ঢাকাই ক্রিকেটের জীবন্ত ইতিহাস ‘গার্নার’ ওয়াসিম খান

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:১৫ পিএম, ৩০ জুন ২০২২

বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেট অনুরাগিদের বড় অংশ তাকে চেনে ক্রিকেটের মানুষ হিসেবে। যাকে প্রায়ই বিমান বন্দরে দেখা যায়। ভদ্রলোক বিমান বন্দরে ক্রিকেটার, কর্মকর্তা, সংগঠক, প্রশিক্ষক সবাইকে স্বাগত কিংবা বিদায় জানানোর কাজ করেন। এর বাইরে যারা নিয়মিত টিভি দেখেন। তারাও তাকে চেনেন। টিভি নাটকে অভিনয় করেন। আবার সম্প্রতি একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। সেই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এবারের ঈদে দুটি নাটকও সম্প্রচার হবে।

বলা হচ্ছে ওয়াসিম খানের কথা। তার সাফল্যের মুকুট অনেক বড়। ৩টি লিগ এবং ৮ বছর পর আবারো নারী ক্রিকেটের শিরোপা বিজয়ী মোহামেডানের ম্যানেজার ছিলেন ওয়াসিম খান। বর্তমান প্রজন্ম তাকে যেভাবেই চিনকু না কেন, ঢাকার ক্লাব ক্রীড়াঙ্গনে ওয়াসিম খান খুবই পরিচিত মুখ।

৪০ বছরের বেশি সময় ঢাকার ক্রীড়াঙ্গনে বিচরণ তার। সেই আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে মোহামেডানের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। এরপর ক্রিকেট বোর্ড, হকি, হ্যান্ডবলের সঙ্গে সমানভাবে সম্পৃক্ত ওয়াসিম খান।

মোহামেডানের ক্রিকেট ম্যানেজারই শুধু নন, হকি ম্যানেজারের গুরু দায়িত্বও পালন করেছেন। ৯০-এর শুরুর দিকে হকির জাদুকর শাহবাজ আহমেদ, তাহির জামান, কামরান আশরাফ আর মোহাম্মদ আলমের মত বিশ্ব তারকাদের অংশগ্রহণে মোহামেডান যখন তিনবার টানা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন দু’বারের ম্যানেজার ছিলেন ওয়াসিম খান।

Washim Khan

তবে ঢাকার ক্লাব ক্রীড়াঙ্গনে তার প্রতিষ্ঠা মূলতঃ ঢাকা মোহামেডানের ক্রিকেট ম্যানেজার হিসেবে। ক্রিকেটে মোহামেডানের সাফল্যের সূর্য্য যখন মধ্য গগনে, তখন মোহামেডানের ম্যানেজার ওয়াসিম খান।

শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গা, ১৯৮৭‘র বিশ্বকাপ খেলা রুমেশ রত্নায়েকে, কপিল দেবের পর ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত সিম বোলিং অলরাউন্ডার মনোজ প্রভাকর এবং বলের আঘাতে মাথার ইনজুরিতে অকাল প্রয়াত ভারতের নামী ব্যাটার রমন লাম্বাসহ অগণিত নামী ও তারকা ক্রিকেটার বাংলাদেশে প্রথম খেলতে এসেছেন ওয়াসিম খানের হাত ধরে।

ঢাকার আরেকটি প্রতিষ্ঠিত ক্লাব ব্রাদার্স ইউনিয়ন তৃতীয়সারির দল থেকে ক্রিকেটের বড় দল হয়েছিল, তারকায় ঠাসা হয়ে লিগ বিজয়ী হয়েছিল এই ওয়াসিম খানের সাজানো দল নিয়েই।

সেই ১৯৮৫-৮৬ থেকে ৯০ দশকের মাঝামাঝি প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ঢাকার ক্রিকেটের অন্যতম সফল ম্যানেজার হিসেবে পরিগণিত হতেন ওয়াসিম। শেষ পর্যন্ত মাঠের বাইরের নেপথ্য কারিগর হিসেবে দল সাজানোর কাজটি দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করে অন্যরকম পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।

তবে শুরুতে তিনি ছিলেন ক্রিকেটার। প্রয়াত জাতীয় কোচ জালাল আহমেদ চৌধুরীর হাত ধরে চলে আসেন মোহামেডানে। মোহামেডান তখন তারকায় ঠাসা দল। দৌলতুজ্জামান, মাহমুদুল হাসান সাজু, শহিদুর রহমান চৌধুরী শান্টু, মোহন প্রমুখ পেসার তখন মোহামেডানে।

Washim Khan

ছয় ফুট দেড় ইঞ্চির মত উচ্চতা। বলও করতে পারেন বেশ জোরে। সহযোগীরা এ কারণে সে সময়ের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান গ্রেট জোয়েল গার্নারের সাথে মিল রেখে ওয়াসিম খানের নামকরণ করেন ‘গার্নার’।

ক্রিকেট পাড়ায় সবাই তাকে গার্নার নামেই ডাকতে শুরু করেন। ৮০ ও ৯০ দশকের ক্রিকেটার, কোচ, অফিসিয়াল ও স্পন্সর- সংশ্লিষ্ট সবার কাছে এখনো ওয়াসিম খানের আরেক নাম ‘গার্নার।’ এখনও অনেকেই তাকে গার্নার নামেই ডাকেন।

অথচ, গার্নার নামকরণেও একজন পেসার হিসেবে প্রতিষ্ঠা মেলেনি ওয়াসিম খানের। মিলবে কি করে? দীর্ঘকায় তরুণ ওয়াসিম খানের পক্ষে ঢাকা লিগে মোহামেডানের হয়ে নিয়মিত খেলারই সুযোগ মেলেনি। পরে ক্রিকেটার ওয়াসিম খান বনে যান ম্যানেজার ওয়াসিম খানে।

শুরু হয় নতুন পথে যাত্রা। ১৯৮৫-১৯৮৬ মৌসুমে ঢাকা লিগের অন্যতম কনিষ্ঠ ম্যানেজার হিসেবে অভিষেক হয় ওয়াসিম খানের। আবাহনীর আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববির পর মোহামেডান পায় দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম ম্যানেজার।

দায়িত্ব পেয়েই মোহামেডানে তারকার মেলা বসানোর উদ্যোগন নেন ওয়াসিম খান। এরপর টানা ৪-৫ মৌসুম ক্লাবটির সফল ম্যানেজার ছিলেন ওয়াসিম খান। সে সময় দেশের এক নম্বর তারকা মিনহাজুল আবেদিন নান্নু আবাহনী ছেড়ে অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যোগ দেন মোহামেডানে।

কিন্তু আশির দশকের একদম শেষ ভাগে গিয়ে হঠাৎই মোহামেডানের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরে ওয়াসিমে। মোহামেডান ছেড়ে ৯০ সালে ব্রাদার্সের ম্যানেজার হয়ে যান তিনি।

Washim Khan

তার সময়ে ১৯৮৭ বিশ্বকাপ খেলে রুমেশ রত্নায়েকে মোহামেডানে খেলতে এসেছিলেন। শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ বিজয়ী অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গা, ফাস্ট বোলার গ্রায়েম ল্যাব্রয় এবং অলরাউন্ডার কারনাইনও যখন আশির দশকের শেষভাগে খেলতে আসেন, তখন মোহামেডানের ম্যানেজার ওয়াসিম।

জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে এসব অনেক অজানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে শুরু থেকে দেখে আসা ওয়াসিম খান। জানান ৮৫-৮৬ মৌসুমে নান্নু মোহামেডানে আসেন তখনকার ৭০ হাজার টাকায়। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো ভাববে এত কম টাকায়? মূলত তখনকার প্রেক্ষাপটে এটাই ছিল বিরাট অংকের অর্থ।

ওই সময় গড়-পড়তা সেরা তারকারা পেতেন ৩০-৪০ হাজার টাকা করে। সেখানে আবাহনী থেকে মোহামেডানে যোগ দিয়ে নান্নু পেলেন ৭০ হাজার টাকা।

শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গা এবং পেসার ল্যাব্রয় ও পেস বোলিং অলরাউন্ডার কারনাইন কতা টাকায় কিভাবে মোহামেডানে এসেছিলেন? তা জানিয়ে ওয়াসিম খান বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে মাসিক বেতন হিসেবে চুক্তি করেছিলাম। রানাতুঙ্গার সঙ্গে মাসিক ১৮০০ ডলারে চুক্তি হয়েছিল। আর ফাস্ট বোলার ল্যাব্রয়ের মাসিক বেতন ছিল ১৬০০ ডলার। কারানইন পেয়েছিলেন ১২০০ ডলার করে।’

এরপর ১৯৮৭‘র বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার অলরাউন্ডার রুমেশ রত্নায়েকে আসেন মোহামেডানের হয়ে খেলতে। তাকে দেয়া হয়েছিল প্রতি ম্যাচে ২০০০ ডলার করে।

মাঝে ছেড়ে দিলেন মোহামেডান। সেখানেও এক বড় কাহিনী। নামি ভিনদেশি ক্রিকেটার আনার কথা থাকলেও মোহামেডান কর্মকর্তারা কোন বিদেশী ক্রিকেটার না আনায় ক্লাবটি তিন ম্যাচ হেরে লিগ থেকে পিছিয়ে পড়ে অনেক। ক্ষোভে-অভিমানে মোহামেডান ছেড়ে ব্রাদার্সে চলে যান ওয়াসিম।

ব্রাদার্সে গিয়েও বিপ্লব ঘটিয়ে ফেললেন। নোবেল, মাসুম, আতহার আলী, ফারুক, ইউসুফ বাবু, বাদশাহ, গোলাম ফারুক সুরু, হাবিবুল বাশার সুমন এবং আবাহনী থেকে টিএল ফার্নান্ডোকে নিয়ে রীতিমত হইচই ফেলে দেন।

আতহার আলী এবং শ্রীলঙ্কান টিএল ফার্নান্ডোকে দলে টানার গল্প বলতে গিয়ে ওয়াসিম খান জানান, ‘তখন কিন্তু এভাবে ক্রিকেটারদের উচ্চ মূল্য ছিল না। আগের বছর থেকে ১০ সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা বাড়িয়ে দিলেও বড় ও নামী ক্রিকেটার পাওয়া যেত। ওই সময়ে আমি আতহার আলীকে ২ লাখ টাকা অফার করে সুর্যতরুণ ক্লাব থেকে ব্রাদার্সে নিয়ে যাই।’

‘আকরাম আর জাহিদ রাজ্জাককে আবাহনী থেকে, ফারুক, প্রিন্স আর সুরুকে রুপালী ব্যাংক থেকে ব্রাদার্সে নিয়ে যাই। আমি ব্রাদার্সে যোগ দেয়ার দ্বিতীয় বছরেই তারা প্রথমবার ঢাকা লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়। একবার দামাল স্মৃতি টুর্নামেন্টে রানার্সআপ আরেকবার বিজয় দিবস টুর্নামেন্টও চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাদার্স।’

‘টানা প্রায় ৭-৮ বছরের বেশি আবাহনীতে খেলা লঙ্কান পেস বোলিং অলরাউন্ডার টিএল ফার্নান্ডো কলম্বো থেকে ঢাকা এসেছিল আবাহনীর হয়ে খেলার লক্ষ্যে। তাকে ঢাকা বিমান বন্দরে গাড়িতে উঠিয়ে এমন এক অফার করি, যাতে আর না করতে পারেনি। তাৎক্ষনিক ২ লাখ টাকা হাতে অগ্রীম দিয়ে চমকে দেই। অফার মেনেই সে বছর আবাহনী ছেড়ে ব্রাদার্সে নাম লেখায় ফার্নান্ডো।’

‘ভারতের পেস বোলিং অলররাউন্ডার মনোজ প্রভাকর আর রমন লাম্বাকে বাংলাদেশে প্রথম খেলতে নিয়ে আসি আমি। সেটা ব্রাদার্সের পক্ষে সম্ভবত ৯০-৯১ মৌসুমে। চট্টগ্রামের স্টার সামার ক্রিকেট তখন অনেক বড় ক্লাব ক্রিকেটের আসর। সেই আসরে তাদের দুজনকে প্রথম ব্রাদার্সের হয়ে খেলতে নিয়ে আসি।’

এভাবে কয়েক বছর ব্রাদার্সে কাটিয়ে আবার ঘরের ছেলের ঘরে ফিরে আসেন। ৯০ দশকের শেষ দিকে আবার সাদা-কালোর মোহামেডানে চলে আসেন ওয়াাসিম খান। এরপর থেকে এখনো তার ঠিকানা সেই মোহামেডান।

মোহামেডানের ক্রিকেট, হ্যান্ডবল করে করে আর নিজের জীবনের কথাও ভাবেননি। এখনো চিরকুমারই রয়ে গেছেন ওয়াসিম খান। অল্পে তুষ্ট ওয়াসিম বলেন, ‘আমার কোন অতৃপ্তি ও অপ্রাপ্তি নেই। আমি যেমন আছি, তাতেই খুশি। তবে ১৯৮৬ সালে মোহামেডানের সর্বকনিষ্ঠ কার্যনির্বাহী সদস্য হয়েছিলাম। সেটাই ছিল অনেক ভাললাগার, সুখের।’

এর বাইরে হ্যান্ডবলের সঙ্গেও ছিলেন ওতোপ্রোতভাবেক জড়িত। হ্যান্ডবল খেলেছেন। ফেডারেশনের সঙ্গে জড়িত একদম শুরু থেকে। তাই হ্যান্ডবল ফেডারেশন তাকে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্টও দিয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালে অনূর্ধ্ব-২৩ নারী ইমার্জিং ক্রিকেটে বাংলাদেশ নারী দলের ম্যানেজার হিসেবে শ্রীলঙ্কা গেছেন ওয়াসিম খান।

অত্যন্ত বনেদি আর স্বচ্ছল ঘরের ছেলে ওয়াসিম খান। মোহামেডান আর ব্রাদার্সের ক্রিকেট ম্যানেজার হিসেবে অন্তত ১০-১২ বছর দু হাতে টাকা খরচ করেছেন। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০-এর শুরু অবধি, তার হোন্ডা স্পোর্টস গাড়ি ছিল তারকা ও নামী ক্রিকেটারদের সবচেয়ে প্রিয় বাহন। এখনকার মত তখন সব তারকা ক্রিকেটারের গাড়ি ছিল না তখন।

মোহামেডান ও ব্রাদার্সে নাম লিখানো বেশিরভাগ ক্রিকেটারকে ওইসময় ওয়াসিম খানের স্পোর্টস কারে চড়েই ঘুরতে দেখা যেত।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]