নদীপথে ঈদযাত্রা

শেষ মুহূর্তে সদরঘাটে উপচেপড়া ভিড়

আশিকুজ্জামান
আশিকুজ্জামান আশিকুজ্জামান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৩৯ পিএম, ১৯ মার্চ ২০২৬
রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল-ছবি জাগো নিউজ

দেশের আকাশে আজ চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। সেই অপেক্ষার মধ্যেই শেষ মুহূর্তে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে ঘাট এলাকা। সারাদিন বিভিন্ন রুটে একের পর এক লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে গন্তব্যের উদ্দেশে।

সকাল থেকেই ঘাট এলাকায় ছিল তীব্র ভিড়। পরিবার-পরিজন নিয়ে কেউ লঞ্চে উঠছেন, কেউ আবার নির্ধারিত সময়ের আগেই এসে অবস্থান করছেন পন্টুনে। ভিড় সামাল দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে তৎপর থাকতে দেখা গেছে।

যাত্রীদের ঈদযাত্রার গল্প

ভিড়ের মধ্যেই যাত্রীদের মুখে শোনা গেছে স্বস্তি, ভোগান্তি আর তাড়াহুড়োর মিশ্র অভিজ্ঞতা।

বরিশালগামী যাত্রী সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের আগে শেষ দিন বলে ভিড়টা অনেক বেশি। তবে আগে চলে আসায় লঞ্চে উঠতে পেরেছি। আশা করছি, নিরাপদেই বাড়ি পৌঁছাতে পারবো।

ভোলাগামী নাসরিন আক্তার বলেন, ছোট বাচ্চা নিয়ে ভিড়ের মধ্যে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও ঈদে পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারবো এই আনন্দটাই বড়।

মাদারীপুরের উদ্দেশে যাওয়া কলেজশিক্ষার্থী রাকিব হোসেন বলেন, ভাড়া কিছুটা বেশি লাগছে মনে হচ্ছে। তবে সময়মতো লঞ্চ পেয়ে ভালো লাগছে।

ঝালকাঠিগামী ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, ঘাটে অনেক চাপ, কিন্তু লঞ্চ ছাড়ছে নিয়মিত। নিরাপত্তা ঠিক থাকলে ভোগান্তি মেনে নেওয়া যায়।

পটুয়াখালীগামী আরেক যাত্রী রুবেল খান জাগো নিউজকে বলেন, আগের তুলনায় ব্যবস্থাপনা কিছুটা ভালো। কন্ট্রোল রুম আর পুলিশ থাকায় একটু স্বস্তি পাচ্ছি।

যাত্রীসেবায় নানা উদ্যোগ

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রীদের সুবিধার্থে ট্রলি সেবা ও হুইলচেয়ার সুবিধা রাখা হয়েছে। এছাড়া পন্টুন এলাকায় ক্যানভাসার ও হকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে যাত্রী চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে।

সদরঘাটে সার্বক্ষণিক ৪ থেকে ৫টি কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে, যেখান থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

jagonews24

১৭০টি লঞ্চ প্রস্তুত, ৮-১০ লাখ যাত্রীর চাপ

বিআইডব্লিউটিএ’র ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ঈদে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তাই আগাম পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনি জানান, সদরঘাটের পাশাপাশি বছিলা ও কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন এলাকা থেকেও লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে চাপ কমে। বর্তমানে প্রায় ১৭০টি লঞ্চ প্রস্তুত রয়েছে। ৩৮টি রুটের মধ্যে ৩৩টি রুটে লঞ্চ চলাচল করছে।

তার ভাষ্য, প্রতিদিন গড়ে ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ ঢাকা বন্দর ছেড়ে যাচ্ছে। এবারের ঈদে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ নদীপথে যাতায়াত করবে বলে আশা করছি।

অতিরিক্ত যাত্রী রোধে মাঠে প্রতিমন্ত্রী

ঈদযাত্রার ভিড়ের মধ্যে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ঠেকাতে সরাসরি মাঠে নেমেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান।

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকালে তিনি সদরঘাটের বিভিন্ন পন্টুন ঘুরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা লঞ্চগুলোকে দ্রুত ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তার উপস্থিতিতেই অন্তত সাত থেকে আটটি লঞ্চ ঘাট ছেড়ে যায়। তিনি নিজে লঞ্চে উঠে যাত্রীসংখ্যা যাচাই করেন এবং কোনোভাবেই অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না বলে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

নদীপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্পিডবোট ও কেবিন ক্রুজের মাধ্যমে নজরদারিও চালানো হয়।

jagonews24

লঞ্চ সংঘর্ষ তদন্তে একাধিক কমিটি

এদিকে, সদরঘাটে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ৬ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

বুধবার (১৮ মার্চ) ১৪ নম্বর পন্টুনের কাছে ‘আসা যাওয়া–৫’ ও ‘জাকির সম্রাট–৩’ লঞ্চের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।

কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

একই ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএও পৃথক চার সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে সুপারিশ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, ভিড়, তাড়াহুড়া আর ঝুঁকি—সবকিছুর মাঝেই স্বজনদের কাছে ফিরতে মানুষের এই যাত্রা যেন এক অনিবার্য বাস্তবতা। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এমডিএএ/এসএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।