স্বামী হত্যা মামলায় প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি মিন্নি

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৪৩ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত শাহ নেওয়াজ রিফাত শরীফের স্ত্রী কারাবন্দি আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগের অবকাশকালীন চেম্বারজজ আদালত।

সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর চেম্বারজজ আদালত এই আদেশ দেন।

রিফাত হত্যা মামলায় স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি ছিলেন একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। প্রথমে তাকে মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য নেয়া হয় পুলিশ লাইনে। তারপর করা হয় আসামি। পরে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

এরপর হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হয়, সেই জামিন আবেদন ফেরত দেন হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ। পরে হাইকোর্টের অপর একটি বেঞ্চে আবারেও জামিন আবেদন করা হয়, এরপর তার জামিন নিয়ে প্রথমে (২০ সেপ্টেম্বর) রুল জারি করেন আদালত। পরে ওই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত ২৯ আগস্ট মিন্নির স্থায়ী জামিন মঞ্জুর করেন হাইকোর্ট।

গত রোববার মামলার তদন্ত শেষে মিন্নিকে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করে মামলায় সাত নম্বর আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে মিন্নির হাইকোর্টের জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) ‘নো অর্ডার’ বলে আদেশ দেন আদালত। এই আদেশের পর মিন্নির আইনজীবীরা সাংবাদিকদের বলেছেন, এখন আর মিন্নির কারামুক্তিতে বাধা নেই।

কিন্তু এর মধ্যে মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে চার্জশিটভুক্ত হয়ে সাত নম্বর আসামি বনে গেছেন মিন্নি। তবে, জামিন বহাল থাকায় কবে মিন্নি কারাগার থেকে বের হচ্ছেন সেটাও দেখার অপেক্ষা।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন (মিন্নির জামিনের জন্য আদালতে শুনানিও করেছেন তিনি) বলেন, ‘চেম্বারজজ আদালতের আদেশের পর মিন্নির কারামুক্তিতে বাধা নেই। তবে মামলায় মিন্নিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করায় জামিনে থেকেই তাকে আইনগতভাবে মামলাটি মোকাবিলা করতে হবে।’

জানা গেছে, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ। হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পরই এ আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারোয়ার কাজল। তিনি বলেন, আজ (মঙ্গলবার) রায়ের কপি পাওয়া গেলে এই লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করা হবে। এরই মধ্যে আপিল করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে যদি মিন্নি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যান সে ক্ষেত্রে তাকে গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণের নির্দেশনা চাওয়া হবে।

এর আগে গত ২৯ আগস্ট এক রায়ে মিন্নির জামিন মঞ্জুর করেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ মিন্নির জামিন স্থগিত চেয়ে চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করে। পরে আবেদনের ওপর শুনানি হয়।

সোমবার আদালতে মিন্নির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জেড আই খান পান্না, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন, সাবেক সম্পাদক আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী, আইনুন নাহার সিদ্দিকা, অনিক আর হক, এম মঈনুল ইসলাম, মাক্কিয়া ফাতেমা ইসলাম, রোহানি সিদ্দিকা ও জামিউল হক ফয়সাল। আর রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সরোয়ার কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসেন বাপ্পি। এ সময় আদালতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

এর আগে গত ২৯ আগস্ট বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মিন্নির স্থায়ী জামিন মঞ্জুর করে রায় ঘোষণা করেন।

জামিনের ওই রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, জামিন পেয়ে তিনি (মিন্নি) তার বাবার জিম্মায় থাকবেন এবং মিডিয়ার সামনে কথা বলতে পারবেন না।

গত ৩০ জুলাই বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান মিন্নির জামিন নামঞ্জুর করে আদেশ দেন। তার আগে গত ২১ জুলাই বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালত মিন্নির জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করেন।

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যার ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।

এ ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয় রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশাকে। কিন্তু আয়শার শ্বশুর মামলার ১৮ দিন পর গত ১৩ জুলাই এই হত্যাকাণ্ডে আয়েশা জড়িত এমন দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করার পর মামলাটির তদন্তে নাটকীয় মোড় নেয়।

পরবর্তীতে এ মামলায় গ্রেফতার করা হয় মিন্নিকে। এই মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হওয়া সবাই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

অন্যদিকে গত ২ জুলাই এই মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।

সর্বশেষ গত রোববার (১ সেপ্টেম্বর) মিন্নিসহ ২৪ জনকে এই মামলায় আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দেয়া ওই অভিযোগপত্রে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে রিফাত ফরাজীকে, যিনি বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। আর নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নিকে করা হয়েছে মামলার ৭ নম্বর আসামি, যিনি এই মামলার এজাহারে ছিলেন এক নম্বর সাক্ষী।

সুপ্রিমকোর্টের জামিন স্থগিতের আপিল শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়, এরই মধ্যে এই মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তাতে মিন্নিকে আসামি করা হয়েছে। তালিকায় ৭ নম্বরে মিন্নির নাম রয়েছে। তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মিন্নির জবানবন্দি পাঠ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের জামিন স্থগিতের আবেদনের বিরোধিতা করে মিন্নির আইনজীবীরা বলেন, ‘১৯ বছরের একটি মেয়ে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ১৬ জুলাই পুলিশ লাইনসে ডেকে নেয়া হয়। সেখানে বেশ কয়েক ঘণ্টা রাখার পর রাতে ১০টার পর গ্রেফতার দেখানো হয়। এর পরদিন ১৭ জুলাই তাকে আদালতে নিয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ লাইনসে রাখা হয়।’

আইনজীবীরা বলেন, ‘আইন অনুযায়ী আইনজীবীর উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি। একজন তরুণীকে এত ঘণ্টা পুলিশের হেফাজতে রাখা হলে এমনিতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কথা। তাছাড়া তাকে আদালতে হাজির করার পর তিনি বলেছিলেন, ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। এমনকি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার পরও তিনি এই জবানবন্দি প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেছেন। তারা বলেন, ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে, একজন আসামি স্বেচ্ছায় এত গুছিয়ে এত কথা বলতে পারে না।

মামলার বর্তমান অবস্থা

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেফতারের পর কারাগারে থাকা ১৪ জন অভিযুক্তকে মামলার শুনানির জন্য ধার্য দিন আজ সকালে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে ছয়জনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় আদালত তাদের খুলনার শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরা হলো-রিশান ফরাজী, তানভীর, চন্দন, অলি, নাজমুল ও শ্রাবণ। আর বাকি অভিযুক্তদের জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এ মামলায় অভিযুক্ত চন্দন ও টিকটক হৃদয়ের জামিনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে, এই আদালতে মামলার মূল নথি না থাকায় কোনো আদেশ দেননি বিচারক। এ ছাড়া অভিযুক্ত শ্রাবণের স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। পরে আদালতে এজন্য কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করার জন্য আদেশ দেন।

এর আগে গত রোববার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় পুলিশ। একই সঙ্গে, রিফাত হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি নয়ন বন্ড ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

এফএইচ/এসআর/এমকেএইচ

টাইমলাইন