পাবনা
জনবল সংকটে হামের টিকাদান কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা-ভোগান্তি
হাম আক্রান্তে হটস্পট জেলা পাবনায় দ্বিতীয় দিনের হাম প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে শুরু হয় এ কার্যক্রম। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সঙ্গে ৫ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চারাও এসে ভিড় করছেন টিকার জন্য। ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বেশি বয়সীদের। তবে কয়েকটি কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক বা জনবল সংকটে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে টিকাগ্রহীতা ও টিকাদানকর্মীদের।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, হঠাৎই জরুরিভাবে এ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় শুরুতে স্বেচ্ছাসেবক সহ প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা, চর তারাপুর, আতাইকুলা, গয়েশপুর ও সাদুল্লাহপুর ইউনিয়নে মোট ১৫টি কেন্দ্রে দ্বিতীয় দিনের মতো হাম রুবেলা প্রতিরোধে টিকা প্রদান করা হয়। এসব এলাকার একাধিক টিকাদান কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক না থাকায় বিশৃঙ্খল পরিবেশেই দেওয়া হচ্ছে টিকা। সকাল ৯টায় টিকা প্রদান শুরু করার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় দেরি করে টিকা দেওয়া শুরু করতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও সঠিক সময়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা এলেও টিকাগ্রহীতারা দেরিতে আসায় ৯টা থেকে টিকা প্রদান শুরু করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের টিকাদান কার্যক্রম সাধারণ হাম রুবেলা ক্যাম্পেইনের মতো নয়। পাবনাসহ হঠাৎ দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় তা প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ফলে সাধারণ ক্যাম্পেইনে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী ও দুজন করে স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করলেও জরুরি এই টিকাদান কার্যক্রমে তেমন বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনা না থাকায় তেমনটি করা সম্ভব হচ্ছে না।
ভাঁড়ারা ইউনিয়নের কোলাদির সাজেদুন নাহার বলেন, আমার বাচ্চার বয়স প্রায় ৭ মাস৷ ১০টার দিকে এসে সাড়ে ১১টার দিকে টিকা পেলাম। লাইনে সমস্যা হচ্ছে। লোক দিয়ে এগুলো ঠিক রাখতে হয়। কিন্তু এদের লোক দেখছি না।

১৭ মাস বয়সী শিশু নিয়ে আসা একই এলাকার ফেরদৌসী খাতুন বলেন, আমাদের আশেপাশের বাড়ির কয়েকটা বাচ্চার হামের উপসর্গ দেখা গিয়েছে। ফলে আমরা একটু ভয়ই পাচ্ছি। তাই টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করছি না। তবে বিশৃঙ্খলা না থাকলে ভালো হয়।
শ্রীরামপুরের বর্ণা খাতুন বলেন, আমার বাচ্চার বয়স ২ বছর। এর আগে বেশকিছু টিকা দিয়েছি। আজ সকাল থেকে দুইবার মাইকিং করছে। শুনে বাচ্চা নিয়ে হামের টিকা দিলাম। এখানে অল্প বাচ্চা থাকায় এলোমেলো বা লাইন ছাড়াও দেওয়া যাচ্ছে। যেভাবে হাম রোগ ছড়িয়ে যাচ্ছে তাতে বাচ্চারা সুই দেখে ভয় পেলেও সুস্থ থাকতে টিকা দেওয়াতেই হচ্ছে।
ওই এলাকার আনিসুর রহমান বলেন, দুইটা বাচ্চা নিয়ে টিকা কেন্দ্রে আসছি। একটার বয়স ৬ মাসের বেশি, আরেকটার আড়াই বছর। হামের টিকা নিয়ে অবহেলা করার সুযোগ নেই। জরুরি টিকা দেওয়া শুরু হচ্ছে জেনে গতকাল কমিউনিটি ক্লিনিকে এসে শুনে গেছি। আজ দুজনকে নিয়ে আসছি। বড় বাচ্চাকে নিয়ে আমার স্ত্রী ভেতরে গেছেন টিকা দিতে। এরপর ছোটটাকে দেবো।
সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের শ্রীরামপুর কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহকারী দিলারা পারভীন বলেন, আমার এখানে ১৮০ জন বাচ্চাকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু টিকা নিয়েছেন ১২৮ জন বাচ্চা। দুপুরের পর থেকে আর তেমনভাবে বাচ্চা আসেনি। স্বাভাবিকভাবেই টিকাদান কার্যক্রম চলছে। তবে অন্যান্য ক্যাম্পেইনের মতো সময় ও প্ল্যান নিয়ে ক্যাম্পেইনটি করলে কাজ করার ক্ষেত্রে আরও সুবিধা হতো।
কোলাদি কমিউনিটি ক্লিনিকের টিকাদান কর্মী ফজলুল হক বলেন, আমরা এখনো সেভাবে লোক পাইনি। জরুরি প্রোগ্রাম হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবকও নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। দুজন স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে কেন্দ্রগুলোতে বাচ্চাদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা অবধি আমরা টিকা দিচ্ছি। বাচ্চা থাকলে ৩টার পরেও টিকা দেবার নির্দেশ রয়েছে। ওষুধে কোনো ঘাটতি নেই। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বাচ্চা হলেও টিকা দেওয়া হবে।
সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে ঘুরে টিকাদান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাচ্চারা যেন হয়রানি ছাড়া টিকা পায়, নির্ধারিত বয়সের বাইরে বাচ্চাদের আপাতত টিকা দেওয়া যাবে না, এ ধরনের বিষয়গুলোতে আমরা টিকাদানকর্মীদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দিচ্ছি। এখনো কোনো কেন্দ্রে তেমন সমস্যা দেখা যায়নি। সবকিছু ভালোমতোই চলছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, জরুরি এ কর্মসূচির আওতায় জেলার সদর, আটঘরিয়া, বেড়া ও ঈশ্বরদী উপজেলার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৬৬ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এদের মধ্যে সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ রয়েছে। এ উপজেলার দোগাছি ও হেমায়েতপুর ইউনিয়নে বেশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তাই অধিক গুরুত্ব দিয়ে পাবনায় হাম প্রতিরোধে টিকা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানায় স্বাস্থ্য বিভাগ।
এ ব্যাপারে পাবনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, খুবই জরুরি ভিত্তিতে হাম রুবেলা টিকাদান প্রোগ্রামটি করা হচ্ছে। ফলে তেমন পরিকল্পনার সুযোগ হয়নি। একজন স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে একজন করে স্বেচ্ছাসেবক রাখতে বলা হয়েছে। অন্যান্য বারের মতো এবারের প্রোগ্রামে স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মানী না থাকা ও সময় না পাওয়ায় কিছুটা প্রব্লেম হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, একজন স্বাস্থ্যকর্মী দিনে ২০০ বাচ্চাকে টিকা দিতে পারেন। এটি দেবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা অবধি। সবাই যদি বিশৃঙ্খলা না করে ধৈর্য ধরে নিলে সমস্যা হবে না। তবুও কোথাও সমস্যা থাকলে নিরসন করা হবে।
এদিকে জেলায় হামের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হয়ে নতুন ২০ জন পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি থেকে চিকিৎসাধীন ৪৪ জন। রোববার এ সংখ্যা ছিল ৪১ জন। এ বছর জেলায় মোট আক্রান্ত হয়ে জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ২১৩ জন।
আলমগীর হোসাইন নাবিল/এমএন/এমএস