আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সক্রিয় সদস্য খালেদ!

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫৩ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

>> গুলশান থানায় অস্ত্র ও মাদক মামলায় সাতদিনের রিমান্ডে
>> মতিঝিল থানার মাদক মামলার রিমান্ড শুনানি ২৯ সেপ্টেম্বর
>> ‘তার দখলে বিপুল পরিমাণ সিসা, বিয়ার ও ইয়াবা মজুত আছে’

ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সক্রির সদস্য। তিনি ‘ভূঁইয়া গ্রুপ অব কোম্পানিজ’ প্রতিষ্ঠানের আড়ালে বিদেশ থেকে সিসা, বিয়ারজাতীয় মাদক আনতেন। এছাড়া কক্সবাজার থেকে ইয়াবা ট্যাবলেট এনে ঢাকা শহরের বিভিন্ন ক্লাবে সরবরাহ করতেন।

গত শুক্রবার মতিঝিল থানায় দায়ের করা মাদক মামলায় খালেদের বিরুদ্ধে সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক সফিকুল ইসলাম আকন্দ। আবেদনে তিনি এসব কথা উল্লেখ করেন।

রোববার ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরীর আদালতে আবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। আদালত আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে হাজতি পরোয়ানা ইস্যু করেন। ওইদিন তার উপস্থিতিতে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন এবং রিমান্ড শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন।

এর আগে গুলশান থানায় অস্ত্র ও মাদকের পৃথক দুই মামলায় সাতদিনের রিমান্ডে নেয়া হয় আলোচিত এ যুবলীগ নেতা খালেদকে। পরে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। অস্ত্র মামলায় চারদিন ও মাদক মামলায় তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম আকন্দ আবেদনে উল্লেখ করেন, ‘মামলার এজাহারনামীয় পলাতক আসামি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গুলশান থানার অস্ত্র মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তাকে মতিঝিল থানার ৩১ (৯) ১৯ মামলায় সাতদিনের রিমান্ড আবেদনপূর্বক জানাইতেছি যে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে তার গুলশান বাসা তল্লাশি করে অস্ত্র, মাদক ও বিপুল পরিমাণ দেশি/বিদেশি অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় তিনি জানান যে, মতিঝিলের ইস্টার্ন কমলাপুর কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলার ৪০২ নম্বর রুমে ভূঁইয়া গ্রুপ অব কোম্পানিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই ফ্ল্যাটে ব্যবসার আড়ালে মাদক ক্রয়-বিক্রয় ও সেবন করা হতো। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সাক্ষীদের সম্মুখে তার অফিসের বিভিন্ন কক্ষ তল্লাশি চালান। তল্লাশিকালে তার অফিস থেকে ১৯০ পিস হালকা গোলাপি রঙের ইয়াবা, দেশি ও বিদেশি বিয়ার, সিসা, গাঁজা উদ্ধার করা হয়।’

‘মামলার প্রাথমিক তদন্তে জানা যায় যে, আসামির দখলে আরও বিপুল পরিমাণ সিসা, বিদেশি বিয়ার ও ইয়াবা ট্যাবলেট মজুত আছ। তাকে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও বিপুল পরিমাণ সিসা, বিদেশি বিয়ার ও ইয়াবা ট্যাবলেট এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহসহ গ্রেফতার এবং উদ্ধারকৃত মাদকের উৎস সম্পর্কে তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে। এমতাবস্থায় মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে গুলশান থানার অস্ত্র আইনের মামলা হতে মতিঝিল থানায় করা মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সাতদিনের পুলিশ রিমান্ড একান্ত প্রয়োজন।’

গত ১৯ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় দায়ের করা অস্ত্র ও মাদকের পৃথক দুই মামলায় সাতদিনের রিমান্ডে যুবলীগ নেতা খালেদ হোসেন ভূঁইয়াকে নেয়া হয়। অস্ত্র মামলায় চারদিন এবং মাদক মামলায় তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

ওইদিন রাতেই তাকে আদালতে তুলে অস্ত্র ও মাদকের পৃথক দুই মামলায় সাতদিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। অন্যদিকে খালেদের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন।

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে অস্ত্র মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদা চারদিন এবং মাদক মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওই সময় জানান, তার এ রিমান্ড পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে। অর্থাৎ ওই দুই মামলায় খালেদকে মোট সাতদিন জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।

গুলশান থানা সূত্রে জানা গেছে, খালেদের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র ও মানি লন্ডারিং আইনে তিনটি মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে গুলশান থানায় মামলাগুলো করা হয়।

গত বুধবার সন্ধ্যায় গুলশান-২ এর নিজ বাসা থেকে খালেদ মাহমুদকে আটক করা হয়। র‌্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম জাগো নিউজকে বলেন, আটক খালেদকে র‌্যাব-৩ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে দুই থানায় চার মামলা দায়ের করা হয়।

তিনি সে সময় বলেন, ক্যাসিনো ও মাদক ব্যবসা নিয়ে আটক খালেদকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে গুলশান থানায় ও মাদক আইনে মতিঝিল থানায় পৃথক দুটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। র‌্যাব বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে এ দুটি মামলা করবে বলেও জানান তিনি।

বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে অস্ত্রসহ আটক করে র‌্যাব। আটকের পর তাকে র‌্যাব-৩ এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

গ্রেফতারের সময় খালেদের বাসা থেকে ৪০০ পিস ইয়াবা, লকার থেকে ১০০০, ৫০০ ও ৫০ টাকার বেশ কয়েকটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়। সেগুলো গণনার পর ১০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পাওয়া যায়। এছাড়া ডলারেরও বান্ডিল পাওয়া যায়। টাকায় তা ৫-৬ লাখ টাকা হবে বলে জানায় র‍্যাব। এছাড়া তার কাছ থেকে মোট তিনটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। যার একটি লাইসেন্সবিহীন, অপর দুটি লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে রাখা হয়েছিল।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রাতভর জিজ্ঞাসাবাদে মতিঝিলের ক্যাসিনো পরিচালনার বিষয়টি মতিঝিল থানা পুলিশ, মতিঝিল জোন, পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সদর দফতরের কর্মকর্তারা জানতেন বলে দাবি করেন খালেদ। তবে পুলিশের সঙ্গে ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য কোনো আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেননি তিনি।

সূত্র জানায়, খালেদের ক্যাসিনোর বিষয়ে পুলিশ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সংস্থা এবং রাজনীতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জানতেন। তাদের ‘ম্যানেজ করে’ ক্যাসিনো চালাতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন তিনি। পরে তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

জেএ/এমএআর/জেআইএম

টাইমলাইন