টাকার অভাবে ঘর তৈরি হচ্ছে না একমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৩:১১ পিএম, ১৯ মে ২০২৬
দেশের একমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরে সংগৃহীত আছে মণিপুরী সম্প্রদায়ের বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন সামগ্রী

মণিপুরী সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার জন্য ধীরে ধীরে দেশের একমাত্র সংরক্ষণশালা প্রতিষ্ঠা করেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামের হামোম তনু বাবু নামে একজন। ২০০৬ সালে এই সংগ্রহশালাকে নিজের বাবার নামে নামকরণ করে দেশের একমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। জাদুঘরটির নাম দেওয়া হয় ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরী ইনট্যালেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’।

এই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে মণিপুরী সম্প্রদায়ের বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন তৈজসপত্র, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তবে অর্থের অভাবে বড় করে একটি ঘর নির্মাণ করা যাচ্ছে না। জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা হামোম তনু বাবু জমি দিলেও টাকার অভাবে ঘর নির্মাণ করা যাচ্ছে না।

টাকার অভাবে ঘর তৈরি হচ্ছে না একমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরের

আরও পড়ুন-
বিরিশিরি জাদুঘর: আদিবাসী-লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা
যেখানে আজও জীবন্ত অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলার স্মৃতি
তাজহাটের প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে গোপন গল্প

প্রায় তিনশো বছর আগে বাংলাদেশে বসবাস শুরু করেন মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোকেরা। দীর্ঘ সময় ধরে বসবাস করলেও এখনো নিজেদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, বর্ণমালা, খেলাধুলাসহ সবকিছু টিকিয়ে রেখেছেন তারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো অনেক কিছু হারাতে শুরু করলে মণিপুরীদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন হামোম তনু বাবু। তিনি সংগ্রহশালাকে জাদুঘরে পরিণত করেন। বর্তমানে এই জাদুঘরে প্রায় ৩০০ শতাধিক দুর্লভ নিদর্শন রয়েছে।

টাকার অভাবে ঘর তৈরি হচ্ছে না একমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরের

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামের নিজ বাড়িতে ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরী ইনট্যালেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’ নামে জাদুঘর গড়ে তুলেছেন হামোম তনু বাবু। বাড়ির চারটি কক্ষ নিয়ে গড়ে তোলা এই জাদুঘরে মণিপুরীদের তাঁতশিল্পের শতবছর পুরোনো কয়েকটি খণ্ডাংশ রয়েছে। কৃষি কাজে ব্যবহৃত লাঙল, মই, তাঁতের চিরুনি, তাঁতের কমল বাইনের থেম, মণিপুরী ভাষা লিখে ফ্রেম করে রাখা হয়েছে। আরও রয়েছে পানি খাওয়ার করেক, খেলার সরঞ্জাম, মাছ শিকারের ডরি, তুলা থেকে সুতা বের করার কাতরেং, মহিষের লাঙলের জোয়াল, মাছ শিকারের তুঙ্গল, লবণ রাখার পাত্র, সুক যা দিয়ে ধান থেকে চাল বের করা হতো, চেঞ্জ জালুক, পান রাখার তানগ্রালুক, চাল মাপার মেরুক, গীতা পাঠ করার বস্তু ও কাপড় ধোয়ার উরুক।

জাদুঘরে আরও দেখা যায়, প্রাচীন পোশাক, মণিপুরী সাতটি গোত্রের দা, তাদের বিয়েতে খই ও মিষ্টি রাখার পাত্র, রাধা, কৃষ্ণ, ললিতার মূর্তি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত শতবছরের পুরোনো পোশাক। মনিপুরী নায়ক-নায়িকার ছবি ও শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ।

টাকার অভাবে ঘর তৈরি হচ্ছে না একমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরের

আরও পড়ুন-
বিরল পাথর আর প্রাচীন নিদর্শনে সমৃদ্ধ ‘রকস মিউজিয়াম’
হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে বিক্রমপুর জাদুঘর
বীরশ্রেষ্ঠের নামে জাদুঘরে নেই মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতিচিহ্ন

এছাড়া এই জাদুঘরে মণিপুরী বিয়েতে দেওয়া হাড়ি পাতিল, শুঁটকি রাখার নাঙ্গা, মুসলিম মণিপুরী বিয়েতে ব্যবহৃত ছাতা, তাঁতের সুতা প্যাঁচানোর লাহান তারেঙ্গ, তীর-ধনুক। নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে মণিপুরীদের আদি ধর্ম দেবতাদের পরিচিতি। আছে মণিপুুরী নারীদের ব্যবহারের বিভিন্ন ধরনের গহনা, সাজসজ্জার উপকরণসহ প্রায় ৩ শতাধিক শতবছর পুরোনো জিনিসপত্র। যা মণিপুরীরা একটা সময় ব্যবহার করেছেন।

জাদুঘরে ঘুরতে আসা গিলমান আহমেদ বলেন, এটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দেশের একমাত্র জাদুঘর। এখানে এলে মণিপুরী সম্প্রদায়ের অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা যাবে। এই জাদুঘর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকটা পিছিয়ে আছে। এটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে সহযোগিতা প্রয়োজন। নয়তো একটা সময় এটাকে আর পাওয়া যাবে না। যেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে এগুলো আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

টাকার অভাবে ঘর তৈরি হচ্ছে না একমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরের

স্থানীয় বাসিন্দা বৃন্দা রানী জানান, জাদুঘরটি আমাদের বাড়িতে অবস্থিত। দূরদূরান্ত থেকে এখানে অনেকেই আসেন। হামোম তনু বাবু অনেক কষ্ট করে এগুলো সংরক্ষণ করেছেন। পরবর্তীতে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। এই জাদুঘরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা আসেন। এখানে মণিপুরী সব সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরী ইনট্যালেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা হামোম তনু বাবুর ভাই ও জাদুঘরের পরিচালক কবি সনাতন হামোম বলেন, অর্থের অভাবে বড় করে একটি ঘর নির্মাণ করা যাচ্ছে না। জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা আমার ভাই তনু বাবু বর্তমানে আমেরিকা আছেন। তিনি জাদুঘরের জন্য জায়গা দিয়েছেন, তবে টাকার অভাবে করা যাচ্ছে না। এই জাদুঘরটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একমাত্র জাদুঘর। যা ইউনেস্কো পুরস্কারপ্রাপ্ত। জাদুঘরে যাওয়ার প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা মাটির। বৃষ্টি হলে কাদার জন্য চলাচলও করা যায় না। সরকারিভাবে জাদুঘরটি প্রচার করার পাশাপাশি অর্থায়ন প্রয়োজন।

টাকার অভাবে ঘর তৈরি হচ্ছে না একমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরের

মণিপুরী জাদুঘরে যেভাবে যাবেন

ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ ও শমশেরনগর রেলস্টেশনে নেমে, মাইক্রোবাস বা সিএনজি অটোরিকশা করে কমলগঞ্জের আদমপুর বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার ভেতরে ছনগাঁও গ্রামে মণিপুরী জাদুঘরে যাওয়া যায়।

বাসে করে সারাদেশে থেকে শ্রীমঙ্গল বা মৌলভীবাজার শহরে নেমে মাইক্রবাস বা সিএনজি অটোরিকশায় কমলগঞ্জের আদমপুর বাজার থেকে ছনগাঁও গ্রামে মণিপুরী জাদুঘরে যাওয়া যায়। আদমপুর বাজার থেকে ছনগাঁও গ্রামে রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশায় ভাড়া ৮০ থেকে ১০০ টাকা।

মাহিদুল ইসলাম/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।