মুসলিমদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:১৮ পিএম, ১৭ মার্চ ২০১৯

শুক্রবার সকালে আমি ঘুম থেকে ওঠার পর নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে গণহত্যার খবর শুনে ভীষণ আহত হই। কিন্তু দুঃখের কথা হলো আমি ঘটনাটি শুনে মোটেও আশ্চর্য হইনি। যেকোনো সময় এরকম সহিংসতা যে হতে পারে তার আশঙ্কা করতাম আমি। তবে ভাবিনি, সেই সংখ্যাটা এত বড় হতে পারে। ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে নারী, শিশুসহ ৫০ জনকে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটবে। তাছাড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করাও হয়।

বিশ্বে দিন দিন ইসলাম বিদ্বেষ (ইসলামোফোবিয়া) বাড়ছে। যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা তৈরি, অমানবিক আচরণ ও বলির পাঁঠা করার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় ২০০১ সালের ৯/১১এ যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে। সেই হামলা মুসলিমরা চালিয়েছে বলে দাবি করে মুসলিম বিরোধী মত প্রচারের মাত্রা বেড়ে যায় পশ্চিমা দেশগুলোতে।

অন্য কোনো জাতি কিংবা গোষ্ঠীকে এমন ‘পাপের’ জন্য পদ্ধতিগত ও সর্বজনস্বীকৃত উপায়ে শাস্তি দেয়া হয়নি। রাজনৈতিক নেতা, ভাষ্যকার, প্রভাববিস্তারকারী ব্যক্তি ও গণমাধ্যম মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সে অনুযায়ী প্রচারণা চালাতে থাকে। যা বর্তমানে একটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

আমাদের বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার কথা জানিয়েছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও মুসলিমদের বিরুদ্ধে এমন মত পোষণ করেন। তাছাড়া সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন তো মুসলিম নারীদের নিয়ে রীতিমতো কৌতুক করেন। তিনি বলেন, ‘মুসলিম নারীরা দেখতে চিঠির বাক্সের মতো।’

বিশ্বের প্রভাবশালী সব নেতার এমন মন্তব্যের পর তেল আম্মা নামের একটি সংগঠন মুসলিম বিদ্বেষী ঘটনার রেকর্ড প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মুসলিম নারীদের প্রতি আক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। সংগঠনটি মূলত মুসলিম নারীদের মাথায় স্কার্ফ পড়ার সময় এমনটা লক্ষ্য করেন। বিশেষ করে নারীরা যখন তাদের বাচ্চাদের স্কুলে আনা নেয়ার কাজ করে তখন।

চিন্তা করলে বোঝা যাবে এমন আক্রমণাত্মক আচরণ ও মন্তব্য একটা ভীত ও দ্বিধাগ্রস্ত মুসলিম শিশুর জন্য কি করতে পারে। আমরা সেইসব উচ্চ পর্যায়ের ভাষ্যকরদের সম্মান করি, যারা বলে ইসলামোফোবিয়া বলে আসলে কিছু নাই। পরোক্ষভাবে তারা এও বলে তারা এটা ভাবতে বাধ্য হয় সন্ত্রাসবাদের কারণে।

তাহলে তারা যে সন্ত্রাসবাদের কথা বলে ইসলামোফোবিয়ার বৈধতা দিচ্ছেন এখন সেটা শ্বেতাঙ্গদের বেলায়ও করা হোক। আর ২৮ বছর বয়সী সব শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিকে নজরদারি ও সন্ত্রাসবাদী হিসেবে সন্দেহ করা হোক। আমি জানি এটা খুবই অর্থহীন ও আদিম যুক্তি। কিন্তু যারা ক্ষমতায় বসে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এসব কথা বলছে, তাদের জানা উচিত যে তারা যে যুক্তি দেন সেটা কতটা অর্থহীন।

সব মুসলিমকে তাদের এমন বাঁকা উক্তি সহ্য করতে হয়। তারা সব মুসলিমকে সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদী হিসেবে দেখেন। যা খুবই মারাত্মক ও ভুল একটি দৃষ্টিভঙ্গি। বেশিরভাগ মুসলিম বিশেষ করে যারা অভিবাসী তারা সব সময় মাথা নিচু করে থাকেন। তারা একটা ঝামেলামুক্ত ও শান্তিপূর্ণ জীবন প্রত্যাশা করেন। তারা কোনো ঝামেলার মধ্যে থাকতে চান না।

আমি এটা জানি কারণ আমি নিজেও একজন মুসলিম। আমি আমার কমিউনিটির মানুষ সম্পর্কে ধারণা রাখি। আমরা কোনো সমস্যা তৈরি করতে চাই না। আমরা কাউকে আক্রমণ কিংবা হামলা করার জন্য এখানে আসিনি। আমরা এখানে এসেছি একটা সুন্দর জীবন যাপনের আশায়।

আমরা আপনাদের দোকানে কাজ করি, গাড়ি চালাই, শেষ রাতের খাবার তৈরি করে দেই যখন আপনারা মাতাল হয়ে থাকেন। আর যখন আপনারা অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন আপনাদের সেবা করি। আমরা আমাদের কমিউনিটির সেবা করি। তারপরও আমরাই সব লাঞ্চনার শিকার কিংবা ঘৃণার পাত্র। আর এখন আমাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা করা হচ্ছে।

এসএ/এমএস

টাইমলাইন