‘মোহামেডানকে প্রথম শিরোপা যেভাবে জিতিয়েছিলেন সাজু ভাই’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:১৪ পিএম, ১১ জুন ২০২২

ফুটবলে শিরোপা পেতে অপেক্ষায় থাকতে হয়নি তেমন। যেহেতু ১৯৭২ সালে লিগ মাঝপথে পরিত্যক্ত হয়, তাই ১৯৭৩ সাল দিয়ে শুরু হয় ঢাকাই ফুটবলের পূর্ণাঙ্গ লিগ। সেই শিরোপা জেতে বিআইডিসি (পরবর্তীতে বিজেএমসজি) আর ১৯৭৫ সালে তৃতীয় আসরেই লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা মোহামেডান।

কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্রিকেটে সাদাকালোদের শুরুটা ভাল ছিল না। লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে চার-চারটি বছর। স্বাধীনতার আগে সেই ৫০-এর দশকে শেষবার ঢাকা লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়া মোহামেডান স্বাধীনতার পর প্রথম লিগ ট্রফি ঘরে তোলে ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে।

এএসএম ফারুকের নেতৃত্বে মোহামেডান লিগ বিজয়ী হয় সেবার এবং আসল সত্য হলো, সেবারই মোহামেডান কাগজে-কলমে বেশ সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দল গড়েছিল। এর আগের তিন মৌসুম মোহামেডান ছিল মাঝারী মানের দল। আবাহনী, ভিক্টোরিয়া ও আজাদ বয়েজের পিছনের সারির দল।

১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে মোহামেডান নতুনভাবে দল সাজায়। দেশের ক্রিকেটের সব সময়ের অন্যতম বড় তারকা রকিবুল হাসানসহ বেশ কয়েকজন নামী ও তুখোড় ক্রিকেটার সে বছরই মোহামেডানের হয়ে প্রথম খেলতে আসেন।

আজ ১১ জুন শনিবার বিকেলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন মাহমুদুল হাসান সাজু। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে সেবারই মোহামেডানের হয়ে প্রথম খেলতে এসেছিলেন এই সাজু। এবং ইতিহাস জানাচ্ছে সেবার মোহামেডানকে লিগ চ্যাম্পিয়ন করানোর অন্যতম রূপকার এবং স্থপতিও ছিলেন সদ্য প্রয়াত এ মিডিয়াম পেসার কাম হার্ডহিটার ব্যাটার।

সাজুর সমসাময়িক ক্রিকেটার ও ওই বছরই মোহামেডানে প্রথম আসা রকিবুল হাসান এবং ওয়াহিদুল গনি আজ জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে প্রয়াত ক্রিকেটার মাহমুদুল হাসান সাজুর স্মৃতিচারণ করেছেন।

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও টপ অর্ডার উইলোবাজ রকিবুল হাসান বলেন, ‘সাজু আর আমরা ছিলাম মোহামেডানের প্রথম লিগ বিজয়ী দলের সদস্য। এখনো স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে নানা স্মৃতি। ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমের কথা। আমি ভিক্টোরিয়া থেকে, ইয়াং পেগাসাস থেকে সাজু এবং ওয়ান্ডারার্স থেকে ওয়াহিদুল গনি সেবার মোহামেডানে প্রথম খেলতে আসি। এসেই প্রয়াত ফারুক ভাই (এএসএম ফরুক) এর নেতৃত্বে আমরা লিগ বিজয়ী হয়েছিলাম।’

বলে রাখা ভালো, মোহামেডানের সেই দলের বাকি সদস্যরা হলেন আহমেদ ইকবাল বাচ্চু, মঞ্জুর আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান সেলিম, মাইনুল হক মাইনু, শফিকুল হক হীরা, শহিদুর রহমান চৌধুরী শান্টু, দৌলতুজ্জামান আর ওয়াহিদুল গনি।

পেস বোলার কাম হার্ডহিটার মাহমুদুল হাসান সাজুকে জেনুইন ম্যাচ উইনার আখ্যা দিয়ে ওয়াহিদুল গনি বলেন, ‘মোহামেডানের প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মিশনে সাজু ভাইয়ের অবদান ছিল প্রচুর।’

মোহামেডান তথা জাতীয় দলের লেগস্পিনার ওয়াহিদুল গনি আরও জানান, ‘এখনো পরিষ্কার মনে আছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে লিগ চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণী ম্যাচে চির প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর বিপক্ষে মোহামেডানের জয়ের অন্যতম রূপকারই ছিলেন সাজু ভাই। তার ক্ষুরধার বোলিংয়েই আমরা (মোহামেডান) শেষ হাসি হাসতে পেরেছিলাম। খেলার শেষ দিকে আবাহনীর মিডল অর্ডার রিজভী ভাই ম্যাচ ধরে ফেলেছিলেন। প্রায় একাই আমাদের হারিয়ে দিচ্ছিলেন। আর শেষ দিকে তাকে আউট করে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন সাজু ভাই।’

আবাহনীর হয়ে প্রাণপন লড়াই করা রিজভীকে সাজঘরে ফেরানোর দৃশ্যটি এখনো ওয়াহিদুল গনির স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে। সেই স্মৃতি হাতড়ে ওয়াহিদ বলেন, ‘এক পর্যায়ে সাজু ভাই বোলিংয়ে এসে আমাকে মিড অন থেকে পিছনে যেতে বলেন। আমি মিড অন থেকে বেশ কয়েক গজ পিছনে চলে গেলাম। রিজভী ভাইর উঁচু করে নেয়া শট আকাশে উঠলো। আমি কয়েক পা সামনে দৌড়ে তার ক্যাচ ধরে ফেললাম। সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচও মোহামেডানের হাতেই ধরা দিল। সাজু ভাইয়ের মুখ ও ঠোটে তখন সৃষ্টি সুখের উল্লাস।’

প্রয়াত সাজুকে একজন সত্যিকার ম্যাচ উইনার আখ্যা দিয়ে ওয়াহিদুল গনি বলেন, ‘সাজু ভাই ছিলেন তুখোড় মিডিয়াম পেসার। বল করতেন বেশ জোরে। সুইং ছিল দারুন। তার আউট সুইং খেলা কঠিন ছিল। আর নিচের দিকে ব্যাটার সাজু ভাই ছিলেন আমাদের মোহামেডানের অনেক বড় আস্থা ও নির্ভরতা। প্রয়েজনের সময় অনেকবারই জ্বলে উঠেছে তার ব্যাট। প্রচন্ড জোরে মারতে পারতেন।’

‘হোক তা স্পিন কিংবা পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে, ক্রস ব্যাটে নয় সোজা ব্যাটেই ইয়া বড় বড় ছক্কা হাঁকাতে পারতেন সাজু ভাই। তার বোলিংটা ছিল তখনকার মোহামেডানের অন্যতম বড় শক্তি। আর নিচের দিকে অনেক ম্যাচে প্রয়োজনের সময় জ্বলে উঠে আমাদের আস্থার প্রতীকও হয়ে উঠেছিলেন সাজু ভাই।’

মানুষ সাজুকে চমৎকার, বিনয়ী ও নিপাট ভদ্রলোক বলে অভিহিত করে ওয়াহিদ বলেন, ‘ক্রিকেটার সাজু ভাই মানুষ হিসেবেও ছিলেন খুব ভাল। ছোটদের খুব স্নেহ করতেন। ভালবাসতেন।’

এক ক্লাবের মানুষ নন, তবে ক্রিকেটার সাজুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি। দেশের ক্রিকেটের এ নামী ব্যক্তিত্ব মাহমুদুল হাসান সাজুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাগো নিউজকে একটি কথাই বলেন, ‘১৯৭৭-১৯৭৮ লিগ শিরোপা নির্ধারনী ম্যাচে আমরা (আবাহনী) চির প্রতিদ্ব্ন্দ্বী মোহামেডানের কাছে হেরেছিলাম মূলতঃ সাজু ভাইয়ের অনবদ্য ব্যাটিং ও বোলিং পারফরমেন্সে। বলতে পারেন সাজু ভাই সেদিন একাই হারিয়ে দিয়েছিলেন আবাহনীকে।’

ব্যক্তি জীবনে সরকারি আমলা (সচিব) মাহমুদুল হাসান একদম আশির দশকের শুরুতে খেলা ছেড়ে চাকুরিতে মনোনিবেশ করেন। সেভাবে আর কখনো ক্রিকেটের সঙ্গে জড়াননি। তবে কয়েক বছর আগেও মোহামেডানের খেলা দেখতে মাঠে আসতেন; কিন্তু ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার পর আর তাও আসা সম্ভব হয়নি।

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার মহান স্বাধীনতা দিবসের দিন হওয়া প্রীতি ক্রিকেটে অতিথি হিসেবে আসার কথা ছিল সাজুর; কিন্তু শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ায় আর আসতে পারেননি।’

এআরবি/আইএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।