সহিংসতায় নির্বিকার!

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ০১:২৪ পিএম, ২৯ জুন ২০১৯

বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে ২২ বছরের রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা এখন সব আলোচনায়। রিফাতের স্ত্রী একাই যুদ্ধ করেছেন স্বামীকে বাঁচাতে। রাস্তায় শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখেছে, কেউ ছবি তুলেছে, কেউবা সটকে পড়েছে। বাঁচাতেতো কেউ আসেইনি, চিৎকার করে লোক সমাগমের চেষ্টাও করেনি।

সর্বোচ্চ আদালত থেকে শুরু করে সব স্তরে এই আলোচনা – কেন কেউ এগিয়ে এলোনা? উত্তর হলো পাল্টা প্রশ্ন - কেন এগিয়ে আসবে? যারা রাস্তায়, দিনে দুপুরে এমনটা করতে পারে, তারা যে ক্ষমতাধর সেটা জেনেই সবাই নিরব থাকে। এগিয়ে আসতো যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের ক্ষমতায়ন হতো সমাজে।

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে সমাজ বিজ্ঞানীরা, কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে, নিশ্চিত ভাবেই মানতে হবে যে, এই ঘটনা বাংলাদেশকে সভ্যতার মাপকাঠিতে এক ধাক্কায় অনেক দূর নামিয়ে দিতে পেরেছে। এমন নয় যে, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা আগে ঘটেনি। মানুষের চোখে এখনও জীবন্ত ঢাকায় বিশ্বজিত হত্যা, সিলেটে কলেজ ছাত্রী খাদিজাকে কোপানো, বই মেলায় শত শত মানুষের মাঝে অভিজিত রায় আর তার স্ত্রী বন্যাকে কোপানো। কিন্তু ফেনীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পর যেভাবে প্রধানমন্ত্রী বিচলিত হয়েছিলেন, যেভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র সাড়া দিয়েছিল, একটা ভাবনা এসেছিল যে, কেউ বড় নৃশংসতা করার আগে একবার ভাববে। কিন্তু আসলে সন্ত্রাসী আর সমাজ বিরোধীদের কাছে এই রাষ্ট্র বরাবর এক অভয়ারণ্য।

খুন, ধর্ষণ, সহিংসতা আজকাল রীতিমতো প্রাত্যহিক ঘটনা। কিন্তু প্রাত্যহিকতার মধ্যেও তো কিছু ঘটনা নৃশংসতা ও বিকারগ্রস্ততার মাপকাঠিতে বিশিষ্টতা দাবি করে ফেলে। বরগুনার ঘটনা সেই বিশিষ্টতার দাবিদার। বুঝতে ভুল হয় না যে, আমাদের সমাজ জুড়ে কোন ফাঁক দিয়ে যেন একটি বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। নতুবা অন্যের স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী দাবি করে সেই মেয়ের স্বামীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করার মত নৃশংসতা ঘটানো যায়?

তার চেয়ে আরো বেদনাদায়ক এক পরিবর্তন হল, এমন এক ঘটনার পরও যারা পাতার পর পাতা লিখে চলেছেন নিহত রিফাতের স্ত্রী মিন্নির পরকীয়া আর প্রণয়ের কাহিনী। মানবিকতার সাধারণ বোধটি যে কিভাবে লোপাট হয়ে গেল – এসব অভিব্যক্তি তার সাক্ষাৎ প্রমাণ।

যে সমাজ নারী নির্যাতন, ধর্ষণ আর সহিংসতায় ভিকটিমের চরিত্র খোঁজে তার আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার উপায় নেই। এই প্রবল মনস্তাত্বিক অপরাধের কারণেই হত্যার প্রতিবাদ হয় না। হলেও তা হয় আলঙ্কারিক। বিশ্বজিত, নুসরাত, খাদিজা, তনু সবার বেলায় নাগরিক প্রতিবাদ হয়েছে, আমরা অংশ নিয়েছি। কিন্তু আমরা জানি প্রতিবারই প্রতিবাদ সমাবেশ শেষ করে নাগরিক কপটতায় ডুবে গেছি। নতুন বিষয় নিয়ে মেতে উঠেছি আর ভুলে বসে থেকেছি যে আমরা আদতে বাস করছি অনতিক্রম্য অন্যায়-অধ্যুষিত এক সমাজে, যার অসুস্থচিত্ততার নিরাময়ের পথ কারও জানা নেই।

একটা ইতিবাচক দিক হয়তো অনেকেই বলবেন যে - অনেক অন্যায়, অনেক অপরাধ দেখবার পরও আজ নূতন করে মানুষ বরগুনার ঘটনায় শিউরে উঠছে। কিন্তু একটি বিষয়তো এখও পরিষ্কার হল না যে, অপরাধীদের পেছনে অটল আশ্বাসছত্র ধরে আছেন কে – স্থানীয় সাংসদ, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নাকি পুলিশ? ভয়ঙ্কর সহিংসতার প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড সর্বাপেক্ষা হীন ও আক্রমণাত্মক সংস্কৃতির সক্রিয় পুরোধারা ক্ষমতার কেন্দ্রেই অবস্থান করে।

আততায়ী দুষ্কৃতীর ধারালো অস্ত্রের সামনে অসহায় মৃত্যুবরণ করেছেন হুমায়ুন আজাদ থেকে রাজীব, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্তবিজয় দাস, ফয়সাল আরেফিন দীপন থেকে জুলহাস মান্নান। তারা মুক্তমনা, ধর্মান্ধতার বিরোধী, প্রগতির পন্থী ছিলেন। তাই তাদের মরতে হয়েছে। তাদের আততায়ীরা একান্ত ভাবেই যুক্তি, বুদ্ধি, সভ্যতার শত্রু। তারা বুদ্ধির বিনাশকারী। আপামর জীবসমাজ হতে মানুষ যে একটি গুণের দ্বারা নিজেকে পৃথক করতে পারে, সেই গুণটিকে সোজাসুজি নির্মূল করবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে তারা বীভৎসতায় অবগাহন করেছে। তারা হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলা করে রক্তে স্নান করেছে। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রেরও লড়াই আছে।

কিন্তু নুসরাত, বিশ্বজিত, রিফাতসহ এমন অতি সাধারণদের যারা এমন নৃশংসতায় খুন করে, তাদের আদর্শ কী? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুনিরা ধরা পড়েনা, প্রশ্রয় পায় রাজধানীর উঁচু স্থান থেকে। এই সমাজে বিত্তবান হতে সহিংস হয়ে উঠতে হয়। তারা সেই পথে আছে। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় অপরাধীরা মূলত ধরা পড়েনা, পড়লেও জামিন হয়ে যায়।

দিনে-দুপুরে খুন করে বেড়ালেও খুনিদের কাছে এমন কোন বার্তা পৌঁছেনি যে— সাধারণ নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাষ্ট্র। শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নেই এই নির্বিচার হত্যালীলা থামাতে যেকোন ব্যবস্থা নিবে সরকার। এই মুহূর্তে একটি কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে জনগণের কাছে নিজেকে প্রমাণ করা বাংলাদেশের কাছে প্রথম জরুরি কাজ। রাজনীতির অনেক জটিল কাজ পরেও করা যাবে। দেশব্যাপী যে চরম সহিংস একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে তাদের ব্যাপারে কি করা যায় সেটাই ভাবুক সরকার।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/জেআইএম

দিনে-দুপুরে খুন করে বেড়ালেও খুনিদের কাছে এমন কোন বার্তা পৌঁছেনি যে— সাধারণ নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাষ্ট্র। শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নেই এই নির্বিচার হত্যালীলা থামাতে যেকোন ব্যবস্থা নিবে সরকার। এই মুহূর্তে একটি কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে জনগণের কাছে নিজেকে প্রমাণ করা বাংলাদেশের কাছে প্রথম জরুরি কাজ। রাজনীতির অনেক জটিল কাজ পরেও করা যাবে। দেশব্যাপী যে চরম সহিংস একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে তাদের ব্যাপারে কি করা যায় সেটাই ভাবুক সরকার।

টাইমলাইন  

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]