ঈদে সদরঘাটে কুলি সেবা ফ্রি, থাকবে ২০০ স্বেচ্ছাসেবক
• যাত্রীদের জন্য ট্রলি সেবা ও হুইলচেয়ার সুবিধা
• প্রায় ১৭০টি লঞ্চ যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত
• পন্টুন এলাকায় ক্যানভাসার ও হকার নিষিদ্ধ
• সদরঘাটে সার্বক্ষণিক চালু থাকবে ৪-৫টি কন্ট্রোল রুম
আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটে যাত্রীদের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও লাখো মানুষ নদীপথে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঈদ উদযাপন করতে ঘরে ফিরবেন। এই ঈদে নদীপথে ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ বাড়ি ফিরবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, কুলি হয়রানি বন্ধ, বিশেষ যাত্রীসেবা, লঞ্চের ফিটনেস নিশ্চিতকরণসহ নানা বিষয়ে নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ।
এসব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক।

জাগো নিউজ: আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে সদরঘাটে নদীপথে যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে?
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাটসহ ও আশপাশের যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে নদীপথে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এবার আমরা আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।
নদীপথে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে সদরঘাটের পাশাপাশি বছিলা ও কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকেও লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে সদরঘাটে অতিরিক্ত চাপ কমে। এই ঘাট দুটো থেকে প্রতিদিন ছয়টি করে লঞ্চ ছাড়ে। বর্তমানে প্রায় ১৭০টির মতো লঞ্চ যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এর মধ্যে বর্তমানে ৩৮টি রুটের মধ্যে ৩৩টি রুটে লঞ্চ চলাচল করছে। ঢাকা নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে। গত ঈদের শেষ সময়ে সর্বোচ্চ ১৩৭টি লঞ্চ ঢাকা বন্দর ছেড়েছিল। এবারের ঈদে নদীপথে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করবে বলে আমরা আশা করছি।
আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যাত্রীরা যেন নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং স্বস্তিদায়কভাবে ঈদের যাত্রা সম্পন্ন করতে পারেন।

জাগো নিউজ: যাত্রীদের কুলি হয়রানি নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ থাকে। এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: সদরঘাটে যাত্রীদের অন্যতম বড় অভিযোগ হচ্ছে কুলিদের হয়রানি। এ সমস্যা দূর করতে আমরা বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
এবার ঈদের ছুটিতে ১০ দিনের জন্য ২০০ স্বেচ্ছাসেবক বা কুলি নিয়োগ দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। তারা নীল রঙের জ্যাকেট পরে যাত্রীসেবায় নিয়োজিত আছেন। শুধু অনুমোদিত এই কুলিরাই যাত্রীদের মালামাল বহনে সহায়তা করতে পারবেন। এর ফলে অনিয়ন্ত্রিত কুলি কার্যক্রম এবং যাত্রীদের হয়রানি অনেকাংশে কমে আসবে।
এছাড়া যাত্রীদের জন্য ট্রলি সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাত্রীরা চাইলে নিজেরাই ট্রলি ব্যবহার করে তাদের মালামাল বহন করতে পারবেন। অন্যদিকে অসুস্থ, অক্ষম বা বয়স্ক যাত্রীরা কুলিদের সহায়তা নিতে পারবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কুলি সেবার জন্য যাত্রীদের কোনো প্রকার অর্থ দিতে হবে না। আমরা বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করবো, যাতে কেউ যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বা অবৈধভাবে টাকা আদায় করতে না পারে।

জাগো নিউজ: অসুস্থ, বৃদ্ধ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য আর কী ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে?
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: ঈদের সময় অনেক অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে দুর্বল যাত্রীও নদীপথে যাতায়াত করেন। তাদের কথা বিবেচনা করেই আমরা বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
প্রতিটি প্রবেশ ফটকে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ক্যাডেটদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যারা অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের সহযোগিতা করবেন। এই ক্যাডেটরা যাত্রীদের সম্মানের সঙ্গে এবং নিরাপদভাবে লঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সহায়তা করবেন। এতে বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে বলে আমরা আশা করছি।

জাগো নিউজ: পন্টুন এলাকায় যাত্রীদের টানাটানি বা বিশৃঙ্খলা বন্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: পন্টুন এলাকায় যাত্রীদের টানাটানি, ক্যানভাসিং এবং হকারদের উৎপাত অনেক সময় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি।
এবার পন্টুন এলাকা সম্পূর্ণভাবে ক্যানভাসার ও হকারমুক্ত রাখা হবে। কোনো ব্যক্তি যাত্রীদের জোর করে লঞ্চে তোলার চেষ্টা করলে বা হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমরা চাই পন্টুন এলাকায় একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় থাকুক, যাতে যাত্রীরা কোনো ধরনের চাপ বা হয়রানির শিকার না হন।
• নদীপথে ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ বাড়ি ফিরবে বলে আশা
• অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের সহায়তায় থাকবে প্রশিক্ষিত ক্যাডেট
• যাত্রীচাপ কমাতে বছিলা ও কাঞ্চন ব্রিজ এলাকা থেকেও লঞ্চ চলবে
• নিরাপত্তায় থাকবে র্যাব, নৌ-পুলিশ, ডিএমপি ও মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট

জাগো নিউজ: ঈদ যাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কী ধরনের ব্যবস্থা থাকবে?
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে। র্যাব, নৌ-পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
এজন্য সদরঘাট এলাকায় চারটি থেকে পাঁচটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা কন্ট্রোল রুম সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। এসব কন্ট্রোল রুম থেকে পুরো কার্যক্রম মনিটর করা হবে।
এছাড়া মাঠপর্যায়ে মোবাইল টিম এবং মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। তারা যাত্রী স্বার্থ রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অনিয়ম প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

জাগো নিউজ: যাত্রীদের অভিযোগ বা জরুরি সমস্যার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে?
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: যাত্রীদের যেকোনো সমস্যা বা অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রতিটি লঞ্চে বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), ফায়ার সার্ভিস এবং র্যাবের হটলাইন নম্বর প্রদর্শন করা হবে। যাত্রীরা যেকোনো সময় এসব নম্বরে যোগাযোগ করে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
আমাদের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকেও বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে, যাতে যাত্রীদের ভোগান্তি কমে এবং তারা নিরাপদে যাত্রা করতে পারেন।

জাগো নিউজ: লঞ্চের ফিটনেস, ভাড়া এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে কী নির্দেশনা রয়েছে?
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ফিটনেসবিহীন কোনো লঞ্চকে নদীপথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। প্রতিটি লঞ্চের কাগজপত্র, ফিটনেস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করা হচ্ছে।
এছাড়া আবহাওয়া পরিস্থিতির বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। প্রতিকূল আবহাওয়া দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভাড়ার ক্ষেত্রেও সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনুসরণ করা হবে। কোনোভাবেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে লঞ্চ মালিকেরা যাত্রীদের স্বস্তির জন্য প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া কম নিচ্ছেন।

জাগো নিউজ: ঈদ যাত্রাকে সামনে রেখে যাত্রীদের উদ্দেশে আপনার কোনো পরামর্শ আছে?
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: আমরা যাত্রীদের উদ্দেশে বলবো, তারা যেন নির্ধারিত নিয়ম মেনে লঞ্চে যাতায়াত করেন এবং অযথা ভিড় বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করেন। যাত্রীরা যদি কোনো অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা হয়রানির শিকার হন, তাহলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবো।
সবাই যদি নিয়ম মেনে চলেন এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করেন, তাহলে আমরা আশা করছি এবারের ঈদ যাত্রা নদীপথে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং স্বস্তিদায়ক হবে।
জাগো নিউজ: ব্যস্ততার মধ্যেও জাগো নিউজকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে ঈদের শুভেচ্ছা।
মুহম্মদ মোবারক হোসেন: জাগো নিউজ এবং পাঠকদেরও ধন্যবাদ এবং ঈদের শুভেচ্ছা। সবার ঈদযাত্রা নিরাপদ হোক।
এমডিএএ/এমএমএআর