ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন
জামায়াত-স্বতন্ত্রসহ কয়েকজনের মনোনয়ন বাতিল, যা বলছেন কর্মকর্তারা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। এরইমধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) জামায়াতে ইসলামী, স্বতন্ত্র ও বিএনপির বিদ্রোহীসহ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই চলছে দাবি করে রিটার্নিং কর্মকর্তারা বলছেন, যাদের বাতিল হয়েছে তাদের আপিল করার সুযোগ রয়েছে।
মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়াদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা ও বিএনপির বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ আরও অনেকের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনে ১৯৪ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু ৬৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এই আসনগুলোতে বিএনপির সব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হলেও জামায়াতের একজন প্রার্থীসহ দুজনের মনোনয়ন স্থগিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
বিএনপির আমানের আসনে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল
গাইবান্ধায় জামায়াতের হেভিওয়েট প্রার্থীসহ আটজনের মনোনয়ন বাতিল
টাঙ্গাইলে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ৯ জনের মনোনয়ন বাতিল
ঋণখেলাপির কারণে ঢাকা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে একই আসনে বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জহিরুল ইসলামের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঢাকা জেলা প্রশাসক রেজাউল করিম এ ঘোষণা দেন।
মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রম সভায় আব্দুল হকের উদ্দেশে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ‘ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রিপোর্ট অনুযায়ী ঋণখেলাপি করেছেন আপনি। আপনার এ ইস্যুগুলো থাকলে সিআইবি থেকে আপডেট করা উচিত ছিল। আপনি অফিসিয়ালি ঋণখেলাপি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত। আপনার মনোনয়নপত্র এই মুহূর্তে গ্রহণ করার সুযোগ আমাদের নেই। তবে আপনার আপিল করার সুযোগ আছে।’
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন আলোচিত নারী প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। শনিবার (৩ জানুয়ারি) ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে তা বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
তাসনিম জারা তার প্রার্থিতা বাতিলের পর সাংবাদিকদের জানান, দুজন ভোটারের তথ্যের কারণে এমনটি করা হয়েছে। কারণ তারা জানতেন না যে তারা ঢাকা-৯ আসনের ভোটার নন এবং ইসি তথ্য জানার কোনো উপায় রাখেনি। তবে তিনি আপিল করবেন।
এদিকে, কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদসহ দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কক্সবাজার জেলা রিটানিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান যাচাই-বাছাই শেষে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে জামায়াত প্রার্থী ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
টাঙ্গাইলের আটটি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটি আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুই দফায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এ মনোনয়নপত্র যাচাই করা হয়। এসময় বিভিন্ন কারণে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীসহ নয়জনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
গাইবান্ধার দুটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর হেভিওয়েটসহ মোট আটজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যাচাই-বাছাইয়ে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধা-১ আসনের মোট পাঁচ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। তারা হলেন, জামায়াত প্রার্থী মাজেদুর রহমান মাজেদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী ছালমা আকতার, মো. মোস্তফা মহসীন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রমজান আলী ও জাতীয় পাটির মাহফুজুল হক সরদার।
অপরদিকে, গাইবান্ধা-২ আসনে মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা হলেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মাজেদ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মিহির কুমার ঘোষ ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এ কেএম গোলাম আযম।
রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা জানান, মনোনয়নপত্রে ত্রুটি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অসঙ্গতি থাকায় এসব প্রার্থীর আবেদন বাতিল করা হয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, বাতিল হওয়া প্রার্থীদের জন্য নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আপিল নিষ্পত্তির পরেই চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাছাইয়ের প্রথমদিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি নির্বাচনি আসনের মধ্যে তিনটিতে ছয়জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাছাইয়ে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন যুক্ত স্বাক্ষরে ত্রুটি থাকায় তাদের সবার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। তালিকায় ভোটারের স্বাক্ষর থাকলেও দৈবচয়নে যাচাই করা হলে অনেক ভোটার তা অস্বীকার করেন।
এছাড়া, চট্টগ্রামের পাঁচটি সংসদীয় আসনে দাখিল করা ৪৫ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ১২ জনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কোনো কোনো কোনো জায়গায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকছে না, এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করেন ঢাকা-১২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম। শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অবস্থিত রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ দাবি করেন তিনি।
তবে প্রার্থীদের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা বলছেন, যে মনোনয়নপত্রগুলো ছোটখাটো ত্রুটির কারণে বাতিল হয়েছে সেগুলো আইনের ভিত্তিতে মীমাংসা হবে। প্রার্থীরা আপিল করার সুযোগ পাবেন।
শনিবার সন্ধ্যায় সেগুনবাগিচায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র যাচাই শেষে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থক তালিকায় অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংক্রান্ত সমস্যা, হলফনামায় স্বাক্ষরের অভাব, অসম্পূর্ণ বা ভুল কাগজপত্র, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা এবং অনুমোদিত দলীয় প্রতিনিধির স্বাক্ষর না থাকায় মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। মনোনয়ন বাতিলের পেছনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রসঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সবাই অভিযোগ তুলতেই পারেন। তবে আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করেছি। বাতিল হওয়া প্রত্যেক প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানানো হবে। বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আগামী ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন। প্রয়োজনে তারা আদালতের দ্বারস্থও হতে পারবেন।
এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের আড়াই হাজারের বেশি প্রার্থী নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শুরু করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
এসএনআর/এমএমএআর/জেআইএম