৯০’র বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সেই পাস এবার বের হবে মেসির পা থেকে?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১২:৩৪ এএম, ১১ জুলাই ২০২১

ফুটবল এখনে অনেক বেশি গাণিতিক। ৭০, ৮০ ও ৯০ দশকের তুলনায় ব্যক্তিগত মুন্সিয়ানা, দক্ষতা, নৈপুণ্য এখন আর সেভাবে ‘ম্যাটার’ করে না। ছক, কৌশল, লক্ষ্য-পরিকল্পনায়ও এসেছে নতুনত্ব। সেই চিরায়ত ধারা মেনে যতটা সম্ভব বেশি সময় বল নিজেদের পায়ে বা আয়ত্বে রাখতেই হবে।

একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত রাখা তথা এক তাল, লয়, গতি ও ছন্দে খেলাটাই এখন আর নেই। নিজ দলের ফরমেশন, ছক, লক্ষ্য-পরিকল্পনাই এখন আর শেষ কথা নয়। প্রতিপক্ষর ফরমেশন দেখে তাৎক্ষণিকভাবে কৌশল নির্ধারণ, ম্যাচের মেজাজ, গতি ও প্রকৃতি ঠাউরে কৌশল বদলে কখনো একটু রক্ষণাত্মক আর আবার কোন সময় কাউন্টার অ্যাটাকে গোল আদায় এখন বড় ও মোক্ষম কৌশল। পাশাপাশি সেট পিস বা ডেড বল থেকে বাঁকানো ফ্রি-কিকে গোল আদায়ও হয় অনেক বেশি এখন।

তারপরও বিশ্বফুটবল থেকে ব্যক্তি নির্ভরতা নিঃশ্বেষ হয়ে যায়নি। এখনো লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর নেইমারের মত বিশ্ব তারকারা ম্যাচ ভাগ্য গড়ে দেন। গোলের উৎস রচনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সময়ে গোল করে দল জেতান।

আর তাই এবারের কোপা আমেরিকা কাপে মেসি নির্ভর আর্জেন্টিনা আর নেইমার কেন্দ্রিক ব্রাজিল।

messi-maradona

বড় বড় ফুটবল বোদ্ধা, বিশেষজ্ঞও কোপা আমেরিকার ফাইনাল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মেসি আর নেইমারের কথাই বলছেন। অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হচ্ছে। কোন দলে নামি-দামি ফুটবলার বেশি, কোন দল ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ও দক্ষতায় এগিয়ে, কোন পক্ষের কোচ অনেক বেশি কৌশলি, তিতে না স্কালোনি?

সব কথা বলে, তাবৎ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পর সবার চোখ মেসি আর নেইমারের দিকে। মুখেও ঘুরেফিরে মেসি আর নেইমারের নাম। মোটকথা রোববার ভোরে কোপা আমেরিকা কাপের ফাইনালেও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে দু’দলের গঠন শৈলি, ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, তারকা খ্যাতি, নাম-ডাক তথা আন্তর্জাতিক পরিচয় ছাপিয়ে বারবার উঠে আসছে নেইমার আর মেসির নামই।

এমনিতেই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার ম্যাচ উত্তেজনার পারদ ছড়ায়। লাতিন আমেরিকান ফুটবলের দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। তারওপর রোববার ভোরে কোপার ফাইনাল। সব মিলে সর্বোচ্চ উত্তেজনা।

messi

বিশ্বের সব বড় ও নামি বিশেষজ্ঞরা সবদিক হিসেব করেই ব্রাজিলকে এগিয়ে রাখছেন। বলা হচ্ছে বিশ্ব ক্লাব ফুটবলের শীর্ষ স্থানীয় ক্লাব জুভেন্টাস, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, চেলসি, রিয়াল মাদ্রিদ, পিএসজির সব নামি ও দামি ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডারে সাজানো ব্রাজিল রক্ষণব্যুহ, মাঝমাঠ এবং আক্রমণভাগ তুলনামূলক অনেক সমৃদ্ধ।

দলটিতে নেইমার ছাড়াও, মাঝমাঠে ক্যাসেমিরো অনেক বড় নির্ভরতা। রিয়াল মাদ্রিদের এ মিডফিল্ডারের সৃজনশীলতা আছে বেশ। সঙ্গে অ্যাটাকিং মিডিফিল্ডার লুকাস পাকুয়েতাও (অলিম্পিক লিওঁ) বেশ দক্ষ। বল বানানো আর গোল করা দুই ক্ষেত্রেই পাকুয়েতাও রেখেছেন যথেষ্ট কার্যকরিতার ছাপ। কোয়ার্টারফাইনাল ও সেমিতে গোল করেছেন অলিম্পিক লিওঁর এ স্কিল্ড প্লেয়ার। এছাড়া সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ডেভিড সিলভার সঙ্গে রাইট ব্যাক মার্কুইনহোস এবং লেফট ব্যাক দানিলোও ব্রাজিল রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরি।

বিপরিতে আর্জেন্টিনা মূলতঃ ‘ওয়ান ম্যান শো’- মেসিই আসলে চালিকাশক্তি। সাথে আক্রমণভাগে লওতারো মার্টিনেজ (ইন্টারমিলান) আর ডি মারিয়াও (পিএসজি) আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া সেমির যুদ্ধে কলম্বিয়ার তিন তিনটি পেনাল্টি শ্যুট আটকে দেয়া গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজও ফাইনালে আর্জেন্টিনার বড় আস্থার জায়গা।

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময় ও নিকট অতীতে ব্রাজিলের ছন্দময় ও গতিনির্ভর ফুটবলের সাথে কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি মেসি নির্ভর আর্জেন্টিনার। কোপায় শেষ লড়াইয়ে (২০১৯ সালের সেমিফাইনালে) ব্রাজিলের সাথে পারেনি মেসির দল। আর্জেন্টিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল ব্রাজিল।

argentina

তারপরও হলুদ আর আকাশী-সাদার লড়াইয়ে কাগজে কলমের হিসেব মেলানো কঠিন। এ ম্যাচের আগে কেন যেন আমার ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার ১৯৯০ বিশ্বকাপ ম্যাচের কথাই মনে হচ্ছে বেশি।

খেলাটি ছিল দ্বিতীয় পর্বের। মানে সেরা ষোলোর। ব্রাজিল সেবারও ছিল হট ফেবারিট। ফেবারিটের তকমা নিয়ে মাঠে নেমে গ্রুপ পর্বে সব ম্যাচ জিতে উঠে আসে দ্বিতীয় পর্বে। অন্যদিকে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা শীর্ষ ১৬-তে পা রাখে অনেক কষ্টে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ক্যামেরুনের মত দূর্বল দলের কাছে রজার মিলার অসামান্য নৈপুণ্যে হার মানা আর রোমানিয়ার সাথে ড্র করা ম্যারডোনার দল দ্বিতীয় পর্বে উঠে আসে রাশিয়ার সাথে একমাত্র জয় নিয়ে।

কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে একঝাঁক মেধাবি ফুটবলারে গড়া ফেবারিট ব্রাজিলকে অপ্রত্যাশিতভাবে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায় আর্জেন্টিনা। তারপর গোলকিপার গায়কোচিয়ার অসামান্য গোলকিপিং আর পেনাল্টি শ্যুট-আউটে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে দুটি এবং সেমির যুদ্ধে ইতালির বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি আটকে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলেন গোলকিপার সার্গেই গায়কোচিয়া।

এবার কলম্বিয়ার সাথে সেমিফাইনালে সেই গায়কোচিয়ার ভূমিকায় বর্তমান আর্জেন্টাইন গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। সেমিফাইনালে ট্রাইব্রেকারে তিন তিনটি পেনাল্টি কিক আটকে দলকে ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।

Messi

এখন ফাইনালে কী হবে? ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে ক্লাব ফুটবলে অগণিত গোলের উৎস রচনার পাশাপাশি প্রচুর গোল করে গন্ডায় গন্ডায় ট্রফি জিতেছেন মেসি। কিন্তু হায়! মহাদেশীয় ও বিশ্ব আসরে ট্রফি নেই সময়ের সেরা সৃজন-সৃষ্টিশীল এ নান্দনিক ফুটবল শিল্পীর। তবে কী ট্রফি ছাড়াই শেষ হবে মেসির ক্যারিয়ার?

এ কথা ভাবলেই কেন যেন আমার ৯০’র ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ম্যাচের কথা মনে পড়ে যায়। মাঠের লড়াই শুরুর আগে সব হিসেব নিকেশ আর বাজি ছিল ব্রাজিলের পক্ষে। তার ৮ বছর আগে ১৯৮২ সালে স্পেনের মাটিতে বিশ্বকাপ ম্যাচে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে ৩-১ গোলে হারিয়েছিল জিকা, ফ্যালকাও, সক্রেটিস আর জুনিয়রের ব্রাজিল।

শুধু চির প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে হার মানাই নয়, ব্রাজিলের সাথে ওই ম্যাচে লাল কার্ড পেয়ে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন ম্যারাডোনা। একটি উড়ে আসা বলে পা চালাতে গিয়ে ব্রাজিলের এক ফুটবলারের গায়ে লাথি মেরে বসেন ২১ বছরের ম্যারাডোনো। রেফারি তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন।

৯০ সালে মধুর প্রতিশোধ নেয় আর্জেন্টিনা । ৮ বছর পর সেই ম্যারাডোনা প্রতিশোধ তুলে নিলেন। ৯০ সালের সেই ম্যাচের ৮১ মিনিটে তার বাড়ানো নিপুণ পাস ধরে গোল করে আর্জেন্টিনাকে জেতান ক্যানিজিয়া।

ব্রাজিল সীমানার ভিতরে একটু জটলার ভিতরে বল পান ম্যারাডোনা। ব্রাজিলের মাঝমাঠের দুই কুশলী ফুটবলার অ্যালেমাও আর দুঙ্গা চাচ্ছিলেন ম্যারাডোনাকে ফাউল করে হলেও প্রতিরোধ করতে।

কিন্তু ম্যারাডোনার প্রচন্ড গতি, শরীরের ঝাঁকুনি (বডি ডজ) আর পায়ের কারুকাজের কাছে হার মানে তাদের সব চেষ্টা। এরপর বক্সের ১৫ গজ বাইরে থাকা অবস্থায় ব্রাজিল ডিফেন্ডাররা ভেবেছিলেন ম্যারাডোনা বুঝি নিজে গোল করার চেষ্টা নেবেন।

কিন্তু তাদের ধারনা ভুল করে ম্যারাডোনা ডান পায়ে আড়াআড়ি বল বাড়িয়ে দেন বাঁ-দিক থেকে ধেয়ে আসা ক্যানিজিয়াকে। ম্যারাডোনা যখন ক্যানিজিয়ার উদ্দেশ্যে বল বাড়ান, তখন ব্রাজিলের সেন্টার ডিফেন্ডারের ঠিক দু’পায়ের ফাঁক গলে বল চলে যায় ক্যানিজিয়ার কাছে।

messi

আগুয়ান ব্রাজিল গোলরক্ষক তাফারেলকে এক ঝটকায় পিছনে ফেলেন ক্যানেজিয়া। পায়ের ছোট্ট টোকায় বল ঠেলে দেন বাঁ-দিকে। তাফারেলকে অতিক্রম করে ফাঁকা পোস্টে বল জালে পাঠান ক্যানিজিয়। ভেঙ্গে যায় ব্রাজিলের স্বপ্ন। ওই এক গোলেই সেরা আটে পৌঁছে যায় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা।

আগের খেলাগুলোয় প্রতিপক্ষের রাফ ও টাফ ট্যাকলের শিকার ম্যারডোনা স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেননি। পুরো খেলায় ফুটবল জাদুকর যে খুব স্বপ্রতিভ ছিলেন, তাও নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একাই ব্রাজিলের মধ্য মাঠ ও রক্ষণভাগ চিরে উৎস রচে ম্যাচ ভাগ্য গড়ে দেন।

মেসিরও কিন্তু সেই সৃজনশীলতা, সৃষ্টি শীলতা আছে। ৩১ বছর আগে তাই পূর্বসুরী ফুটবলের রাজপূত্র ম্যারাডোনা যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, কে জানে রোববার কোপার ফাইনালে মেসির পা থেকেই না এমন শত কোটি টাকা মূল্যের পাস বেরিয়ে আসে। তা থেকে লওতারো মার্টিনেজ, ডি মারিয়া, ডি পলদের যে কেউ একজন গোল করে জিতিয়ে দিতে পারেন আর্জেন্টিনাকে।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]