জ্বালানি সংকট দেশে দেশে, কী করবে বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৮ এএম, ৩১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে সারাবিশ্বের জ্বালানি খাত/ছবি: এআই নির্মিত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সারাবিশ্বে। বিশেষ করে অস্থির হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাত। এই সংকট সামাল দিতে প্রায় সব দেশের সরকারই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সরকারও চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গ্রহণ করেছে বেশকিছু পদক্ষেপ।

বৈশ্বিক এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার সাশ্রয়, রেশনিং ও বিকল্প উৎসে জোর দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে দেশের জ্বালানি খাত চাপে পড়লেও পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার একদিকে সাশ্রয়ী ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই জ্বালানির চাহিদা কমাতে বেশকিছু নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে সংযম আনতে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা, সরকারি ও বেসরকারি অফিসে এসি ব্যবহার সীমিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় যানবাহন ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে, যেন সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় জ্বালানি সাশ্রয়ে অংশ নেয়।

সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে সরকার আংশিক রেশনিং ব্যবস্থাও চালু করেছে। যানবাহনভিত্তিক নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে ‘প্যানিক বায়িং’ নিয়ন্ত্রণ এবং সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখা, নতুন উৎস খোঁজা এবং জ্বালানির মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় শিল্পখাতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বণ্টন করা হচ্ছে এবং ছয়টি সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বয় করা হচ্ছে, যেন গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সচল রাখা যায়। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও পাচার ঠেকাতে প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও অন্যান্য উৎসের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে জ্বালানি খাতের এই অবস্থা বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীলতা থাকায় সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে সরকারকে ধারাবাহিক ও কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের মতো সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, কর্মকর্তাদের জন্য সপ্তাহের অন্তত দুই দিন ঘরে বসে কাজ (হোম অফিস) করার সুযোগ এবং অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। আগামী মন্ত্রিপরিষদ সভায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

jagonews24তেলের জন্য পাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের ভিড়/ফাইল ছবি

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অবৈধ মজুতের সন্ধান মেলায় এটি নিয়ন্ত্রনে না আনা গেলে বিপর্যয় বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে সরকারের সবগুলো দপ্তরকে সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের ডিজেল ইমপোর্ট করতে হয় মিলিয়ন টনের বেশি, এটা মোটামুটি সম্পূর্ণটাই ইমপোর্টেড। আমাদের পেট্রোল আর অকটেনের ব্যবহার মিলিয়ন টনেরও কম, তার মধ্যে ৭০ শতাংশই আমাদের দেশে উৎপাদন হয়।

সরকারের সবগুলো অর্গানকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা অবৈধ মজুত করছে তাদের আইনের আওতায় এনে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে, যেন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। কারণ এখন আমরা একটা সংকটের মধ্যে আছি, অবৈধ মজুত এই সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটা বড় ক্রাইম।-জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন

তিনি বলেন, পাম্পে কোনো সাধারণ সময়ে আমি যতখানি ভিড় পাই, ঠিক তেমনি আমি তেল ভরে নিয়ে চলে এলাম। আর উল্টা দিকে দেখলাম যে বিশাল লাইন অকটেন-পেট্রোলের জন্য। এরপর তেল দিচ্ছে খুবই ধীরগতিতে। সাধারণ সময়ে একটু এদিক-ওদিক হলেই পাম্পে মোটরসাইকেলের লম্বা লাইন লেগে যায়। আর এখন তো অবস্থা একটু খারাপ। আমার মনে হয় সরকার ডিজেল যেহেতু সামাল দিতে পারছে, সেহেতু পেট্রোল-অকটেন পরিস্থিতিও সামাল দিতে পারবে।

এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারের সবগুলো অর্গানকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা অবৈধ মজুত করছে তাদের আইনের আওতায় এনে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে, যেন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। কারণ এখন আমরা একটা সংকটের মধ্যে আছি, অবৈধ মজুত এই সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটা বড় ক্রাইম।

শুধু বাংলাদেশ নয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এখন বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তা মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপও নিয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় চারদিনের কর্মসপ্তাহ ও ফুয়েল পাস চালু

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কার সরকার একাধিক স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সংকটের তীব্রতা কমাতে প্রথমেই তারা জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ বা কিউআর কোডভিত্তিক রেশনিং ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে যানবাহন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়া হয়, যেন ‘প্যানিক বায়িং’ বন্ধ থাকে এবং সবার মধ্যে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি সপ্তাহের বুধবার অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করে চারদিনের কর্মসপ্তাহ চালু এবং অনলাইন ক্লাস ও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে যাতায়াত কমিয়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে যানবাহন চলাচলেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে দেশটির সরকার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের ট্যারিফ সমন্বয়ের মতো অর্থনৈতিক সংস্কার গ্রহণ করেছে, যেন ভর্তুকির চাপ কমে এবং জ্বালানি খাত আর্থিকভাবে টেকসই হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় ‘কস্ট-রিফ্লেকটিভ প্রাইসিং’ চালু করে জ্বালানির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের দিকেও অগ্রসর হয়েছে শ্রীলঙ্কা। অপরদিকে, সরবরাহ সংকট কাটাতে জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আমদানি, স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, কয়লা ও গ্যাস আমদানি বৃদ্ধি এবং রিফাইনারি সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সরকারি খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যেমন সরকারি যানবাহনের ব্যবহার সীমিত করা, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমানো এবং অফিসে জ্বালানি খরচ হ্রাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎখাত পুনর্গঠন, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ানোর পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে শ্রীলঙ্কা। এসব সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিকে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করছে দেশটি।

জ্বালানি সংকটে ফিলিপাইনে জরুরি অবস্থা জারি

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ফিলিপাইন সরকার  প্রথমেই ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে সরকারকে দ্রুত জ্বালানি আমদানি, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যা জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বণ্টন তদারকি করছে।

সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ, বিকল্প উৎস যেমন রাশিয়া, ভারত, চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে এবং জ্বালানির মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে একটি বড় তহবিল (প্রায় ২০ বিলিয়ন পেসো) গঠন করে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

jagonews24জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কথা বলে অনেক পাম্প বন্ধ রেখেছেন মালিকরা/ফাইল ছবি

চাহিদা কমাতে ফিলিপাইনের সরকার বিভিন্ন সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি অফিসে জ্বালানি ব্যবহার কমানো, চারদিনের কর্মসপ্তাহ চালু, রিমোট কাজ ও এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। জনগণকে গণপরিবহন ব্যবহার ও জ্বালানি সাশ্রয়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ফিলিপাইন সরকার  প্রথমেই ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে সরকারকে দ্রুত জ্বালানি আমদানি, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যা জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বণ্টন তদারকি করছে

এছাড়া জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব কমাতে পরিবহন খাতের জন্য ভর্তুকি দেওয়া, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে বিনামূল্যে বাসসেবা চালু এবং প্রয়োজন হলে জ্বালানি কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট রোধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বিদ্যুৎখাতে মূল্য অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে সরকার স্পট মার্কেট সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেয়, যেন হঠাৎ করে বিদ্যুতের দাম বেড়ে না যায়। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে সস্তা কিন্তু নিম্নমানের জ্বালানি সীমিতভাবে ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে, যেন সরবরাহ সচল রাখা যায়।

কী করছে চীন?

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় চীন অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় ভিন্নধর্মী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করেছে। সংকট শুরু হওয়ার আগেই দেশটি বিপুল পরিমাণ তেল মজুত (স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ) গড়ে তোলে, যার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহে ধাক্কা লাগলেও অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় এবং নতুন রপ্তানি চুক্তিও স্থগিত রাখে, যেন দেশের ভেতরে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত থাকে।

জ্বালানির চাহিদা নিয়ন্ত্রণে চীন সরাসরি রেশনিং না করলেও মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি করে, যেন অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমে এবং সরবরাহ চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

একই সময়ে দেশটি অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে ‘নিজস্ব জ্বালানি নির্ভরতা’ নীতি অনুসরণ করছে। দেশটি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কয়লা, নবায়নযোগ্য শক্তি (সোলার, উইন্ড), পারমাণবিক শক্তি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ফলে তেলের ওপর নির্ভরতা কমে গিয়ে বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ছে।

পাশাপাশি চীন শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও জোর দিয়েছে। যেমন—ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য শক্তি-দক্ষতার মান নির্ধারণ, শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি।

কঠোর ভারত সরকার

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারত সরকারও বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভারতে রান্নার গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে গ্যাসের কালোবাজারি শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন শহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের বহুগুণ অর্থ দিয়ে তাদের গ্যাস নিতে হচ্ছে।

এদিকে ভারত সরকারের তরফে বারবার জানানো হয়েছে, দেশে যথেষ্ট পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে আতঙ্কিত হয়ে ‘সিলিন্ডার মজুত বা প্যানিক বাইং’ না করার অনুরোধ করা হয়েছে।

ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এলপিজি বণ্টন নেটওয়ার্কের ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে এবং কালোবাজারি রুখতে এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলো খুচরা আউটলেট ও এলপিজি ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারগুলোতে আড়াই হাজারের বেশি বার আকস্মিক পরিদর্শন চালিয়েছে।

ভারত সরকার জানিয়েছে, সমস্যার সূত্রপাত থেকেই এলপিজি সরবরাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে গৃহস্থালি, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে।

এলপিজি সরবরাহের ওপর চাপ কমাতে, যাদের কাছে পিএনজি, অর্থাৎ যে গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে সরবরাহ করা হয় এবং এলপিজি সিলিন্ডার দুটির সংযোগই রয়েছে সেই গ্রাহকদের ১৪ মার্চের এক নির্দেশনা অনুযায়ী এলপিজি সংযোগ বাতিল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এলপিজির চাহিদার ওপর চাপ কমাতে কর্তৃপক্ষ কেরোসিন ও কয়লার মতো বিকল্প জ্বালানিও সহজলভ্য করেছে। ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কেরোসিন বিতরণের অনুমতি দিতে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ভারত সরকার।

ভারত সরকার পেট্রোল ও ডিজেল উভয়ের ওপর লিটার প্রতি ভারতীয় মুদ্রায় ১০ টাকা শুল্ক কমিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের তীব্র ও দ্রুত বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি ভারত সরকার ডিজেলের ওপর একটি রপ্তানি শুল্ক চালু করেছে। বিবৃতিতে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, এই শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য হলো রপ্তানি কমিয়ে আনা এবং উৎপাদিত দ্রব্যকে মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যবহার করা।

এনএস/ইএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।