‘হ্যালো, ব্রাদার’র জবাবে মিলল ৩টি বুলেট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৩৮ এএম, ১৬ মার্চ ২০১৯

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে জুমার নামাজের সময় দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় অর্ধশত মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। হামলাকারী ভিডিও গেমের ন্যায় ঠাস ঠাস করে গুলিতে ছুড়তে ছুড়তে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বৃষ্টির মতো গুলিতে লুটিয়ে পড়েন মুসল্লিরা। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকে হামলাকারী।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাকারী যখন বন্দুক নিয়ে হামলার উদ্দেশে মসজিদে প্রবেশ করে তখন গুলিতে নিহত প্রথম ব্যক্তি তাকে ‘হ্যালো ব্রাদার’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। এর জবাবে তাকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলি ছোড়ে হামলাকারী।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া  ১৬ মিনিটের লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, যখন হামলাকারী আল নুর মসজিদে প্রবেশ করছেন তখন তাকে দেখে ওই ব্যক্তি বলছেন, ‌‌‘হ্যালো ব্রাদার’। আর তখনই হামলাকারী তাকে লক্ষ্য করে পরপর তিনটি গুলি ছোড়েন। এতে লুটিয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি। এরপর বন্দুকধারী এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকেন। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অনবরত গুলি ছুড়তে থাকেন।

হামলাকারী মসজিদের ভেতরে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বেশ কয়েকটি বন্দুক নিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনে আগাচ্ছিলেন। যারা তার হামলা থেকে বাঁচতে মাটিতে শুয়ে পড়েন তাদের খুঁজে খুঁজে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করছিলেন।

হামলাকারী মসিজেদের ভেতরে ঢোকার পর থেকেই এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু করেন। মসজিদের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে গিয়ে প্রথম যে কক্ষটি পান সেখানে মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে টানা গুলি করা শুরু করেন। গুলির শব্দ শুনে মুসল্লিরা পালানোর চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়েন। পরে এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে ঘুরে ঘুরে গুলি করতে থাকেন। জীবিত মানুষ দেখলে গুলি করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

হামলা শুরু হওয়ার আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদটি ছিল বেশ শান্ত, নীরব আর শান্তিপূর্ণ। মসজিদের ঈমাম খুতবা পড়ছিলেন। চারদিকে যেন পিনপতন নীরবতা। স্থানীয় সময় তখন ঠিক ১টা ৪০ মিনিট। আচমকা মসজিদের ভেতরে এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ শোনা যায়। আনুমানিক ২০ মিনিটের মধ্যেই খুব কাছ থেকে মুসল্লিদের গুলি করে হত্যা করে হামলাকারী।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান রমজান নামের এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে হামলার এমন বিবরণ প্রকাশ করেছে। রমজান নামের ওই প্রত্যক্ষদর্শী মসজিদের ভেতরে ভয়াবহ ও নৃশংস সেই হামলার বর্ণনা দিয়েছেন সাংবাদিকদের। তিনি জানান, হামলাকারীর হাত থেকে বাঁচতে অনেকে মেঝেতে অন্য লাশের পাশে শুয়ে পড়লেও শেষ রক্ষা হয়নি।

সন্ত্রাসী ওই হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৯ জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির পুলিশের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নিউজিল্যান্ডের প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রেলিয়ার একজন চরমপন্থীর নেতৃত্বে এ হামলার ঘটনাটি ঘটেছে। হামলায় ২০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে আহতদের মধ্যে একজন হামলাকারীও রয়েছে।

হামলায় কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বেঁচে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট দল। তার আগে শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরে ক্রাইস্টচার্চে টিম বাসে করে হাগলি পার্কের নিকটে একটি মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন তামিম, মিরাজ, তাইজুল, মুশফিকরা। এসময় তাদের সঙ্গ দিতে সাথেই ছিলেন সৌম্য সরকার, দলের স্ট্রেন্থ ও কন্ডিশনিং কোচ মারিও ভিল্লাভারায়ন, দলের ডাটা অ্যানালিস্ট শ্রিনিবাসসহ বেশ কয়েকজন সদস্য।

হুট করেই স্থানীয় সময় বেলার ১টা ৪০ মিনিটের দিকে বন্দুকধারী এক ব্যক্তি অতর্কিতভাবে ক্রাইস্টচার্চের সেন্ট্রাল মসজিদে ঢুকে এলোপাথারি গুলি শুরু করলে নিহত হন ছয়জন। তবে ঘটনার আকস্মিকতা টের পেয়ে বাস থেকে নেমে দ্রুতই হাগলি পার্ক দিয়ে মাঠে ফিরে যান তামিম-মিরাজরা।

মসজিদে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে অজ্ঞাত এক নারী এসে তামিমদের সতর্ক করে জানান যে, মসজিদের ভেতরে গোলাগুলি হচ্ছে, এখন ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে না। এরপর তারা সেখান থেকে ফিরে যান। ফলে এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান তারা।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে জোড়া হামলার ঘটনার পর থেকে নয়জন ভারতীয় নিখোঁজ রয়েছেন। হায়দরাবাদে থাকা একটি পরিবারের দুই সদস্যের মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন এ ঘটনায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ ফয়সালের উদ্ধৃতি দিয়ে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের খবরে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় আহত চার পাকিস্তানি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন। ওই ঘটনায় সর্বশেষ ৪৯ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুই মসজিদে ভয়াবহ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধান এ নিয়ে বিবৃতি দিয়ে সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প। এ বিষয়ে তাকে কোন বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে বন্দুকধারীর হামলায় ৪৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী হামলা বলে অভিহিত করেছেন তুরুস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান।

এসআর

 

 

 

টাইমলাইন