আমরা ক্ষুব্ধ। দ্রুত এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নবীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, সবগুলো মামলা স্পর্শকাতর হওয়ার কারণেই আমাদের তদন্ত কাজে বেশি সময় লাগছে। তবে অচিরেই আদালতে মামলাগুলোর অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয়া হবে।

আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/এমএস