‘নুসরাত কীভাবে পরীক্ষা দেয় আমি দেখে নেব’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফেনী
প্রকাশিত: ০৮:২৮ পিএম, ১৫ জুলাই ২০১৯

ফেনীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে।

সোমবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে তাদের সাক্ষগ্রহণ ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের জেরা অনুষ্ঠিত হয়।

আদালত সূত্রের বরাত দিয়ে জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট হাফেজ আহাম্মদ জানান, মামলার ১৬ নম্বর সাক্ষী সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইন, ১৭ নম্বর সাক্ষী সোনাগাজী পৌরসভার ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইয়াছিন ও ১৮ নম্বর সাক্ষী অ্যাম্বুলেন্স চালক নুরুল করিম সাক্ষ্য দেন। এ নিয়ে আলোচিত এ মামলায় ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে।

আগামীকাল মঙ্গলবার মামলার ১৯ নম্বর সাক্ষী ওই মাদরাসার শিক্ষক মো. নুরুল আবছার ফারুকী, ২০ নম্বর সাক্ষী নুসরাতের সহপাঠী তানজিনা বেগম সাথী ও ২১ নম্বর সাক্ষী সহপাঠী বিবি জাহেদা তামান্নার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন আদালত।

আদালত সূত্র জানায়, সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ওই মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ হোসোইন বলেন, আগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা মাদরাসার প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় সকলের সঙ্গে একত্রে অফিস করতেন। কিন্তু গত চার বা সাড়ে ৪ বছর আগে তিনি মাদরাসা ক্যাম্পাসের মাঝে সাইক্লোন শেল্টারের তিনতলায় অফিস স্থানান্তর করেন। তখন আমরা বলি, ওখানে একা অফিস নিয়ে গেলে আমাদের কাজে সমস্যা হবে। সেসময় তিনি বলেছিলেন, এ নিয়ে আপনারা নাক গলাবেন না। আপনাদের অফিসও প্রয়োজনে এখানে নিয়ে আসব।

মাওলানা হোসাইন বলেন, অধ্যক্ষের নানা অনিয়ম ও কুকর্মের প্রতিবাদ করায় অধ্যক্ষ মাদরাসার প্রভাষক মো. হারুনকে লাঞ্ছিত করেন। এর প্রতিবাদ করলে তিনি আমাকেও শো-কজ করেন। তিনি সবসময় সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন এবং দাপট দেখাতেন।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আরও বলেন, গত ৫ মে পিবিআই কর্মকর্তারা মাদরাসা ক্যাম্পাসের ভেতরে পুকুর পাড় থেকে শাহাদাত হোসেন শামীমের ব্যবহৃত বোরকা উদ্ধার করে। একই সময় অফিস পিয়ন নুরুল আমিন কর্তৃক ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা কেরোসিন বহনকারী গ্লাসও জব্দ করা হয়। আবার নুসরাতের হস্তলিপি পরীক্ষার জন্য দুটি পরীক্ষার খাতাও জব্দ করা হয়। এসময় পিবিআই যে জব্দ তালিকা তৈরি করেন তাতে আমি স্বাক্ষর করি।

মামলার আরেক সাক্ষী সোনাগাজী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, ২৭ মার্চ সকালে আমি বাড়িতে ছিলাম। নুসরাতের মা শিরিনা আক্তারের ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বের হই এবং তার অনুরোধে মাদরাসায় যাই। সেখানে গেলে জানতে পারি, অধ্যক্ষের হাতে নুসরাত যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুদ্ধ ছিলেন নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার। তিনি রাগ সামলাতে না পেরে অধ্যক্ষকে কয়েক ঘা বেতের বাড়ি বসিয়ে দেন। এসময় পাল্টা ক্ষোভ প্রকাশ করে সিরাজ বলেন, নুসরাত কীভাবে পরীক্ষা দেয় আমি দেখে নেব।

৬ এপ্রিলের ঘটনা প্রসঙ্গে ইয়াছিন বলেন, সেদিন লোকমুখে খবর পাই মাদরাসায় কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। আমি বিষয়টি জানতে কাশ্মীরবাজার সড়কের মাথার এক ব্যাবসায়ী আবু সুফিয়ানকে ফোন করি। তিনি বলেন, আপনার দোকানের (গ্রামীণ ফার্মেসী) পাশে মাদরাসার ছাত্র নুরউদ্দিন আছে। সে জানতে পারে। আমি নুরউদ্দিনকে ফোন করি। তখন নুরু আমাকে জানায়, মাদরাসার ছাদে নুসরাত গায়ে কেরোসিন দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

সাক্ষ্য দিতে গিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স চালক নুরুল করিম বলেন, সেদিন নুসরাতকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। আমি তার ওই পোড়া দেহ নিয়ে তাকে সোনাগাজী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফেনীর ২৫০ শয্যা আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে জরুরি বিভাগে তাকে চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

সোমবার বেলা ১১টা থেকে মাঝে ৪৫ মিনিট বিরতি দিয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আদালতের কার্যক্রম চলে। এদিন সাক্ষীদের জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু, কামরুল হাসান, আহসান কবির বেঙ্গল ও নুরুল ইসলাম। রাষ্ট্র ও বাদী পক্ষে ছিলেন পিপি হাফেজ আহাম্মদ, এপিপি এ কে এস ফরিদ আহাম্মদ হাজারী ও এম শাহজাহান সাজু।

নুসরাত হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা/শম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীমের (২০) সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে চার্জশিট দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এ মামলায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।

রাশেদুল হাসান/এমবিআর/এমএস

টাইমলাইন  

আপনার মতামত লিখুন :