যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি: ভারত দিচ্ছে বেশি, পাচ্ছে কম?
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে ঘোষিত অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহল, কৃষক সংগঠন ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ বাড়ছে। গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) চুক্তির অতিরিক্তি তথ্য প্রকাশের পর থেকেই বিরোধী দলগুলো একে ভারতের জন্য অসম ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে আখ্যা দিচ্ছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে মোদী সরকার। বিরোধীদের দাবি সত্ত্বেও চুক্তি সম্পর্কে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না তারা।
চুক্তির পর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনবে ভারত। তবে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করার বিষয়ে ভারতের কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতির কথা সেখানে উল্লেখ নেই।
এর আগে, গত সপ্তাহে দুই দেশ বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেয়। সেই অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্কহার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামাতে সম্মত হয়। যদিও চূড়ান্ত আলোচনা এখনো চলমান, তবু এই অন্তর্বর্তী চুক্তিকে ঘিরে চারটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ভারত কি দিচ্ছে বেশি, পাচ্ছে কম?
চুক্তি অনুযায়ী, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পপণ্য এবং কয়েকটি খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ওপর মানক শুল্ক কমাতে রাজি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কেবল ভারতের প্রায় ৫৫ শতাংশ রপ্তানির ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক কমাবে (৫০ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশ)।
আরও পড়ুন>>
ভারতীয় পণ্যে শুল্ক কমছে, ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানালেন মোদী
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি: আন্দোলনে নামছেন ভারতের কৃষকরা
মার্কিন চাপ/ ইরানের তেলবাহী ৩ ট্যাংকার জব্দ করলো ভারত
দিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের মতে, এতে একটি ‘অসম বিনিময়’-এর চিত্র স্পষ্ট। ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমসহ বিরোধী নেতারা বলছেন, পুরো কাঠামোটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ঝুঁকে আছে।
তবে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল দাবি করেছেন, ১৮ শতাংশ শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের অন্য বাণিজ্য অংশীদারদের তুলনায় কম এবং এতে ভারতের বস্ত্র, চামড়া ও রত্নখাতের মতো শ্রমনির্ভর শিল্প উপকৃত হবে। অধিকাংশ শিল্প সংগঠনও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছে।
রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করবে ভারত?
এই প্রশ্নেই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা। চুক্তি ঘোষণার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভারত রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধে সম্মত হয়েছে। কিন্তু যৌথ বিবৃতিতে তার কোনো উল্লেখ নেই।
এক পৃথক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প বলেছেন, ভারত সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার তেল কিনছে কি না, তা নজরদারিতে রাখা হবে। যদি তা ফের শুরু হয়, তবে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আবার আরোপ করা হতে পারে।
অন্যদিকে পীযূষ গয়াল জানিয়েছেন, তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো, সরকার নয়। রাশিয়াও বলেছে, দিল্লির পক্ষ থেকে সরবরাহ বন্ধের কোনো ইঙ্গিত তারা পায়নি। এই অস্পষ্টতা নিয়ে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, পার্লামেন্টের বাইরে গিয়ে বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
কৃষকদের ক্ষতি হবে?
চুক্তিটি ভারতের কৃষক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যে শুল্ক ছাড় দিলে ভারতীয় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
সংযুক্ত কিসান মোর্চা বলেছে, শুকনো শস্যের অবশিষ্টাংশ, সয়াবিন তেল, লাল জোয়ার, বাদাম ও ফলের মতো পণ্যের আমদানি বাড়লে কৃষকদের আয় কমবে। তারা বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে এবং আন্দোলন জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে।
আরও পড়ুন>>
এপস্টেইন ফাইলসের তথ্য/ ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে নাচগান করেন মোদী
স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি? ট্রাম্পকে বলেন মোদী
মোদীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে চাই না: ট্রাম্প
‘ট্রাম্প ট্রমায়’ ভুগছেন নরেন্দ্র মোদী, জার্মান সংবাদমাধ্যমে দাবি
গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের মতে, কোন কোন অতিরিক্ত কৃষিপণ্য শুল্কছাড়ের আওতায় এসেছে, সে বিষয়েও স্পষ্টতা নেই। যদিও সরকার বলছে, দুগ্ধ, জিনগতভাবে পরিবর্তিত পণ্য, মাংস ও পোলট্রিতে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি এবং কৃষকদের সুরক্ষা বজায় রাখা হয়েছে।
৫০০ বিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার বাস্তবসম্মত?
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে জ্বালানি, উড়োজাহাজ, প্রযুক্তিপণ্য ও কোকিং কয়লাসহ বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে ভারত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়াতে হবে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে ভারতের আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমে যাবে। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী গয়াল একে ‘রক্ষণশীল লক্ষ্য’ বলে দাবি করেছেন। তার মতে, অর্থনীতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে উড়োজাহাজ ও জ্বালানির চাহিদা এমনিতেই বাড়বে।
আরও পড়ুন>>
ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিলে সম্মতি দিলেন ট্রাম্প
ভারতের নতুন সিদ্ধান্তে ৬০০ কোটি ডলার আয় কমার শঙ্কা
ট্রাম্পের শুল্কে টালমাটাল ভারতের অর্থনীতি, রুপির দরে সর্বনিম্ন রেকর্ড
সব প্রশ্ন ও বিতর্ক সত্ত্বেও, চুক্তির ঘোষণার পর ভারতের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, শুল্ক হ্রাস, জ্বালানি সহযোগিতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভারতের প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। যদিও চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি
কেএএ/