ব্যালন ডি’অর এবং বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্যরকম গল্প

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০২:৪০ পিএম, ১৬ ডিসেম্বর ২০২২

আচ্ছা বিশ্ব কাপ কি? খালি চোখে ফুটবলের সর্ববৃহৎ আসর। বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব যাচাইয়ের আসর। এ ফুটবল মহাযজ্ঞের বিজয়ী পরের চার বছরের জন্য হয়ে যায় বিশ্ব ফুটবলের রাজা। এক নম্বর।

শুধু কি তাই? না, বিশ্বকাপের আরও পরিচয় আছে?

হ্যাঁ আছে। ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন, বিশ্বকাপ হলো নায়ক থেকে মহানায়ক হওয়ার ক্ষেত্র। স্টারের ‘সুপার স্টার’ বনে যাবার সেরা প্লাটফর্ম। সবার চোখে পড়ার ও মন কেড়ে নেয়ার আদর্শ ভূমি। আবার বিশ্বকাপ নায়ক থেকে খলনায়ক হওয়ারও মঞ্চ।

এ আসরে সাফল্য মানেই অমর হয়ে যাওয়া। আগে যত যশ, খ্যাতি, সুনাম-সুখ্যাতি, নাম ডাক ও তারকা ইমেজই থাকুক না কেন, বিশ্বকাপের মাঠে ব্যর্থ হওয়ার অর্থ খলনায়ক বনে যাওয়া।

কত তারকা, বিশ্বকাপে এসে ব্যর্থতার ঘানি টেনে হয়েছেন ‘সুপার ফ্লপ মাস্টার।’ আশির দশকে যাদের বৃহস্পতি ছিল তুঙ্গে, সেই ‘সাদা পেলে’ জিকো আর সক্রেটিসও ৮৬’র বিশ্বকাপে তারকার তকমা গায়ে খেলতে এসে ফিরে গিয়েছিলেন ব্যর্থ হয়ে। একই আসরে আর্জেন্টিনাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করে মহানায়ক বনে গেছেন ম্যারাডোনা।

একইভাবে ৯৮’র বিশ্বকাপ বিজয়ী ফ্রান্সের সাফল্যের রূপকার, স্থপতি জিনেদিন জিদানও পেয়েছেন বিশ্ব সেরা তারকার মর্যাদা।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর নেইমারকে নিয়ে সারা বছর অনেক হই চই হয়। আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবলে ব্রাজিলিয়ান নেইমার আর পর্তুগিজ রোনালদোর অনেক নাম ডাক। ঈর্ষনীয় সাফল্য; কিন্তু তারা কেউই বিশ্বকাপ স্পর্শ করতে পারেননি। তাই মহানায়ক হওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের দুজনার কেউ ফুটবলে অমরত্ব লাভ করতে পারছেন না।

সেই অমরত্বের হাতছানি এখন লিওনেল মেসির সামনে। এমনিতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মেসির সাফল্য আকাশছোঁয়া। সর্বোচ্চ সাতবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ফুটবলার মেসি। ক্লাব পর্যায়ে গত একযুগে সর্বাধিক সাফল্য পেয়েছেন মেসির ক্লাব। কিন্তু আগের ৪ বার বিশ্বকাপ খেলে একবারের জন্যও আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারেননি মেসি।

অথচ বিশ্ব ফুটবলে ব্যালন ডি’অর বথা বর্ষসেরা পারফরমারের পুরস্কার মেসিই জিতেছেন সবচেয়ে বেশি। তারপরে দ্বিতীয় সর্বাধিক ৫ বার ব্যালন ডি’অর জয় করেছেন পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এছাড়া নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান ক্রুয়েফ, মার্কো ফন বাস্তেন আর ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনি ৩ বার করে ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ।

ইতিহাস সাক্ষী সেই ৭০-এর বিশ্বকাপ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বেশিরভাগ ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ফুটবলারের দল বিশ্বকাপ জেতেনি। ৭০-এ ব্যালন ডি’অর পেয়েছিলেন জার্মান স্ট্রাইকার গার্ড মুলার (বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে)। অথচ সেবার বিশ্বকাপ জিতেছিল পেলের ব্রাজিল। মহা তারকা বনে গেছিলেন ফুটবল সম্রাট পেলে। ৭৪-এর ব্যালন ডি’অর ছিল ডাচ সুপারস্টার ইয়োহান ক্রুয়েফের (বার্সেলোনা); কিন্তু শেষ হাসি হেসেছিল জার্মানি ।

একইভাবে ১৯৭৮ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সোনার বুট পেয়েছিলেন তখনকার আর্জেন্টাইন তারকা মারিও ক্যাম্পেস । কিন্তু সেবার ব্যালন ডি’অর খেতাব ছিল ইংলিশ তারকা কেভি কিগানের।

তবে ১৯৮২ সালে ঠিক ব্যালন ডি’অর পাওয়া পাওলো রোসির ইতালিই হাসে শেষ হাসি। পরের বার মানে ৮৬’তে দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরি নৈপুণ্যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা; কিন্তু সেবার কোন আর্জেন্টাইন পাননি ব্যালন ডি’অর। সেটা পেয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইগর বেলানভ।

৯০-তে হিসেবটা মিলে গিয়েছিল । এরপর থেকে একটি নতুন ধারা তৈরি হয়। আবার ব্যালন ডি’অর পাওয়া ফুটবলারের দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে শুরু করে। সে ধারার সূত্রপাত ঘটে ১৯৯০ সালে ব্যালন ডি’অর পাওয়া লোথার ম্যাথাউসের দল জার্মানির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে। তারপর থেকে গত ৩২ বছরে হওয়া ৭ আসরে ৩ বার ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ফুটবলারের দল হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

বছর গুলো হলো ১৯৯৮ (জিনেদিন জিদান, এ ফরাসি প্লে মেকারই ছিলেন ৯৮’র ব্যালন ডি’অর), ২০০২ (ব্যালন ডি’অর ব্রাজিলের রোনালদো) ও ২০০৬ (ইতালির ফ্যাবিও ক্যানাভারো)।

এছাড়া ১৯৯৪ (ব্যালন ডি’অর বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টয়েচকভ), ২০১০ (লিওনেল মেসি), ২০১৪ (ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো) আর ২০১৮ সাল ( ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ) ব্যালন ডি আর পাওয়া সেরা ফুটবলারের দেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।

ওপরের ইতিহাস জানান দিচ্ছে সেই ১৯৯০’র ইতালি বিশ্বকাপ থেকে ২০১৮’র রাশিয়া বিশ্বকাপ পর্যন্ত যে ৮ টি আসর বসেছে, তার ৪ টিতে ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ফুটবলারের দেশ হয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। আর সমান চার আসরে ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ফুটবলারের দেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।

এবার যিনি ব্যালন ডি’অর বিজয়ী, সেই ফুটবলার হলেন করিম বেনজেমা। কিন্তু ইনজুরির কারণে ফ্রান্সের এ স্ট্রাইকারের এবার বিশ্বকাপে মাঠে নামা হয়নি; কিন্তু তবু তিনি ফরাসী রেজিস্টার্ড প্লেয়ার। এখন দেখার বিষয়, এবার কার দল হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন- ব্যালন ডি’অর বিজয়ী করিম বেনজামার ফ্রান্স, নাকি ২০২১ সালে ব্যালন ডি’অর বিজয়ী মেসির আর্জেন্টিনা?

এআরবি/আইএইচএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।